বিনয় নিজের ঘরে গিয়ে খাটের বাজুতে হেলান দিয়ে পা ছড়িয়ে আধশোওয়া মতো হয়ে থাকে। রাজ্যের অবসাদ এখন তার ওপর ভর করেছে। চোখের পাতা খুলে রাখা যাচ্ছে না। শরীর এলিয়ে আসছে।
একসময় দরজার কাছে সুধার গলা শোনা গেল, বিনু–এই বিনু, ঘুমিয়ে পড়লি না কি?
ধড়মড় করে সোজা হয়ে বসে বিনয়, না না
সুধা বলে, বাথরুমে গরম জল দিয়ে এসেছি। যা বলেই রান্নাঘরের দিকে চলে যায়।
বিনয় গামছা এবং ঘরে পরার পাজামা-শার্ট নিয়ে চানঘরে গিয়ে ঢোকে। শীতের এই রাত্তিরে ফুটন্ত জলে হাত-পা ধুতে যে কী আরাম! পলকে সারাদিনের ক্লান্তির অনেকটাই কেটে যায়।
বাথরুম থেকে বেরুতে না বেরুতেই খাওয়ার ডাক পড়ে।
পাশাপাশি হিরণ, বিনয় এবং দ্বারিক দত্ত খেতে বসেছেন। দ্বারিক দত্ত রাত্তিরে দুধ খই আর একটা সন্দেশ কিংবা ছানার অন্য কোনও মিষ্টি খান। খইয়ের বদলে কোনও কোনও দিন সুজির রুটি। তবে মিষ্টিটা চাই-ই। রাত্তিরে গুরুপাক খাবার তার হজম হয় না।
সুধা কাছেই বসে আছে। দরকারমতো ভাত ডাল মাছ তরকারি হিরণ আর বিনয়ের পাতে তুলে তুলে দিচ্ছে।
সুধা বিনয়ের দিকে তাকিয়ে মনে করিয়ে দিল, তখন কী যেন বলছিলি—
বিনয় বলল, আজ একজন ঝিনুকের কথা বলল। সে কলকাতার আশেপাশেই আছে।
রান্নাঘরে তড়িৎপ্রবাহ বয়ে যায়। সুধা উত্তেজনায় প্রায় চেঁচিয়ে ওঠে, কার কাছে শুনলি?
বিনয় অধর ভুইমালীর কথা বলল।
দ্বারিক দত্ত জিজ্ঞেস করলেন, লোকটা কে? তাকে আজ তুই কোথায় পেলি?
সকালে জবরদখল কলোনি সোনার বাংলা উদ্বাস্তু পল্লিতে যাওয়া, সেখানে হঠাৎই অধরের সঙ্গে দেখা হওয়া, কোথায় কীভাবে ঝিনুককে সে দেখেছে তার সবিস্তার বিবরণ শোনা–এক নিঃশ্বাসে সমস্ত জানিয়ে দেয় বিনয়। তারপর অনন্ত আক্ষেপের সুরে বলে, অধর ভুইমালী যদি খেয়াল করে ঝিনুককে জিজ্ঞেস করত সে কোথায় যাচ্ছে, তাকে খুঁজে বার করা যেত। কিন্তু এখন আর উপায় নেই। খবর পেয়েও বোধহয় লাভ হল না। জোরে জোরে মাথা নাড়তে থাকে সে।
হতাশ, বিপর্যস্ত, হতোদ্যম বিনয়কে দেখতে দেখতে এক ধরনের আকুলতা বোধ করে হিরণ। গলায় জোর দিয়ে বলে, কেন পাওয়া যাবে না? শিয়ালদা মেন লাইন থেকে যখন ঝিনুক লোকাল ট্রেনে উঠেছে তখন ওধারে কাছাকাছি কোথাও আছে। অফিসের দিনে তো হবে না। ফি রবিবার ওই লাইনের একটা করে স্টেশনে নেমে সেখানকার রিফিউজি ক্যাম্প, কলোনি আর গ্রামগুলোতে যাওয়া দরকার। কারও একার পক্ষে সম্ভব নয়। আমি এক স্টেশনে নামব, তুমি আর-এক স্টেশনে। এতে নিশ্চয়ই কাজ হবে।
বিনয় বলল, আপনি যাবেন তা না ভাবলেও, স্টেশনে স্টেশনে নেমে আমি নিজে গিয়ে খোঁজ করার কথা চিন্তা করেছি। সেই সঙ্গে তার সংশয়ের কথাটাও জানিয়ে দেয়। বিনয়ের ধারণা, এতে তেমন কিছু হবার সম্ভাবনা খুবই কম। অনেকটা ঘন অন্ধকারে হাতড়ে বেড়াবার মতো। শিয়ালদা মেন লাইন থেকে কত দিকে কত ট্রেন যায়। স্টেশনের পর স্টেশন। সেইসব স্টেশনের দুধারে বহু দূর অবধি কত যে গ্রাম, কত যে ক্যাম্প আর কলোনি, কত যে ছোটখাটো শহর, তার কি লেখাজোখা আছে। সব জায়গায় ঘোরাঘুরি করা দুজন কেন, দশ বিশ জনের পক্ষেও এক জীবনে সম্ভব নয়। তাছাড়া মেন লাইনের ট্রেনে চড়েছে বলেই ঝিনুক চিরকাল ওই দিকে থাকবে, জোর দিয়ে তা কি বলা যায়?
হিরণ দমে যায়। এত সব খুঁটিয়ে ভাবেনি সে। কী উত্তর দেবে, ঠিক করে উঠতে পারল না।
সুধা অসীম আগ্রহে সবার কথা শুনছিল। এবার বলে ওঠে, আমি একটা উপায় বলতে পারি।
কী উপায়?
সুধা বলল, ওভাবে অন্ধের মতো ছোটাছুটি না করে বিনু বরং একবার থানায় যাক। ঝিনুক নিখোঁজ হবার পর থানায় জানানো হয়েছিল। শিয়ালদা মেন লাইনের কথা বললে হয়তো কিছু একটা হতে পারে।
কদিন আগে এই সুধাই যে ঝুমার সঙ্গে বিনয়ের বিয়ের ব্যাপারে শিশির সুনীতি আনন্দের সঙ্গে সুর মিলিয়েছিল, এখন যেন তা ভাবাই যায় না। আসলে সে ধরেই নিয়েছিল, ঝিনুককে আর পাওয়া যাবে না। নিয়ের সামনে অনন্ত ভবিষ্যৎ। একা একা কীভাবে কাটবে তার? ঝিনুক তার জীবনের যে দিকটা ফাঁকা করে দিয়েছে তা পূরণ হবে কোন উপায়ে? এই সব ভেবে চিন্তে শিশিরদের কথায় সায় দিয়েছে সে। কিন্তু যেইমাত্র জানা গেল ঝিনুক কলকাতার আশেপাশেই আছে, তার খোঁজ পাওয়া যেতেও পারে, সঙ্গে সঙ্গে ঝুমা তার মাথা থেকে বেরিয়ে গেছে। চিরদুঃখী, লাঞ্ছিত মেয়েটার জন্য সে ব্যগ্র হয়ে উঠেছে।
অধরের কাছে ঝিনুকের কথা শোনার পর থেকে বিনয় এমনই বিচলিত, এমনই ব্যাকুল হয়ে পড়েছিল যে থানার চিন্তা তার মাথাতেই আসেনি। অথচ পুলিশের বিপুল ক্ষমতা। তাদের কর্মকাণ্ডের জাল সারা পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে ছড়ানো। পাঁচ সাত মাইল পর পর একটা করে থানা।
পুলিশ এতদিন যে কিছু করতে পারেনি, কারণ তারা সঠিকভাবে জানত না, কোথায় ঝিনুককে খুঁজতে হবে। আন্দাজে আন্দাজে এলোপাতাড়ি এখানে ওখানে হাতড়াচ্ছিল। এখন ক্ষীণ হলেও একটা সূত্র পাওয়া গেছে। ওসি দিবাকর পালিতকে খবরটা দিলে তিনি নিশ্চয়ই ওই অঞ্চলের ওপর জোর দেবেন। বিনয়রা দশ বছর ছোটাছুটি করেও যা পারবে না, ওঁরা দশ দিনে তা করে ফেলবেন।
আশায়, উদ্দীপনায় চোখ মুখ জ্বলজ্বল করতে থাকে বিনয়ের। খাওয়া দাওয়া ফেলে এখনই থানায় ছোটার জন্যে উঠে পড়েছিল। দ্বারিক দত্ত হিরণ সুধা তিনজনেই বলল, এত রাতে যেতে হবে না। কাল সকালেই বরং বিনয় দিবাকর পালিতের সঙ্গে গিয়ে দেখা করুক।
