বিনয় জিজ্ঞেস করে, ত্রিদিব সেনরা কোন পার্টির লোক?
কমিনিস (কমিউনিস্ট)। তয় শুনাশুন শোনছি চাইর পাশে আর যে হগল কুলোনি আছে হেই সব জাগার বেশির ভাগ কেমিটিই কংগ্রেসের।
দেশে থাকতে সুদূর তালসোনাপুরের এই অক্ষরপরিচয়হীন অধর ভুইমালী কংগ্রেস, কমিউনিস্ট পার্টির বা অন্য কোনও রাজনৈতিক দলের নাম শুনেছে কি না, যথেষ্ট সংশয় আছে। কিন্তু সীমান্তের এপারে আসার পর তারা অনেক কিছুই জানছে, শুনছে, শুধু তাই না, সে-সবের মধ্যে জড়িয়েও পড়ছে।
গড়িয়ার দিকের একটা বাস স্টপেজে এসে দাঁড়ায়। নানা কথায় অনেকটা সময় কেটে গেছে। না, আর দেরি করা ঠিক নয়। আচ্ছা, আজ যাই বলে বাসটায় উঠে পড়ল বিনয়।
.
গড়িয়ায় এসে রাস্তার লোকজনকে জিজ্ঞেস করে পাঁচ নম্বর রুটের বাস ধরল বিনয়। এটা তাকে ধর্মতলায় নিয়ে যাবে। ধর্মতলা তার চেনা জায়গা। সেখান থেকে কোন কোন নম্বরের বাস তাদের অফিসের সামনে দিয়ে যায়, সব বিনয়ের মুখস্থ।
পাঁচ নম্বর বাসটা বেশ ফাঁকা ফাঁকা। বসার জায়গা পেয়ে গেল বিনয়। এ-দিকটায় আগে আসেনি সে। শহর এখানে সেভাবে জমে ওঠেনি। চারপাশে প্রচুর ঝোপঝাড়, প্রচুর গাছপালা। কত যে ডোবা আর পানাপুকুর তার লেখাজোখা নেই। যেভাবে কলকাতায় মানুষ বাড়ছে, সীমান্তের ওপার থেকে শরণার্থীদের ঢল নামছে প্রতিদিন, কয়েক বছরের মধ্যে গড়িয়ার এই এলাকায় ফাঁকা জায়গা বলে কিছু থাকবে না।
ছোকরা কন্ডাক্টরটা পাদানিতে দাঁড়িয়ে একটানা চেঁচিয়ে যাচ্ছে, রামগড় যাদবপুর, ঢাকুরিয়া– খালি গাড়ি, খালি গাড়ি–। বাইরের দৃশ্যাবলী, লোকজন, পাশ দিয়ে ছুটে যাওয়া যানবাহন কিছুই যেন দেখতে পাচ্ছিল না বিনয়। ঝিনুকের চিন্তাটা তার মাথায় উলটো পালটা স্রোতের মতো চারদিক থেকে ঢুকে যাচ্ছে। কলকাতার কাছাকাছি, হয়তো চল্লিশ পঞ্চাশ মাইলের মধ্যে কোথাও সে আছে। বনগাঁ বা নৈহাটি-কাঁচরাপাড়া লাইনের কোনও স্টেশনে নেমে সেখানে যেতে হয়। কিন্তু সেটা কোন স্টেশন? আর সেই স্টেশন থেকে কতদূরে গেলে কোন সে শহর বা গ্রাম যেখানে ঝিনুকের হদিস মিলবে? না, কিছুই জানা নেই। মেয়েটা এত কাছে রয়েছে, অথচ কত দূরে! মনে হয়, পৃথিবীর বাইরের কোনও গ্রহে যেখানে কোনও দিন পৌঁছানো যাবে না।
নিজের মস্তিষ্কের অন্তঃপুর যেন দেখতে পাচ্ছিল বিনয়। সেখানে শুধুই হতাশা।
ধর্মতলায় বাস বদলে অফিসে পৌঁছতে পৌঁছতে আড়াইটা বেজে গেল। দুপুরের শিফট দুটোয় চালু হয়। তার মানে আধঘণ্টা লেট হয়ে গেছে।
.
৪০.
নিউজ ডিপার্টমেন্টে এসে দেখা গেল, চারদিক গমগম করছে। প্রফ-রিডার আর সব-এডিটরদের টেবলগুলোর ফাঁক দিয়ে রিপোর্টিং সেকশনে চলে এল বিনয়। চিফ রিপোর্টার প্রসাদ লাহিড়ি নেই। তার চেয়ারটা ফাঁকা। মণিলালও নেই। তবে সুধেন্দু আর রমেন তাদের টেবলে বসে আছে।
অ্যাটেনডান্স রেজিস্টারটা থাকে প্রসাদের টেবলে। দেরিতে আসার জন্য অস্বস্তি হচ্ছিল বিনয়ের। ভয়ে ভয়ে সে হাজিরা খাতায় সই করল। ভাবল, প্রসাদের সঙ্গে দেখা হলে লেটের কারণটা জানিয়ে দেবে।
সইয়ের পর সুধেন্দুদের পাশে নিজের টেবলে গিয়ে বসল বিনয়। সেই সকালে বেরিয়ে বাসে অনেকটা রাস্তা ছোটাছুটি করতে হয়েছে। ভীষণ ক্লান্তি বোধ করছিল সে। খিদেও পেয়েছে প্রচণ্ড। অফিসে ক্যানটিন খোলা হলেও পুরোপুরি সেটা চালু হয়নি। শুধু চা, অমলেট, ডিম সেদ্ধ আর টোস্ট পাওয়া যায়। বাজারে কাগজ বেরুবার পর দুপুর আর রাতের খাওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।
কাছাকাছি নিশ্চয়ই হোটেল টোটেল আছে। কারওকে জিজ্ঞেস করলে তার হদিস পাওয়া যাবে। সেখানে গিয়ে খেয়ে আসা যায় কিন্তু এই মুহূর্তে আর বেরুতে ইচ্ছা করছে না। একটা বেয়ারাকে ডেকে টোস্ট, ডিম সেদ্ধ আর চা আনতে বলে সুধেন্দুকে জিজ্ঞেস করে, প্রসাদদা এখনও আসেননি?
সুধেন্দু বলল, এসেছেন। নিউজ এডিটরের ঘরে মিটিং করছেন।
মণিলালদাকেও দেখছি না
প্রসাদদা ওকে কী একটা কাজে কংগ্রেস অফিসে পাঠিয়েছেন। ফিরতে ফিরতে বিকেল হয়ে যাবে। বলতে বলতে উঠে পড়ল সুধেন্দু, আমাকেও একটু বেরুতে হবে।
বিনয় বলল, কখন আসছেন?
সন্ধের আগে তো নয়ই।
সুধেন্দু চলে যাবার পর চোখের কোণ দিয়ে একবার রমেনকে দেখল বিনয়। সেদিনের সেই ঘটনার পর খুব সতর্ক হয়ে গেছে সে। এই স্বার্থপর, কুচুটে লোকটাকে মোটেই তার পছন্দ নয়।
রমেন টেবলের ওপর ঝুঁকে কিছু লিখছিল। তার দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে পকেট থেকে নোট বুক, পেন বার করে টেবলের ওপর রাখল বিনয়। তারপর শরীরটা পেছন দিকে হেলিয়ে দিয়ে চোখ বুজল। একটু জিরিয়ে খাওয়া দাওয়া চুকিয়ে সোনার বাংলা উদ্বাস্তু পল্লি সম্পর্কে প্রতিবেদনটা লিখে ফেলতে হবে।
কিছুক্ষণের মধ্যে টোস্ট, ডিম, চা এসে গেল। লেখাটা কোথায় শুরু করে কীভাবে তথ্যগুলো সাজাবে, খেতে খেতে যত ভাবছিল ততই মনটা ছড়িয়ে ছিটিয়ে যাচ্ছে বিনয়ের। বার বার ঝিনুকের মুখ চোখের সামনে ফুটে উঠছে।
হঠাৎ পাশ থেকে রমেনের গলা কানে এল, বিনয়
বিনয় আনমনা হয়ে ছিল। চমকে ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল। রমেন বলল, তোমার লগে একখান কথা আছে।
বিনয় জিজ্ঞেস করে, কী কথা?
তোমার মতো ভাইগ্যবান কইলকাতায় খুব বেশি নাই।
কী করে বুঝলেন আমি ভাগ্যবান?
