রমেন হেসে হেসে বলে, আরে ভাই তোমার কতবড় একখান উচা (উঁচু) চঙ্গ আছে ভাইরা দেখ।
বিনয় বলল, চঙ্গ!
হ-চঙ্গ। ল্যাডারল্যাডার, পশ্চিমবঙ্গে যারে কয় মই।
রমেনের কথা বলার ধরনটা ভাল লাগল না বিনয়ের। কোথায় যেন একটা নোংরা সংকেত রয়েছে। সে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে।
রমেন এবার বলে, ক্লিয়ার কইরা বলি। তোমার ভগ্নীপতি আনন্দবাবু হইলেন তোমার ল্যাডার। যার এমুন চঙ্গ আছে সে ভাইগ্যবান না? তার মুখের হাসিটা আরও ছড়িয়ে পড়ে।
এবারও জবাব দেয় না বিনয়। দেখাই যাক, আনন্দকে নিয়ে লোকটা কতদূর যায়।
কণ্ঠস্বর ঝপ করে অনেকখানি নামিয়ে দিয়ে রমেন এবার বলল, একখান সুখবর শোনলাম।
কী সুখবর?
বিনয়ের দিকে ঝুঁকে চাপা গলায় রমেন বলে, মার্কেটে আমাগো কাগজ বাইর হওনের একমাসের মইধ্যে তোমার নিকি পোমোশন হইব।
প্রোমোশন? মানে?
নিপাট ভালমানুষের মতো মুখ করে রমেন বিশ্বাস বলল, সোজা কথাখান বোঝো না? তোমোশন হইল পদোন্নতি।
কী বলছে লোকটা! মাত্র কদিন হল হল নতুন ভারত-এ চাকরি পেয়েছে সে। এর ভেতর খোমোশন। মাথার ভেতরটা কেমন যেন গুলিয়ে যায় বিনয়ের। কী উত্তর দিতে যাচ্ছিল তার আগেই রমেন ফের বলে ওঠে, শুনতে আছি ডেপুটি চিফ রিপোর্টার হইয়া তুমি আমাগো মাথার উপুর । বসবা (বসবে)।
শিরদাঁড়া টান টান হয়ে গিয়েছিল বিনয়ের। লোকটার মতলব ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। দাঁতে দাঁত চেপে বিনয় জিজ্ঞেস করে, আপনাকে কথাটা কে বলেছে?
খুব শান্ত গলায় রমেন বলে, কইছে কেউ?
কে সে?
তার নাম কওনটা (বলাটা ঠিক না। বিশ্বাসভঙ্গ হইব। ভাই তোমার ভগ্নীপতির লগে আমাগো কাগজের মালিক জগদীশ গুহঠাকুরতার এত কাতির। তিনি রেম্যান্স করলে একটা প্রোমোশন হইব না, হেই কখনও হয়! তোমারে অ্যাডভান্স অভিনন্দন জানাইয়া রাখি।– এই লোকটারমেন বিশ্বাস–বিষপোকার মতো আবার হুল ফুটিয়ে দিয়েছে। সহ্যের শেষ সীমায় পৌঁছে গিয়েছিল বিনয়। ক্রোধে, উত্তেজনায় মাথার ভেতরটা যেন ফুটতে থাকে। শিরায়ু বুঝিবা ছিঁড়ে পড়বে। নিজের অজান্তেই সে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে দেয়। –উঠুন উঠুন, তারাপদদার ঘরে নিয়ে যাই। দরকার হলে জগদীশবাবুর চেম্বারেও টানতে টানতে নিয়ে যাব। আমি জানি কেউ আপনাকে এ-সব বলে নি। ইউ আর এ ডার্টি পার্সন। প্রথম দিন থেকে আপনি আমার পেছনে লেগে আছেন। এই ইতরামোর শেষ আমি দেখতে চাই।
বিনয়ের মতো নম্র ভদ্র বিনয়ী ছেলে যে এমন তুলকালাম কান্ড ঘটাতে পারে, রমেন ভাবতে পারে নি। সে ভয়ে কেঁচোর মতো গুটিয়ে যায়। মিন মিন করে বলে, আরে ভাইটি, বসো বসো। চেইতা (রেগে) যাও ক্যান? ঠিক আছে, যা কইছি উইদড্র করলাম। ইহল তো? এইটা মনে করে রাইখো না।
রমেনের গলায় রীতিমতো তোয়াজের সুর। রাগের মাথায় বিনয় তারাপদ ভৌমিক এবং জগদীশ গুহঠাকুরতার ঘরে নিয়ে যাবার কথা বলেছিল ঠিকই কিন্তু রমেন যখন কুঁকড়ে গেছে তখন এই নিয়ে আর টানাহ্যাঁচড়া করল না। আসলে ঝামেলা ঝাট, তর্ক বিতর্ক, উত্তেজনা, এ-সব আদৌ পছন্দ নয় তার। কেউ গায়ে পড়ে অপমান করলে বা অকারণে নোংরা কথা বললে তক্ষুনি তক্ষুনি হেস্তনেস্ত করার কথা হয়তো সে ভাবে, কিন্তু লোকটা পিছু হটলে সে-সব আর মনে রাখে না। ঝগড়াঝাটির জের টেনে চলা তার ধাতে নেই।
বিরক্ত চোখে একবার রমেনের দিকে তাকিয়ে বসে পড়ে বিনয়। ধীরে ধীরে মস্তিষ্কের উত্তপ্ত বাষ্প জুড়িয়ে আসে। মনটা বিক্ষিপ্ত হয়ে গিয়েছিল। সেটা শান্ত হলে একসময় লেখা শুরু করল সে। সোনার বাংলা উদ্বাস্তু পল্লির মানুষজনের সঙ্গে কথা বলে প্রচুর তথ্য পাওয়া গিয়েছিল। মনে হচ্ছে, প্রতিবেদনটা ভালই দাঁড়িয়ে যাবে।
নিউজ এডিটরের ঘরে মিটিং-এর পর প্রসাদ লাহিড়ি ফিরে এসেছিলেন। লেখাটা শেষ করে বিনয় তাঁর টেবলের সামনে এসে দাঁড়াল। তাকে বসতে বলে প্রসাদ জিজ্ঞেস করলেন, তোমাকে যে অ্যাসাইমেন্ট দেওয়া হয়েছে সেটা কি আরম্ভ করতে পেরেছ?
টেবলের এধারে বসতে বসতে মাথা নাড়ল বিনয়, হ্যাঁ—
জবরদখল কলোনি না ক্যাম্প, কী দিয়ে স্টার্ট করলে?
গড়িয়ার ওধারের সেই কলোনিটার নাম জানিয়ে দিয়ে বিনয় বলল, ওটা সম্পর্কে লিখেও ফেলেছি। এই যে
হাত বাড়িয়ে বিনয়ের হাত থেকে লেখাটা নিয়ে টেবলের ওপর পেপার-ওয়েট চাপা দিয়ে রাখতে রাখতে তারিফের সুরে প্রসাদ বললেন, ভেরি গুড। রোজই কিন্তু এরকম একটা করে লেখা চাই।
আপনি তো সেদিনই বলে দিয়েছিলেন। আমার তা মনে আছে। রোজই দেব। টেবলের দিকে আঙুল বাড়িয়ে বিনয় বলল, লেখাটা তো পড়লেন না প্রসাদদা? তার গলায় মৃদু উদ্বেগ। প্রতিবেদনটা প্রসাদের পছন্দ হল কি না সেটা শোনার জন্য উগ্রীব হয়ে আছে সে।
প্রসাদ হাসলেন, পড়ার দরকার নেই। আমি জানি খুব যত্ন করে লিখেছ আর ওটা খুব ভাল হয়েছে।
তার লেখার ওপর চিফ রিপোর্টারের বিপুল আস্থা আছে জেনে ভীষণ খুশি হল বিনয়। আর তখনই অদৃশ্য কোনও আঙুল যেন ঠেলা দিয়ে তার মাথাটা বাঁ পাশে ঘুরিয়ে দিল। দেখা গেল, একদৃষ্টে এদিকে তাকিয়ে আছে রমেন। প্রসাদের শেষ কথাগুলো স্পষ্ট শুনতে পেয়েছে সে। আগেও যেমন হয়েছে আজও হিংসেয় কালো হয়ে গেছে তার মুখ। চোখাচোখি হতেই ঝপ করে মাথা নামিয়ে প্যাডের পাতায় ঘস ঘস করে কী লিখতে লাগল।
