আইছে। কাইল রাইতে আমার লোক বডার থিকা আইয়া দিয়া গ্যাছে। তখন সাড়ে দশটা বাজে। অত রাইতে গারিঘুরা মিলে না। হের লেইগা আইতে পারি নাই। জামার পকেট থেকে পুরু লম্বা একটা খাম বার করে বিনয়কে দিতে দিতে নিত্য দাস বলল, চিঠিখান দ্বারিক কত্তারে দিয়া চইলা যাইতে পারতাম। কিন্তুক আপনের লগে ম্যালা (অনেক) দিন দ্যাহা হয় নাই। ভাবলাম, আইছি যহন। দ্যাহাখান কইরাই যাই। হ্যামকত্তার চিঠি পইড়া আমারে যদিন আপনের কিছু কওনের থাকে হুইনা যামু।
বিনয় উত্তর দিল না। উত্তেজনা, বুকের থরথরানি, শঙ্কা–কত কী-ই যে চলছে তার ভেতরে। কী লিখেছেন হেমনাথ? ক্ষিপ্র হাতে খামের মুখ ছিঁড়তে ছিঁড়তে সে উঁচু গলায় ডাকতে লাগল, ছোটদি–ছোটদি তার গলা ভীষণ কাঁপছিল।
সুধা দরজার সামনে এসে দাঁড়ায়। ঘরোয়া ধরনে পরা তাতের আধময়লা শাড়ি। খোঁপা ভেঙে গেছে। চোখেমুখে ক্লান্তির ছাপ। দেখামাত্র টের পাওয়া যায়, কোনও কাজ করতে করতে চলে এসেছে।
সুধা বলল, কি রে, কখন ফিরলি?
এই সবে। দুমিনিটও হয়নি।
থানায় কী বলল?
পরে শুনিস। এখন বোস্
এখন কি বসবার সময়? রাজ্যের কাজ পড়ে আছে।
ততক্ষণে খামের ভেতর থেকে চিঠি বার করে ফেলেছে বিনয়। বলল, দাসমশাই দাদুর চিঠি নিয়ে এসেছে। শুনবি না?
সুধা ঘরে ঢুকে পড়ে। যে-কাজটি ফেলে সে চলে এসেছে সেটা পরে করলেও চলবে। তার চেয়ে হেমনাথের চিঠি শোনাটা এখন শত গুণ জরুরি। এই চিঠির জন্য তারা কী উৎকণ্ঠা নিয়ে যে অপেক্ষা করে আছে! বিনয়ের কাছাকাছি একটা চেয়ারে বসতে বসতে সুধা বলল, পড়–
বিনয় চিঠি খুলে পড়তে শুরু করল।
কল্যাণবরেষু
বিনু, বেশ কিছুকাল আগে তোমার পত্র পাইয়াছিলাম কিন্তু উত্তর যে দিব, তাহার উপায় ছিল না। কারণ নিত্য দাসের যে লোকটি পাকিস্তানের চিঠি ইন্ডিয়ায় এবং ইন্ডিয়ার চিঠি পাকিস্তানে পৌঁছাইয়া দেয় সেই জয়নাল বহু দিন রাজদিয়ায় আসে নাই। তোমাদের সঙ্গে কীভাবে যোগাযোগ করিব, চিন্তা করিয়া কূলকিনারা পাইতাম না। কী দুশ্চিন্তায় যে দিন কাটাইয়াছি, শুধু আমিই জানি। আর জানে তোমার দুই দিদা। সারা রাত্রি আমরা চোখের পাতা এক করিতে পারিতাম না।
আমি জানি, নিত্যদিন ইন্ডিয়ার কাগজে পাকিস্তানের ভীতিকর সব খবর পড়িয়া তোমরা আমাদের সম্বন্ধে প্রচণ্ড উদ্বেগের মধ্যে রহিয়াছ। কিন্তু কী করিব, ভাবিয়া ভাবিয়া যখন শেষ আশাটুকুও ছাড়িয়া দিতে বসিয়াছি সেইসময় জয়নাল আসিয়া হাজির। মনে হইল, দেবদূতের দর্শন পাইলাম।
জয়নাল জানাইল, মধ্যিখানে টাইফয়েডে পনেরো দিনেরও বেশি সে শয্যাশায়ী হইয়া ছিল। শরীর ভয়ানক দুর্বল। সেই কারণে আমার সহিত দেখা করিতে পারে নাই। এজন্য বার বার ক্ষমা চাহিল। লোকটি ভাল। বিনয়ী। দেশভাগের পর বহু হিন্দু পরিবারের একাংশ ইন্ডিয়ায় চলিয়া গিয়াছে। বাকি অংশ দেশের ভিটা আঁকড়াইয়া পড়িয়া আছে। এপারের প্রিয়জনদের জন্য ওপারের আত্মীয়-পরিজনদের। যে কী অনন্ত দুর্ভাবনা, জয়নাল তাহা বোঝে। পার্টিশানে ক্ষতিগ্রস্ত, সর্বস্বান্ত মানুষগুলির জন্য তাহার গভীর সহানুভূতি লক্ষ করিয়াছি।
যাহা হউক, এইবার আমাদের কথা জানাই। আমি শারীরিক দিক হইতে মোটামুটি আছি। সামান্য জ্বরজারি হইয়াছিল, তাহা ধর্তব্যের মধ্যে নয়। তোমার দিদা এবং শিবানীদিদি ভাল নাই। শিবানী কয়েকদিন ম্যালেরিয়ায় ভুগিয়া উঠিল। তোমার দিদার বাতের পুরাতন ব্যথাটা নতুন করিয়া চাগাইয়া উঠিয়াছে। চলিতে ফিরিতে কষ্ট হয়।
রাজদিয়ার একমাত্র এল এম এফ ডাক্তার অশ্বিনী ঘোষ গত মাসে দেশের বিষয় সম্পত্তি এক্সচেঞ্জ করিয়া রাতারাতি কলিকাতায় চলিয়া গিয়াছে। গোপনে গোপনে সে যে বাড়িঘর বিনিময়ের চেষ্টা করিতেছে, আগে তাহা কাহাকেও জানায় নাই। সমস্ত কাজ নিঃশব্দে সমাধা করিয়া যাইবার আগে আমার সঙ্গে অবশ্য দেখা করিয়াছিল। আর ছিল ননী কবিরাজ। সে আমার মতো পূর্বপুরুষের ভিটা কামড়াইয়া পড়িয়া ছিল। তাহার স্ত্রী এবং ছেলেরা আগেই আগরতলায় গিয়া থিতু হইয়া বসিয়াছে। ননী রাজদিয়ায় থাকুক, ছেলেরা চাহিত না। ননীও দেশ ছাড়িবে না। কিন্তু তাহার বয়স হইয়াছে। শরীরে ভাঙন ধরিয়াছে। এই অবস্থায় স্ত্রী-পুত্র পরিবার ছাড়িয়া পাকিস্তানে একা একা পড়িয়া থাকা তাহার পক্ষে অসম্ভব হইয়া উঠিতেছিল। শেষ পর্যন্ত ননীর ছেলেরা আসিয়া এক প্রকার জোর করিয়া তাহাকে আগরতলায় লইয়া গিয়াছে।
অশ্বিনী ডাক্তার আর ননী কবিরাজ ভারতে চলিয়া যাইবার পর রাজদিয়ার লোকজন চিকিৎসার ব্যাপারে ভীষণ সংকটে পড়িয়া গিয়াছে। নৌকা পাঠাইয়া পনেরো মাইল দূরের কমলাপুর হইতে উমাপতি ডাক্তারকে আনাইয়া তোমার দুই দিদার চিকিৎসা করাইতে হইয়াছে।
এদিকে রাজদিয়া এবং তাহার চারিপাশের গ্রামগুলির অবস্থার কোনও পরিবর্তন ঘটিবার লক্ষণ নাই। রাজাকার এবং লিগের লোকেরা সমানে দাপাইয়া বেড়াইতেছে। ফলে চোদ্দ পুরুষের ভিটামাটি ফেলিয়া দেশত্যাগের ঘটনা আরও বাড়িয়া গিয়াছে।
তোমাকে আগের চিঠিতে জানাইয়াছিলাম কিনা স্মরণে নাই। ইদানীং কিছুদিন যাবৎ দেশ ছাড়িয়া চলিয়া যাইবার জন্য বেনামি পত্ৰ পাইতেছি। আমি গ্রাহ্য করি না। তবে মন ভীষণ খারাপ হইয়া গিয়াছে। পূর্ববঙ্গের এই ছোট শহরে কতকাল পুরুষানুক্রমে আমরা বাস করিয়া আসিতেছি। ইহা আমার জন্মভূমি। আমি সজ্ঞানে সারা জীবনে কোনও অপরাধ করি নাই। বরং মানুষের উপকার করিবারই চেষ্টা করিয়াছি। তবে কেন আমাকে আপন দেশ হইতে চলিয়া যাইতে হইবে? কায়েদে আজম জিন্না বলিয়াছিলেন, জাতিধর্ম নির্বিশেষে সকল পাকিস্তানির অধিকার সমান। তাহারা নিরাপদে, নির্বিঘ্নে এই দেশে বসবাস করিতে পারিবে। তাহাদের জীবন, তাহাদের ধনসম্পত্তি সমস্ত কিছুই এখানে সুরক্ষিত। কিন্তু যত দিন যাইতেছে তাহার উলটাটাই চোখে পড়িতেছে। স্বাধীনতার কারণে হাজার হাজার মানুষ যে অকথ্য নির্যাতন সহ্য করিয়াছে, ফাঁসির দড়িতে প্রাণ দিয়াছে তাহা কি দেশভাগের জন্য? তাহা কি পিতৃপুরুষের ভিটা হইতে উৎখাত হইয়া স্ত্রী-ছেলেমেয়ের হাত ধরিয়া চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে ভাসিয়া পড়িবার জন্য?
