রামরতনের স্ত্রী ফের বললেন, কিছু কইলা না তো বাবা?
নিজের ভাবনার মধ্যে তলিয়ে ছিল বিনয়। চমকে উঠে দেখতে পায়, তার সামনে সারি সারি সেই মুখচ্ছবি। বিপুল উৎসাহে ছায়া মায়ারা তার দিকে তাকিয়ে আছে। মুখগুলো থির থির কাঁপছে। ওদের দৃঢ় বিশ্বাস, পরামাশ্চর্য কোনও জাদুকরের মতো আকাশের পরপর থেকে এই মুহূর্তে বিনয় তাদের জন্য অলৌকিক জিয়নকাঠি নামিয়ে আনবে।
বিনয় একদমে বলে যায়, ছায়া-মায়ার চাকরি হতে একটু সময় লাগবে। তবে অন্য একটা ব্যবস্থা। আমি করেছি। তাতে আপনাদের অনেকখানি সুবিধা হবে।
অসীম আগ্রহে রামরতনের স্ত্রী জিজ্ঞেস করলেন, আমাগো লেইগা কী করছ বাবা?
আমার জানালোনা, খুব বিশ্বাসী একটি লোককে দিয়ে পাকিস্তানে মাস্টামশাইয়ের ছাত্র নাসের আলির কাছে খবর পাঠিয়েছিলাম। তিনি
বিনয় শেষ করতে পারে না। তার আগেই উত্তেজিত, অধীর স্বরে রামরতনের স্ত্রী বলে ওঠেন, এই কথা আমাগো জানাও নাই তো!
বিনয় বলে, কী করে জানাবো! এর মধ্যে তো আমি আপনাদের এখানে আসতে পারিনি। হঠাৎ লোকটার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। তার সঙ্গে পাকিস্তানের নানা মানুষের যোগাযোগ আছে। সুযোগ পেয়ে সেটা কাজে লাগিয়ে দিলাম।
রামরতনের স্ত্রী স্থির বসে থাকতে পারছিলেন না। সামনের দিকে অনেকটা ঝুঁকে জানতে চাইলেন, নাসের কি কিছু করতে পারছে?
কোনও দিনই মিথ্যে বলার অভ্যাস নেই বিনয়ের। পাছে ধরা পড়ে যায় তাই কারও দিকে তাকিয়ে থাকতে পারছিল না। মুখ নামিয়ে নেয় সে। যদি গলার স্বর কেঁপে যায় তাই প্রাণপণে সেটা স্বাভাবিক রাখতে চেষ্টা করে। প্রায় মরিয়া হয়ে বলে, পেরেছে বলেই কী ভেবে, নিজের অজান্তে চোখ তুলতেই লক্ষ করল, ছায়া মায়া বাসন্তী এবং রামতনের স্ত্রীর মুখ লহমায় উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে।
রামরতনের স্ত্রী শরীরের সবটুকু শক্তি জড়ো করে আর-একবার বিনয়ের হাত জড়িয়ে ধরেন। থর থর, ব্যাকুল স্বরে জিজ্ঞেস করেন, কী করছে কও
বিনয় বলল, আপনাদের জামতলির চাষের জমি আর বাড়ির খদ্দের পেয়ে গেছেন। বিক্রির সময় মাস্টারমশায়ের দেশে গিয়ে রেজিষ্ট্রি করে দেবার কথা ছিল। কিন্তু তিনি তো নেই। নাসের আলি কী একটা বন্দোবস্ত করেছেন। তাতে বিক্রিতে অসুবিধা হবে না। দু-এক সপ্তাহের মধ্যে বেচে টাকা পাঠিয়ে দেবেন।
বালিকার মতো হাউ হাউ করে কেঁদে ওঠেন রামরতনের স্ত্রী, তুমি আমাগো বাঁচাইলা বাবা। ভগবান তোমার মঙ্গল করব। আমার মাথায় যত চুল আছে তত বছর তোমার পরমায়ু হউক। প্রচুর মঙ্গলকামনা এবং আশীর্বাদের পর বললেন, তোমার লোকেরে দিয়া নাসেরেরে জানাইয়া দিও, ভগবান তারও ভাল করব। হে আমার পোলার কাম করছে।
অকপট, ছলচাতুরিহীন চারটি রমণীর সঙ্গে মিথ্যাচার করতে তীব্র অপরাধবোধে কুঁকড়ে যাচ্ছিল বিনয়। নিজের কাছেই ভীষণ ছোট হয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে, আয়নার সামনে দাঁড়ালে সে নিজের কালিমাখা মুখ দেখতে পাবে। একটার পর একটা ফাঁসে জড়িয়ে পড়ছে সে। তবে সবচেয়ে যেটা তার বিবেকে শেল বিধিয়ে চলেছে তা হল মৃত নাসের আলির নামে মিথ্যে বলা। এজন্য অনুশোচনার শেষ নেই তার। পরক্ষণে নিজের মনেই সান্ত্বনা খোঁজে, নাসের আলি কোনও দিনই ফিরে আসবেন না। তাঁর নামে মিথ্যে বললে চারটি মানুষ যদি বেঁচে যায় তাতে খুব একটা অন্যায় কি হয়েছে? নাসেরের আত্মার প্রতি হাজার বার ক্ষমা চেয়ে নেয় বিনয়। তারপর জড়ানো স্বরে বলে, আপনার কথাগুলো জানিয়ে দেব।
আমাগো লেইগা এত করতে আছ। আর-একখান কাম কইরো বাবা
বলুন কী কাজ?
নাসের টাকাটা পাঠাইলে ভাল জাগায় ঘর ভাড়া কইরা দিবা।
বিনয় আস্তে মাথা নাড়ে, দেব।
শীতের সন্ধে ঝপ করে নেমে আসে। তারই তোড়জোড় চলছে। ঘরের ভেতরটা আবছা অন্ধকারে ভরে গেছে। বাসন্তী উঠে সুইচ টিপে আলো জ্বালিয়ে দিল।
বিনয় বলল, আমাকে অনেক দূর যেতে হবে। আজ উঠি।
শশব্যস্ত রামরতনের স্ত্রী বললেন, ওই দ্যাখো, নিজেগো চিন্তা নিয়াই দিনরাইত ডুইবা থাকি। কহন আইছ। কিছুটুক তো দেই নাই। ছায়া-মায়া অক্ষণই চা কইরা নিয়া আয়। আর দ্যাখ, মিঠাই টিঠাই কী আছে–
ছায়া-মায়া রান্নাঘরের দিকে দৌড়ে যাচ্ছিল, হাত তুলে তাদের থামিয়ে উঠে দাঁড়ায় বিনয়, আজ থাক। সেই সকালে বেরিয়ে অনেক জায়গায় ঘুরতে ঘুরতে আসছি। ভীষণ ক্লান্ত লাগছে।
রামরতনের স্ত্রীও উঠে পড়েছিলেন। বললেন, চা বানাইতে কতক্ষণ আর লাগব। এট্ট বইসা যাও বাবা, বইসা যাও। নিজেগো কথা কইতে কইতে মাথার ঠিক আছিল না। কী অন্যায় যে হইয়া গ্যাল! যে যুবকটি তাদের জন্যে এমন এক সুসংবাদ বয়ে এনেছে, যা ছিল স্বপ্নেরও বাইরে, অকল্পনীয়, তাকে সামান্য একটু খাতিরযত্নও করা হয়নি। এর জন্য আক্ষেপের শেষ নেই বৃদ্ধার।
বিনয় ম্লান হাসে, কোনও অন্যায় হয়নি। কদিন পরে তো টাকা নিয়ে আসছি। তখন চা-মিষ্টি যা দেবেন, খেয়ে যাব। বেরুবার জন্য পা বাড়াতে গিয়ে কী ভেবে দাঁড়িয়ে পড়ে সে, দেখুন একটা কথা বলতে সংকোচ হচ্ছে। তবু না বললেই নয়।
আমাগো কাছে তোমার কীসের সংকোচ। মন খুইলা কও
টাকার কথাটা আপনারা চারজনই শুধু জানবেন। অন্য কারওকে বলবেন না।
নিষ্পলক কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকেন রামরতনের স্ত্রী। সংকেতটা তিনি ধরতে পেরেছেন। ধীরে ধীরে বললেন, বুঝছি। বিমলগো কইতে নিষেধ করতে আছ।
