মনের গতিবিধি বোঝা ভার। কখন যে সোজা সরল পথে চলতে চলতে হঠাৎ সেটা মোড় ঘুরে কোন দিকে ছুটবে আগেভাগে তার হদিস মেলে না। ঝিনুকের ভাবনাটা সরে গিয়ে হঠাৎই ছায়া-মায়াদের মুখগুলি চোখের সামনে ভেসে ওঠে। বিনয় কথা দিয়েছিল, খুব শিগগিরই তাদের সঙ্গে দেখা করতে যাবে। হাজার ঝঞ্ঝাটে এমন জড়িয়ে গিয়েছিল, যে যাওয়া হয়নি। কথা দিয়েছিল, রামরতন গাঙ্গুলির দুই মেয়ের কাজের জন্য আনন্দ আর হিরণকে বলবে। বলা হয়নি। অথচ পদে পদে লাঞ্ছিত চার রমণী তারই জন্য উদগ্রীব হয়ে আছে। তাদের অফুরান আশা, সে একটা কিছু করে দেবে যাতে এই শহরে তারা সসম্মানে বেঁচে থাকতে পারে। তাছাড়া, ওরা কিছু বলেনি, বিনয় নিজের থেকেই নিত্য দাসকে দিয়ে নাসের আলির কাছে খবর পাঠিয়ে জানতে চেয়েছিল, রামরতন গাঙ্গুলির পাকিস্তানের বিষয় আশয়ের কোনও ব্যবস্থা তিনি করতে পেরেছেন কি না। কলকাতায় ছায়া-মায়ার কাজকর্ম যদি কিছু না জোটে, দেশের জমিবাড়ি বিক্রির টাকাটা ছিল ওদের শেষ ভরসা। কিন্তু সেখানেও চরম বিপত্তি ঘটে গেছে। প্রাক্তন মাস্টার মশায়ের সম্পত্তি বেচতে গিয়ে সৎ, সাহসী, দায়িত্ববান নাসের আলি খুন হয়ে গেছেন। এই দুঃসংবাদটা ছায়া-মায়াদের জানিয়ে আসা উচিত ছিল। অলীক দুরাশা নিয়ে আজীবন তারা অপেক্ষা করবে, তা তো হয় না।
বিনয়ের মনে হল, সে বড় বেশি আত্মকেন্দ্রিক। নিজের সমস্যা আর সংকট নিয়েই সর্বক্ষণ মগ্ন থাকে। এই মুহূর্তে তীব্র অপরাধবোধে সে কুঁকড়ে যায়। নিজেকে ধিক্কার দিতে দিতে ঠিক করে ফেলে, প্রসাদ লাহিড়ি যখন আজ অনেক আগে আগেই ছুটি দিয়ে দিয়েছেন, এখনই টালিগঞ্জে যাবে না। সোজা রামরতন গাঙ্গুলির স্ত্রী এবং মেয়েদের সঙ্গে গিয়ে দেখা করবে।
সেন্ট্রাল অ্যাভেনিউর বাস স্টপেজে দাঁড়াল না বিনয়। ফুটপাথ ধরে আরও খানিকটা এগিয়ে ডান পাশের বাঁক ঘুরে কর্ণওয়ালিস স্ট্রিটের ক্রসিংয়ে চলে এল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে শ্যামবাজার রুটের ট্রাম এসে গেল।
চিত্রা সিনেমার কাছে নেমে রাস্তা পেরিয়ে ওধারে মদন বড়াল লেনে ঢুকে পড়ে বিনয়। মিনিট দুই হাঁটার পর বিমল গাঙ্গুলিদের সেকেলে তেতলা ভাড়াটে বাড়িটার সামনে চলে আসে। সদর দরজা হাট করে খোলা। ভেতরের মস্ত চাতালে নানা বয়সের মেয়েলোক আর বাচ্চাকাচ্চাদের জটলা। প্রায় সবাই কথা বলছে। ফলে গোটা চাতাল জুড়ে চলছে কলরোল।
বিনয় জানে, বিমল গাঙ্গুলি এখন অফিসে রয়েছে। তবু তারই নাম ধরে ডাকতে লাগল, বিমলবাবু–বিমলবাবু ছায়া কি মায়াকেও ডাকতে পারত কিন্তু যুবতী মেয়েদের ডাকতে কেমন যেন সংকোচ হল।
বেশিক্ষণ দাঁড়াতে হয় না। গেটের মুখে ছায়া বা মায়া নয়, তাদের বিধবা দিদি বাসন্তী এসে দাঁড়ায়। বিনয়কে দেখে তার চোখেমুখে আলোর ছটা খেলে যায়। ব্যগ্র গলায় বলে, আপনে আসছেন। আসেন–আসেন–
গেট পেরিয়ে বিনয় ভেতরে ঢুকল।
.
তিরিশ নম্বর মদন বড়াল লেনের এই বাড়িতে এর আগে মাত্র একবারই এসেছিল বিনয়।
সে কোনও দিকে তাকাল না। চাতাল পেরিয়ে যেতে যেতে জিজ্ঞেস করল, বিমলবাবু কি বাসায় আছেন?
বাসন্তী বলল, না। অফিসে
এসময় বিমলের অফিসে থাকারই কথা। কিন্তু কোনও কারণে যদি না গিয়ে থাকে, সেই জন্যই জানতে চাওয়া। বিনয় স্বস্তি বোধ করে। বিমল যদিও ভালমানুষ, জীবনে তাকে দাঁড় করিয়ে দেবার জন্য মৃত রামরতন গাঙ্গুলি এবং তার পরিবারের সবার প্রতি অত্যন্ত কৃতজ্ঞ, তবু তার সামনে রামরতনের স্ত্রী আর মেয়েদের পক্ষে নিজেদের ক্ষোভ, কষ্ট এবং অসম্মানের কথা খোলাখুলি জানানো সম্ভব নয়।
আচমকা কিছু মনে পড়ায় চকিত হয়ে ওঠে বিনয়, আগের বার যখন আসি বিমলবাবুর স্ত্রী ছিলেন না। তিনি কি কথাটা শেষ করে না সে।
ইঙ্গিতটা ধরতে পেরেছিল বাসন্তী। চাপা গলায়, হয়তো একটু বিব্রতভাবে বলল, না, হেই যে বাপের বাড়ি গেছিল, অহনও ফিরে নাই।
বিনয়ের মনে পড়ে, সেবার এসে বিমলের স্ত্রীর বাপের বাড়ি যাবার কথা শুনে গিয়েছিল। এতদিন নিজের ঘর-সংসার ফেলে মা-বাবার কাছে থাকার কারণ কী? সেটা যাই হোক, স্বস্তিটা সহস্র গুণ বেড়ে যায় বিনয়ের। প্রথম দিন এসে সে জেনে গেছে, বিমলের স্ত্রী দীপ্তিই রামরতনের স্ত্রী এবং মেয়েদের জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছে। স্বার্থপর, ঝগড়াটে, রণচণ্ডী ধরনের মহিলাটি চায় না এক দণ্ডও জেঠ-শশুরের পরিবারটি তাদের ঘাড়ে চেপে থাকুক। কবে, কোন জন্মে বিমলকে রামরতন কোলে পিঠে করে বড় করে তুলেছেন, কলকাতায় পাঠিয়ে লেখাপড়া শিখিয়ে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন, সেজন্য তার স্ত্রী এবং মেয়েদের বোঝা বইতে হবে, তার কোনও মানে নেই। কলকাতা শহরে রেশনের চাল চিনি আটা, খোলা বাজারের মাছ আনাজ তেল ডাল মশলার দাম চড় চড় করে বেড়ে চলেছে। হাল যখন দ্রুত খারাপ হচ্ছে, চারটে মানুষের দায় নেওয়া কি মুখের কথা? পাঁচ-দশ দিন, কি দুচার মাস হলে না হয় কৃষ্টেসৃষ্টে চালিয়ে নেওয়া যেত, কিন্তু অবস্থা যা তাতে আজীবন তাদের টানতে হবে। তার ওপর দুটো মেয়ের ভরা যৌবন। দুই পূর্ণ যুবতাঁকে তো চিরকাল গলায় ঝুলিয়ে বসে থাকা যাবে না। লোকে ছি ছি করবে। কিন্তু দুম্বো মেয়ে দুটোকে পার করা মুখের কথা নয়। ঘরে তো টাকার পাহাড় জমানো নেই। নেই কাড়ি কাড়ি সোনাদানা। বিয়ে দিতে হলে ধারে দেনায় মাথার তালু অবধি ডুবতে হবে। তারপর? নিজেদের ভবিষ্যৎ আছে। ছেলেমেয়ের পড়াশোনা আছে। অসুখবিসুখের খরচ আছে। মেয়ের বিয়ে আছে। কাজেই ঘাড় থেকে আপদ নামানো দরকার। আর সেজন্যই দীপ্তি সারাক্ষণ অগ্নিমূর্তি হয়ে থাকে। প্রতিটি ভাতের দলা মুখে তোলার সঙ্গে সঙ্গে চোখের জলে ভাসতে ভাসতে রামরতনের স্ত্রী এবং মেয়েরা টের পায়, বিমলের সংসারে বেঁচে থাকাটা কতখানি গ্লানিকর, কতটা দুঃসহ।
