কয়েক পলক রমেনকে দেখে প্রসাদের দিকে তাকায় বিনয়। তার মতো আনকোরা এক প্রতিবেদকের লেখা সম্পর্কে চিফ রিপোর্টারের ধারণা এত উঁচু যে লেখা পড়ারও দরকার মনে করেননি। এটা বিনয়কে এমনই চনমনে করে তুলেছে যে তার মনে হল, রমেনের মতো একটা বাজে, হিংসুটে লোকের চিন্তাকে প্রশ্রয় দেবার মানে হয় না। তার কথা যত ভাববে ততই রাগ চড়ে যাবে। উত্তেজনা বাড়বে। কাজকর্মে মন বসবে না। এই পৃথিবীতে বিষাক্ত কীটের অভাব নেই। তারা সুযোগ পেলেই হুল ফোঁটায়, বিষ ঢালে। কিন্তু কী আর করা যাবে? এই নিয়েই থাকতে হবে।
ঝিনুকের ভাবনাটা কিছুক্ষণের জন্য চাপা পড়ে ছিল। সেটা আবার মস্তিষ্কের গোপন কুঠুরি থেকে বেরিয়ে এল। অধর ভুইমালী যা ইঙ্গিত দিয়েছে, তাতে বনগাঁ কি নৈহাটি-কাঁচরাপাড়া লাইনে, কলকাতা থেকে চল্লিশ পঁয়তাল্লিশ মাইলের মধ্যে ঝিনুকের থাকার সম্ভাবনা। ওই সব এলাকার রিফিউজি ক্যাম্প টম্পে সে আছেই, এমন কথা জোর দিয়ে বলতে পারেনি অধর। তবু ওই জায়গাগুলোতে খোঁজ নেওয়া ভীষণ জরুরি। কিন্তু ওই অঞ্চলের ক্যাম্প আর কলোনিগুলোর ঠিকানা বিনয়ের জানা নেই।
লেখা জমা দেওয়া হয়ে গেছে। তারপরও বিনয়কে বসে থাকতে দেখে প্রসাদ জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি আর কিছু বলবে?
বিনয় ঘাড় কাত করে, হা–
বল না—
আপনি আমাকে যে লিস্টটা দিয়েছেন তাতে যাদবপুর নাকতলা গড়িয়া নিউ আলিপুর, এই এলাকাগুলোর ক্যাম্প আর কলোনির নাম, অ্যাড্রেস রয়েছে। কিন্তু শিয়ালদা নর্থ আর মেন লাইনেও অনেক কলোনি রয়েছে। আপনি কিন্তু সেগুলোর নাম-ঠিকানা দেননি।
প্রসাদ বললেন, যা দিয়েছি সে-সব কভার করতেই অনেকদিন লেগে যাবে। আগে সাউথটা শেষ কর। তারপর শিয়ালদা মেন আর নর্থ ধরবে
কিন্তু
না না। যা অ্যাসাইনমেন্ট দেওয়া হয়েছে তার বাইরে এখন অন্যদিকে ছোটাছুটির দরকার নেই।
প্রয়োজনটা কী কারণে, সেটা প্রসাদকে জানানো যায় না। তবু মরিয়া হয়ে বিনয় বলল, আমি ওই দিকের মুকুন্দপুর বাস্তুহারা কলোনি বলে একটা কলোনিতে মাঝে মাঝে যাই। অন্যগুলোর নাম জানা থাকলে
প্রসাদ একটু বিরক্তই হলেন, তা যেতে পার, কিন্তু ওদিকে আর কোথাও আপাতত যেতে হবে না।
ফের কিছু বলতে সাহস হল না বিনয়ের। হতাশ ভঙ্গিতে সে উঠে দাঁড়িয়েছিল, হঠাৎ হাজিরার কথা মনে পড়ায় আবার বসে পড়ে। কাচুমাচু মুখে বলে, আমার একটা অন্যায় হয়ে গেছে প্রসাদদা
প্রসাদ অবাক হলেন, কী অন্যায়?
সকালে আমি সোনার বাংলা উদ্বাস্তু পল্লিতে গিয়েছিলাম। সেখানে কাজ সেরে অফিসে আসতে আধ ঘণ্টা লেট হয়ে গেছে। কিন্তু আমি অ্যাটেনডান্স রেজিস্টারে সই করে ফেলেছি।
বেশ করেছ। তুমি তো অফিসের কাজেই গিয়েছিলে। তখন থেকেই তোমার ডিউটি আওয়ার্স শুরু হয়েছে। কাজ কমপ্লিট করে অফিসে পৌঁছতে যদি দু-এক ঘণ্টা দেরিও হয়, কোনও সমস্যা নেই। যেদিন অ্যাসাইনমেন্ট শেষ করতে আরও দেরি হবে সেদিন অফিসে আসবে না। পরদিন এসে সই করবে। ঠিক আছে?
আচ্ছা
একটু ভেবে প্রসাদ ব্যস্তভাবে বললেন, সেই সকালে বেরিয়েছ, বললে না?
বিনয় মাথা নাড়ে, হ্যাঁ।
দুপুরে ভাতটাত খাওয়া হয়েছে?
না। অফিসে এসে ডিম টোস্ট খেয়েছি। রাত্তিরে ফিরে ভাত খাব।
না না, এটা কোনও কাজের কথা নয়। যদ্দিন না অফিসের ক্যানটিন পুরো চালু হচ্ছে, সকালে বাড়িতে সব রান্না না হয়ে উঠলেও দুটি ভাতে ভাত অন্তত খেয়ে বেরিয়ো। মনে থাকবে?
হ্যাঁ।
সারাদিন পেটে ভাত পড়বে না, ছাতা মাতা খেয়ে কাটাবে। তার ওপর এত পরিশ্রম। এভাবে বেশিদিন টানতে পারবে না। শরীর ভেঙে যাবে। আজ আর তোমার অফিসে থাকার দরকার নেই। বাড়ি চলে যাও।
প্রসাদ লাহিড়িকে কী আশ্চর্য স্নেহময়, সহৃদয় মানুষই না মনে হচ্ছে বিনয়ের। তার সব দিকে নজর। শরীর খারাপ হবে বলে কত চিন্তা! অথচ শিয়ালদা নর্থ আর মেন লাইনের রিফিউজি ক্যাম্প আর কলোনির নাম-ঠিকানাগুলো কিছুতেই দিলেন না। একদিকে যেমন ভালও লাগছে, অন্যদিকে ক্যাম্প-কলোনির ঠিকানা না পাওয়ায় অভিমানও হচ্ছে। বিনয় আর বসে না, ধীরে ধীরে উঠে পড়ে।
৪১-৪৫. বাস স্টপেজের দিকে
৪১.
অফিস থেকে বেরিয়ে বাস স্টপেজের দিকে যেতে যেতে বিনয়ের চোখে পড়ল, হিমঋতুর বিকেল ফুরিয়ে আসছে। পশ্চিম দিকের উঁচু উঁচু বাড়িগুলোর মাথায় স্থির চিত্রের মতো শেষ বেলার সূর্যটা দাঁড়িয়ে আছে। তার লাল রং ফিকে হয়ে এসেছে। কিছুক্ষণ পর ওটা আর থাকবে না। ঝুপ করে বড় বড় ইমারতের আড়ালে নেমে যাবে।
এর মধ্যেই মিহি কুয়াশা পড়তে শুরু করেছিল। আকাশে হুল্লোড় বাধিয়ে নানা রঙের বিভ্রম তৈরি করে উড়ে চলেছে অজস্র পাখি। সেন্ট্রাল অ্যাভেনিউর দুধারের ফুটপাথে কত যে মাথা-উঁচু, ঝাড়ালো গাছ। শীতের বাতাস সেগুলোর ঝুটি ধরে নাড়া দিতে দিতে বয়ে চলেছে।
দুপুরবেলার আলস্য ঝেড়ে শহর এখন সরগরম। রাস্তায় প্রচুর লোকজন। প্রচুর যানবাহন।
বিনয়ের মাথায় অবিরল ঝিনুকের ভাবনাটা চলছিল। কীভাবে মেয়েটাকে খুঁজে বার করবে, ঠিক করে উঠতে পারছিল না। আচমকা একটা রাস্তার নিশানা যেন পেয়ে যায় সে। কাজের দিনগুলোতে সময় পাওয়া যাবে না; অফিসের ডিউটি থাকবে। কিন্তু ছুটির দিনগুলো পুরোপুরি তার নিজস্ব। সেই সব দিনে শিয়ালদায় গিয়ে নর্থ কি মেন লাইনের লোকাল ট্রেন ধরে কোনও একটা স্টেশনে নেমে পড়বে সে। স্থানীয় মানুষজনকে জিজ্ঞেস করে করে জেনে নেবে ওখানে কোনও রিফিউজি কলোনি বা ক্যাম্প আছে কি না। যদি থাকে, সেখানে চলে যাবে। এভাবে কাজের কাজ কিছু হবে কি না তার জানা নেই। তবু চেষ্টা তো করতে হবে।
