শুধু বিমলবাবুরা কেন, আর কেউ যেন না জানে।
ঠিক আছে।
শত মিনতি সত্ত্বেও বিনয় বসল না। রামরতনের স্ত্রী আর তার তিন মেয়ে সদর দরজা অবধি তার সঙ্গে সঙ্গে এল। রাস্তায় বেরিয়ে একবার পেছন ফিরে তাকায় বিনয়। দরজার ফ্রেমে এক বৃদ্ধা, এক মধ্যবয়সিনী এবং দুটি তরুণীর উজ্জ্বল, কৃতজ্ঞ মুখ স্থির হয়ে আছে।
এক মুহূর্ত চার রমণীকে দেখেই সামনের দিকে হাঁটতে শুরু করে বিনয়। আর তখনই নতুন করে সমস্ত ব্রহ্মাণ্ড তোলপাড় করে ঝিনুকের চিন্তাটা তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তাকে খুঁজে বার করতে হবে। করতেই হবে।
.
৪২.
মদন বড়াল লেনের আদ্যিকালের ঘিঞ্জি বাড়িঘর আর দোকানগুলোতে আলো জ্বলে উঠেছে। সবই অল্প পাওয়ারের মিটমিটে বাম্ব।
কর্পোরেশনের লোকেরা কখন যেন রাস্তার সারি সারি গ্যাস বাতি জ্বালিয়ে দিয়ে গেছে। বিকেল থেকে কুয়াশা পড়তে শুরু করেছিল। সেই কুয়াশা ক্রমশ গাঢ় হয়ে আলোগুলোকে ঠেসে ধরছে।
কদিন হল, এই শহরে শীতটা বেশ জাঁকিয়ে পড়েছে। উত্তুরে হাওয়ায় ছুরির ধার। গায়ে লাগলে কেটে কেটে বসে যায়। ভিড়ের ভেতর দিয়ে বড় রাস্তার দিকে যেতে যেতে বিনয় গায়ের গরম চাদরটা দিয়ে কান-মাথা ঢেকে ঘন করে সারা শরীর জড়িয়ে নিল। আজ দুপুরে ভাত খাওয়া হয়নি। সোনার বাংলা উদ্বাস্তু পল্লি থেকে অফিসে এসে চার পিস পাতলা পাতলা টোস্ট, একটা ডিম সেদ্ধ আর চা খেয়েছিল। এখন পেটে খাণ্ডবদাহন হবার কথা। কিন্তু খিদে তেষ্টার বোধটাই তেমন নেই বিনয়ের। ঝিনুকের চিন্তা অন্য সব অনুভূতিকে প্রায় ভোঁতা করে দিয়েছে। অনবরত সেটা তার মস্তিষ্কে ঘূর্ণিপাক সৃষ্টি করে চলেছে।
কর্ণওয়ালিস স্ট্রিটে সবে সে পৌঁছেছে, শ্যামবাজারের দিক থেকে একটা দুনম্বর রুটের দোতলা বাস দাপিয়ে ঝাঁপিয়ে এসে হাজির। বিনয় উঠে পড়ল।
এই বাসটা রাসবিহারী অ্যাভেনিউর মোড় ঘুরে বালিগঞ্জ স্টেশন পর্যন্ত যাবে। মোড়ের মাথায় নেমে টালিগঞ্জের বাস বা ট্রাম যা আগে পায় সেটাই ধরবে বিনয়।
হিমঋতুর এই সন্ধেবেলায়, শীতে শহর যখন হিহি কাঁপছে, কার প্রাণে এত শখ যে হাওয়া খেতে বেরোয়। বাসটা প্রায় ফাঁকাই। বিনয় পাশের সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠে একটা জানালার ধার ঘেঁষে বসল। জানালাটা অবশ্য বন্ধ। শুধু সেটাই না, সবগুলোই।
জানালাগুলোর পাল্লার ওপর এবং নিচের দিকটা কাঠের, মাঝখানে আট দশ ইঞ্চির মতো কাঁচ। সেই কাঁচের ভেতর দিয়ে বাইরের নানা দৃশ্য চোখে পড়ে।
বিনয় বাইরে তাকিয়ে ছিল ঠিকই, কিন্তু কিছুই যেন দেখছিল না। সেখানকার যাবতীয় দৃশ্য তার দৃষ্টি ছুঁয়ে ছুঁয়ে সরে সরে যাচ্ছে। রামরতনের স্ত্রী এবং তার মেয়েদের মোটামুটি একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে। আপাতত দু-তিন বছরের জন্য নিশ্চিন্ত। তার মধ্যে পাকাপাকি কিছু একটা করে ফেলা সম্ভব হবে। কিন্তু ঝিনুকের খোঁজ পাওয়া যাবে কীভাবে? কোন পদ্ধতিতে? অধর ভুইমালী শিয়ালদা স্টেশনে ঝিনুককে একটি মাঝবয়সী লোকের সঙ্গে ট্রেনে উঠতে দেখেছে। এই পলকা সুতোটুকু ধরে কতটা এগুনো সম্ভব?
দোতলা বাসটা রাস্তায় ঝড় তুলে আধ ঘণ্টার ভেতর রাসবিহারীর মোড়ে এসে গেল। সেখান থেকে ট্রাম ধরে জাফর শা রোডে বিনয় যখন পৌঁছল, আটটা বাজতে তখনও ঢের দেরি। কিন্তু এর মধ্যেই রাস্তাঘাট নিঝুম। বেশির ভাগ দোকানপাট বন্ধ হয়ে গেছে।
বারকয়েক ডাকাডাকি করতে উমা নিচে নেমে দরজা খুলে দিল। দোতলায় উঠে আসতেই দেখা গেল, বাইরের ঘরে দ্বারিক দত্ত, হিরণ আর সুধা শালটাল জড়িয়ে গল্প করছে। বিনয় যতক্ষণ না অফিস থেকে ফেরে, ওরা এখানে অপেক্ষা করতে থাকে। তাকে দেখামাত্র ত্বরিত পায়ে উঠে দাঁড়ায় সুধা। ব্যস্তভাবে বলে, আয়, আয়—
দ্বারিক দত্ত বললেন, এমন জব্বর শীত। তার ওপর এত রাত্তিরে বাড়ি ফেরা। আনন্দ তোকে একটা কাজ জুটিয়ে দিয়েছে বটে!
বিনয় বলতে পারত, পুরো ডিউটি দিলে তার ফিরতে ফিরতে সাড়ে দশটা, এগারোটা বেজে যেত। খবরের কাগজের কাজ অন্য সব অফিসের মতো দশটা-পাঁচটার বাঁধাধরা চাকরি নয়। কিন্তু দ্বারিক দপ্তর কথাগুলো তার কানেই প্রায় ঢুকল না। ভীষণ উত্তেজিত সুরে বিনয় বলল, ছোটদি, আজ কি হয়েছে জানিস?
হিরণ আর দ্বারিক দত্ত উৎসুক হয়ে ওঠেন। হিরণ বলে, কী হয়েছে?
খবরের কাগজে ঢোকার পর অফিসে কে কী করেছে, কে কী বলেছে, নতুন নতুন কাদের সঙ্গে আলাপ হল–বাড়ি ফিরেই সব খুঁটিনাটি হিরণদের জানায় বিনয়। এমনকি দিল্লি বোম্বের পুরোনো পত্রপত্রিকা ঘেঁটে পশ্চিম পাকিস্তানের নানা চমকপ্রদ ঘটনার কথাও শুনিয়েছে সে। যেমন লাহোরের ধর্ষিতা জাঠ তরুণী নীলমের কাহিনি।
সুধা আঁচ করে নিল, অফিসের সহকর্মী বা নীলমদের মতো কারও কথা বলবে বিনয়। তবে ভাইকে কিছু বলতে দিল না সে। কেননা এই মুহূর্তে সে-সব খুব একটা জরুরি নয়। সেই কোন সকালে ছেলেটা বেরিয়ে গিয়েছিল। ফিরল এই রাত্রিবেলায়। হা-ক্লান্ত। চুল উষ্কখুষ্ক, চোখ বসে গেছে। দেখামাত্র টের পাওয়া যায়, তার ওপর দিয়ে প্রচণ্ড ধকল গেছে।
সুধা হিরণদের বলল, এখন নয়। বিনু একটু জিরিয়ে নিক। হাত মুখ ধুয়ে বাইরের নোংরা জামাকাপড় পালটাক। তারপর খেতে খেতে ধীরেসুস্থে সব বলবে।
বিনয় দাঁড়িয়ে ছিল। তাকে সঙ্গে করে ভেতর দিকে চলে গেল সুধা। ভাইকে তার ঘরে পাঠিয়ে সোজা রান্নাঘরে গিয়ে স্টোভ ধরিয়ে বড় এক ডেকচি জল বসিয়ে দিল। যা শীত, গায়ে ঠাণ্ডা জল ঢাললে কী চোখেমুখে ছিটোলে চামড়া অসাড় হয়ে যাবে। আর-একটা স্টোভ ধরিয়ে উমাকে চটপট খাবার গরম করতে বলল সে।
