বিমলকে বিনয় যতটুকু দেখেছে তাতে মনে হয়েছে, সে খুবই ভদ্র, শান্ত এবং কর্তব্যপরায়ণও। শত কষ্ট আর টানাটানির মধ্যেও সে ছায়া-মায়াদের দায়িত্ব নিতে চায়। কিন্তু আগুনখাকী স্ত্রীর ভয়ে তা নেবার মতো শিরদাঁড়ার জোর তার নেই।
দীপ্তিকে দেখেনি বিনয়। তবে তার সম্বন্ধে যে ধারণাটুকু হয়েছে তা আদৌ সুখকর নয়। দীপ্তি আজ এখানে থাকলে হয়তো এমন ঘোর অশান্তির সৃষ্টি করত, গনগনে রাগে এমন বিষ ঢেলে দিত যে অস্বস্তির সীমা-পরিসীমা থাকত না বিনয়ের। হাজার হোক, সে বাইরের লোক। অনাত্মীয়।
চাতাল পেরিয়ে ডানদিকের বারান্দায় উঠতে উঠতে ভীষণ ব্যস্ত হয়ে পড়ে বাসন্তী। কণ্ঠস্বর উঁচুতে তুলে এক নিঃশ্বাসে ডাকতে থাকে, ছায়া মায়া মা, তরাতরি বাইরে আসো। দ্যাখো কে আইছে।
বাসন্তীর ডাকে এত আকুলতা আর উত্তেজনা মেশানো ছিল যে বিনয় অবাক হয়ে যায়। ওদিকে সামনের ঘরটা থেকে বেরিয়ে এসেছেন রামরতনের স্ত্রী। বাঁ ধারের রান্নাঘরের দিক থেকে ছুটে আসে ছায়া আর মায়া।
রামরতনের স্ত্রী কাঁপা কাঁপা পায়ে এগিয়ে গিয়ে বিনয়ের একটা হাত ধরে ঘরের ভেতরে টেনে নিয়ে চেয়ারে বসান। প্রথম দিনও এই ঘরেই তাকে বসানো হয়েছিল।
ঘরের এক পাশে একফালি তক্তপোশ আধময়লা চাদরে ঢাকা। সেখানে বসলেন রামরতনের স্ত্রী। বললেন, হেই দিন কইয়া গেছিলা শিগগির আইবা। এতকাল পর আমাগো কথা মনে পড়ল? চিন্তা হইতে আছিল আমাগো বুঝিন ভুইলাই গ্যাছে।
বিনয় অপ্রস্তুত। দুর্বল, মিনমিনে গলায় একটা কৈফিয়ৎ অবশ্য দিল। রামরতনের স্ত্রী এবং মেয়েদের সে কি ভুলতে পারে? সারাক্ষণ তাঁদের চিন্তা তার মাথায় রয়েছে। কিন্তু নানা পাকে এমন জড়িয়ে গেছে যে সে-সব থেকে বেরুতে পারে না। তার ওপরে নতুন চাকরি। প্রচণ্ড কাজের চাপ। ইত্যাদি ইত্যাদি। বিনয় যা বলল তার একটি বর্ণও বানানো নয়। তবু সামান্য একটু খিচ থেকেই যাচ্ছে। এরই মধ্যে একটু সময় বার করে সে কি দু-এক ঘণ্টার জন্য মদন বড়াল লেনে আসতে পারত না?
বাসন্তী মায়ের পাশে নিঃশব্দে বসে পড়েছিল। মৃদু গলায় বলল, আপনের অবস্থান আমরা বুঝি। কিন্তুক আপনে ছাড়া কইলকাতায় আমাগো আর কুনো ভরসা নাই।
বাসন্তী তার চেয়ে বয়সে অনেক বড়। কিন্তু আপনি করে বলে। এতে অস্বস্তি হয় বিনয়ের। সে ভাবল, বাসন্তীকে তুমি করে বলতে বলবে। কিন্তু তার আগেই রামরতনের স্ত্রী শুরু করলেন, অ্যাদ্দিন পর আইছ। মনে যে কী বল পাইতে আছি, বুঝাইয়া কইতে পারুম না। জানি, আমাগো লেইগা কিছু একটা ব্যাবোস্তা না কইরা তুমি আসো নাই।
বিনয় চমকে ওঠে। কাছাকাছি বসে আছেন রামরতনের স্ত্রী এবং বাসন্তী। দরজার মুখে দাঁড়িয়ে ছায়া আর মায়া। ধীরে ধীরে সবাইকে একবার দেখে নিল বিনয়। সারি সারি মুখগুলি অনন্ত প্রত্যাশায় জ্বল জ্বল করছে। সেই সঙ্গে খানিক উৎকণ্ঠাও মেশানো। সবাই দমবন্ধ করে তার দিকে তাকিয়ে আছে, পলকহীন।
হঠাৎ তীব্র শীত লাগার মতো কাপুনি ধরে যায় বিনয়ের। সেটা হৃৎপিণ্ডের, না কি মস্তিষ্কের কোনও গোপন কেন্দ্র থেকে উঠে এসে ডালপালার মতো ছড়িয়ে পড়ছে সারা শরীরে? সে তো ঝুলি বোঝাই করে অনেকগুলো পারিনি নিয়ে এসেছে। ছায়া-মায়ার চাকরি? জোগাড় করা সম্ভব হয়নি। এমনকি আনন্দ বা হিরণের সঙ্গে কথাও বলে উঠতে পারেনি। এ-সব জানাতেই এসেছিল। তার ওপর রামরতনের জামতলির জমিজমা বেচতে গিয়ে নাসের আলি খুন হয়ে গেছেন–সেই দুঃসংবাদটা দিতেও। কিন্তু চারটি অসহায় রমণী এই শহরে তাকেই শেষ অবলম্বন হিসেবে আঁকড়ে ধরেছে। কিন্তু বিনয় কীভাবে একের পর এক এতগুলো খারাপ খবর মুখ থেকে বার করবে, ভেবে পেল না।
রামরতনের স্ত্রী করুণ বিলাপের সুরে একনাগাড়ে বলতে লাগলেন, বিমলের বউ হেই যে তার বাপের বাড়ি গ্যাছে, আমরা যদ্দিন আছি, হে আর ফিরব না। এই বাড়ির ভাত গলা দিয়ে আর নামতে চায় না বিনয়। অহন কও, আমাগো লেইগা কী করছ? ছায়া মায়ার কাম কাইজ কিছু হইল?
উত্তর দিতে গিয়ে থমকে গেল বিনয়। তার মস্তিষ্কে আচমকা বিদ্যুত্তরঙ্গ ঝলসে ওঠে। আশ্চর্য ভোজবাজিতে স্মৃতির ঝাপি খুলে যায়। তাদের প্রিয়নাথ মল্লিক রোডের বাড়িটা বেচে অবনীমোহন তার যাবতীয় ঋণশোধ করে গুরুর আশ্রমে চলে গেছেন। পাওনা-গণ্ডা মিটিয়ে দেবার পরও তেত্রিশ হাজার টাকা বেঁচেছে। সুনীতি সুধা আর তার নামে ব্যাঙ্কে সেটা জমা করা আছে। এর তিন ভাগের এক ভাগ, অর্থাৎ এগারো হাজার তার প্রাপ্য। সেই টাকাটা, এমনকি পুরো তেত্রিশ হাজারও যদি সে নেয়, দুই দিদি এতটুকু আপত্তি করবে না। বিনয় ঠিক করে ফেলল, নিজের অংশের টাকাটা আপাতত রামরতনের স্ত্রী এবং মেয়েদের দিয়ে দেবে।
এগারো হাজার বেশ মোটা অঙ্কের টাকা। সস্তাগণ্ডার দিন, সুখের সময় কবেই শেষ হয়ে গেছে। জিনিসপত্র অগ্নিমূল্য। তবু ওই টাকায় ভদ্র-পাড়ায় ঘর ভাড়া নিয়ে ওরা দু-তিনটে বছর নিশ্চিন্তে, মোটামুটি সচ্ছলভাবে কাটিয়ে দিতে পারবে। তার ভেতর ছায়া মায়ার কাজ কি আর জুটবে না? নিশ্চয়ই জুটবে।
বিনয়ের চিন্তাপ্রবাহ এক জায়গায় স্থির থাকছে না। ভাবনার প্রক্রিয়াটা নানাভাবে চলছে। সে এর মধ্যেই ভেবে নিল, টাকাটা একবারে রামরতনের স্ত্রীর হাতে তুলে দেবে না। শহরে চোর-ঘেঁচোড় ফেরেববাজ থিকথিক করছে। চারটি নিপাট সরল সাদাসিধে রমণী কলকাতায় এই প্রথম পা ফেলেছে। এখানকার ফন্দিবাজদের সম্বন্ধে তাদের কোনও ধারণাই নেই। তারা জানে না, টিকে থাকতে হলে কতরকম কৌশলের দরকার। হয়তো ফস করে টাকার কথা সবার সামনেই বলে ফেলল। তারপর সেটা খোয়া যেতে কতক্ষণ? তাই টাকাটা খেপে খেপে দেবে বিনয়। বলবে, সীমান্তের ওপার থেকে যেমন যেমন আসছে, তেমন তেমন দিয়ে যাচ্ছে।
