একটু চুপচাপ।
হিরণ খেতে খেতে কী ভাবছিল। হঠাৎ বলে ওঠে, আরও একটা কাজ করতে হবে বিনু
বিনয় জিজ্ঞেস করে, কী কাজ?
যুগল কদিন হল, আমাদের বাসায় আসছে না। তুমি দু-চারদিনের মধ্যে সময় করে একবার মুকুন্দপুর কলোনিতে গিয়ে ওর সঙ্গে দেখা কোরো।
বিনয় অবাক হল, কেন বলুন তো?
হিরণ উদ্দেশ্যটা বুঝিয়ে দিল। যুগল মেন লাইনের আগরপাড়া থেকে প্রায়ই কলকাতায় যাতায়াত করে। শুধু সে একাই নয়, কলোনির আরও অনেকে। তারা ঝিনুককে চেনে। যুগলরা যদি ট্রেনে তাদের যাওয়া-আসার সময় লক্ষ রাখে, হয়তো ঝিনুকের দেখা পেয়ে যাবে।
থানার মতো যুগলদের কথাও ভাবেনি বিনয়। বলল, যাব। নিশ্চয়ই যাব। মনে মনে ঠিক করে ফেলে, কাল আর কোনও কলোনি বা ক্যাম্পে যাবে না। ঝিনুকের সন্ধানটা তার কাছে সবচেয়ে জরুরি। সবার আগে যেতে হবে থানায়। সেখান থেকে ফিরে চান-খাওয়া সেরে অফিসে।
.
পরদিন সকালে চা খেয়ে বিনয় যখন বাড়ি থেকে বেরুল, কুয়াশা কেটে সবে রোদ দেখা দিয়েছে।
শীতের এই সকালবেলায় কলকাতার ঘুম ভাঙলেও তার সর্বাঙ্গে ঘোর আলস্য জড়ানো। চারদিক ফাঁকা ফাঁকা, রাস্তায় লোকজন খুবই কম। দু-চারটে দোকান খুলেছে। বেশির ভাগই বন্ধ। সাইকেল পিওনরা গাড়ি চালাতে চালাতেই আশ্চর্য কৌশলে দড়ি-বাঁধা খবরের কাগজ দোতলা তেতলা বাড়িগুলোর সামনের দিকের উঁচু উঁচু বারান্দায় ছুঁড়ে ছুঁড়ে দিচ্ছে।
বড় রাস্তায় আসতেই এসপ্ল্যানেডের ট্রাম পেয়ে গেল সে। মিনিট পনেরোর ভেতর সেটা তাকে ভবানীপুর থানার সামনে পৌঁছে দিল।
ওসি দিবাকর পালিত তখনও কোয়ার্টার থেকে তাঁর চেম্বারে নামেননি। ঘন্টাখানেক পর তিনি এলেন। নিজের গদি-মোড়া নির্দিষ্ট চেয়ারটিতে বসতে বসতে জিজ্ঞেস করলেন, কখন এসেছ?
বিনয় বলল।
দিবাকর বললেন, এটা তাহলে তো অনেকক্ষণ বসে থাকতে হয়েছে। খুব আর্জেন্ট কিছু না থাকলে এত তাড়াতাড়ি আমি নামি না।
বিনয় সংকোচের সুরে বলল, জানতাম না। অনেক আগেই এসে পড়েছি।
দিবাকর বললেন, দু-আড়াই উইক পরে তোমাকে দেখলাম। কেমন আছ বল– খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বিনয়ের সব খবর নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, অবনীবাবুর চিঠিপত্তর পেয়েছ?
আশ্চর্য, সেই যে বাবা তার গুরুর আশ্রমে হরিদ্বার না উত্তরকাশী চলে গেছেন তারপর থেকে তার সঙ্গে কোনও রকম যোগাযোগ নেই। নিজেকে নিয়ে সারাক্ষণ বিনয় এমনই ব্যতিব্যস্ত, হাজার সমস্যায় এতই জড়িয়ে গেছে যে অবনীমোহনের কথা সেভাবে মনেই পড়েনি। নিজের জন্মদাতা মানুষটি বহু দূরের অচেনা, অস্পষ্ট কোনও নক্ষত্রের মতো কি বিলীন হয়ে যাচ্ছেন?
বিনয় আস্তে আস্তে মাথা নাড়ে, না, পাইনি।
কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর বিনয় জিজ্ঞেস করল, ঝিনুকের খোঁজ কি পেয়েছেন?
দিবাকরের মাথা ডাইনে থেকে বাঁয়ে এবং বাঁয়ে থেকে ডাইনে বার তিনেক ঘুরে যায়। বিমর্ষ মুখে বলেন, না। পেলে তো তোমাকে জানিয়েই দিতাম। তবে আমরা হাল ছাড়িনি, সমানে চেষ্টা করে যাচ্ছি।
বিনয় বলল, আমি ওর সম্বন্ধে কিছু খবর দিতে এসেছি।
দিবাকর সামনের দিকে ঝুঁকে বললেন, কী খবর? তার চোখে মুখে গভীর ঔৎসুক্য।
অধর ভুইমালী যা যা বলেছিল, সব জানিয়ে দিল বিনয়।
দিবাকরের শিরদাঁড়া সোজা হয়ে যায়। বললেন, আমাদের কাজটা অনেক সহজ হয়ে গেল। তুমি যে বললে সেই কু ধরে এগুবো। শিয়ালদা মেইন লাইনের ওধারে যত থানা আছে সব জায়গায় আজই ফোন করে বলব, তারা যেন তাদের এলাকায় তন্ন তন্ন করে ঝিনুকের খোঁজ করে।
আরও কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলে উঠে পড়ে বিনয়।
.
জাফর শা রোডে ফিরে বাইরে থেকে ডাকাডাকি করতে উমা এসে দরজা খুলে দিল। দোতলায় উঠতে উঠতে নিত্য দাসের গলা শুনতে পেল বিনয়। কতদিন বাদে লোকটা এ-বাড়িতে এল, মনে করতে পারল না সে। শুধু টের পেল, বুকের ভেতরটা তোলপাড় হতে শুরু করেছে। নিত্য কি হেমনাথের চিঠি নিয়ে এসেছে? রুদ্ধশ্বসে একসঙ্গে দু-তিনটে করে সিঁড়ি টপকাতে লাগল সে।
.
৪৩.
দোতলায় উঠে আসতে দেখা গেল, বাইরের ঘরে দ্বারিক দত্ত আর নিত্য দাস বসে আছে। দুজনে কথা বলছিল। এছাড়া অন্য কেউ নেই। দশটা বাজতে চলেছে। এসময় হিরণের বাড়িতে থাকার কথা নয়। সে এতক্ষণে নিশ্চয়ই অফিসে চলে গেছে। সুধাকেও দেখা গেল না। সে হয়তো ভেতরে সংসারের নানা কাজকর্মে ব্যস্ত। স্বামীকে অফিসে পাঠিয়ে দিলেই সুধার সব কর্তব্য শেষ হয়ে যায় না। তারপরও কত কাজ থাকে। অথর্ব সরস্বতীকে চান করানো, খাওয়ানো। সরস্বতীর তেত্রিশ কোটি দেবতা আছে। বুড়ো মানুষটির পক্ষে বোজ তাদের সামনে বসে ধূপদীপ জ্বালিয়ে ঠায় দেড় দুঘন্টা বসে পুজো টুজো করা সম্ভব নয়। সেই দায়িত্বটা প্রায়ই নিতে হয় সুধাকে। তাছাড়া দ্বারিক দত্তর সেবাযত্ন আছে। সাড়ে বারোটা, একটা পর্যন্ত দম ফেলার ফুরসত নেই তার। ভাবাই যায় না, বেলা দশটায় সুধা বাইরের ঘরে বসে নিত্য দাস আর দ্বারিক দত্তর সঙ্গে গল্প করবে।
বিনয়কে দেখে ব্যস্তভাবে উঠে দাঁড়ায় নিত্য দাস। বিনয় বলল, বসুন, বসুন।
ফের বসতে বসতে নিত্য বলে, হেই সাড়ে আটটা থিকা আপনের লেইগা বইসা আছি ছুটোবাবু। ঠিকই করছিলাম, যতক্ষণ না ফিরেন, উইম না।
হেমনাথের খবরের জন্য সমস্ত স্নায়ুমণ্ডলী ব্যগ্র হয়ে উঠেছে বিনয়ের। সে জিজ্ঞেস করে, দাদুর চিঠিপত্র কি এসেছে?
