ওই যে কইলাম দুই-একহান কথা—
সেই কথাগুলোই শুনতে চাইছি।
খাড়ন, ভাইবা লই। কপালে অগুনতি ভাঁজ ফেলে অধর ভুইমালী কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর বলে, দূর থিকা তো হুনছি। তভু যেটুক মনে আছে, হোনেন। বুড়া মানুষটা কইতে আছিল, দ্যাড় ঘণ্টার ভিতরে আমরা পৌঁছাইয়া যামু। যেহানে গিয়া থাকবা তুমার কুনো কষ্ট হইব না। আমাগো সোমসারটা নিজেগো সোক্সর মনে কইরো। এইর পর আরও কিছু কইছিল। ভুইলা গ্যাছি।
বিনয় বলল, বয়স্ক লোকটাকে দেখে আপনার রিফিউজি মনে হয়েছে। ওরা কি কোনও জবরদখল কলোনি বা ক্যাম্পে থাকতে পারে?
অধর বলল, না জাইনা হেইটা ক্যামনে কই? থাকতেও পারে, আবার নাও থাকতে পারে। একটু থেমে ফের বলে, পাকিস্থান থিকা যারা চইলা আইছে হেরা বেবাকেই তো আর কেম্পে কুম্পে উঠে নাই। কেওর কেওর আত্মজন কইলকাতার চাইর কিনারে তো বটেই, পচ্চিমবঙ্গের নানাহানে রইছে। আত্মজনের বাড়িও ম্যালা (অনেক) মাইনষে উঠছে।
এদিকটা ভেবে দেখেনি বিনয়। তার নিজের কথাই ধরা যাক। কিংবা রামকেশব বা আশু দত্তর কথাও। তারাও তো সীমান্তের ওপার থেকে চলে এসেছে। কিন্তু সরকারি ত্রাণশিবিরে আশ্রয় নিয়েছে কি? কলকাতার চারপাশে এবড়ো খেবড়ো পোড়ো জমি চৌরস করে, জলাজমি ভরাট করে বা বনজঙ্গল সাফ করে জবরদখল কলোনিও বসায়নি। তাদের মতো আরও বহু মানুষ সীমান্তের এপারে আত্মীয়পরিজনের বাড়িতেই এসে উঠেছে।
অফিস থেকে আপাতত তাকে যে কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সেটা হল শরণার্থী শিবিরে শিবিরে আর কলোনিতে কলোনিতে ঘুরে নানা তথ্য জোগাড় করে সে-সবের ভিত্তিতে রোজ একটা করে প্রতিবেদন তৈরি করে রাখা। অধরের সঙ্গে কথা বলতে বলতে ক্ষীণ একটু আশা চকিতের জন্য দেখা দিয়েছিল। বিনয় ভেবেছিল, ক্যাম্প ট্যাম্পগুলোতে ঘুরতে ঘুরতে হয়তো ঝিনুকের খোঁজ পাওয়া যাবে। কিন্তু সেই অজানা প্রৌঢ়টির সঙ্গে সে যদি কলোনি টলোনির বাইরে অন্য কোথাও গিয়ে থাকে? হাজার বছর এখানে ওখানে ছোটাছুটি করলেও তার সন্ধান মিলবে না। আশাটুকু মুহূর্তে বিলীন হয়ে যায় বিনয়ের।
অধর বিনয়ের দিকে তাকিয়ে ছিল। বলল, আধবুড়া মানুষটারে চিনতে নি পারলেন বাবুমশয়?
অথৈ নৈরাশ্যে ডুবে যেতে যেতে ঝাপসা গলায় বিনয় উত্তর দেয়, না।
অনেক আগেই অধরের মনে খটকা দেখা দিয়েছিল। সে জিজ্ঞেস করে, এইটা ক্যামন কথা হইল?
দুরমনস্কর মতো বিনয় বলে, কোনটা?
আপনের অচিনা মাইনষের লগে বউ ঠাইরেন কই গ্যাল আর আপনে সোয়ামী হইয়া হেয়া জানেন না?
এ প্রশ্নের জবাব জানা নেই বিনয়ের। সে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকে।
যদিন অপরাধ না লন, একহান কথা কই
কী?
বউ ঠাইরেন কি আপনের লগে কাইজা (ঝগড়া) কইরা বাড়ি থিকা গ্যাছে গিয়া?
কী কারণে, কতখানি অপমানিত হয়ে, কী নিদারুণ যন্ত্রণায় ঝিনুক নিরুদ্দেশ হয়েছে, অধর ভুইমালীকে তা জানানো যায় না। জড়ানো গলায় কিছু বলে বিনয়, তার একটি শব্দও বোঝা গেল না।
অধর হয়তো ঝিনুক সম্বন্ধে অস্বস্তিকর আরও প্রশ্ন করত, এইসময় রাস্তার উলটো দিকে, একটা বাস থেকে নেমে একজন যুবক এবং একজন তরুণী এধারে চলে আসে। যুবকটির বয়স সাতাশ আটাশ। রোগা, লম্বা। বেশ ধারালো চেহারা। গালে খাপচা খাপচা, পাতলা দাড়ি। চোখে পুরু লেন্সের চশমা। পরনে আধময়লা পাজামা আর পাঞ্জাবির ওপর হাফ-হাতা সোয়েটার। পায়ে ভারী চঞ্চল। কাঁধ থেকে কাপড়ের ব্যাগ ঝুলছে। তার সঙ্গিনীটি বেশ সুশ্রী। চব্বিশ পচিশের মতো বয়স। একসময় গায়ের রং ছিল টকটকে। রোদে পুড়ে তামাটে হয়ে গেছে। মাথার ঘন চুল রুক্ষ, বোঝা যায়, অনেকদিন তেল পড়ে না। এরও চোখে চশমা। এর কাধ থেকে যে চটের ভারী ব্যাগটা ঝুলছে সেটার গায়ে নানারকম নকশা।
দুজনে সোনার বাংলা উদ্বাস্তু পল্লির দিকে যাচ্ছিল, অধরকে দেখে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। যুবকটি বলল, অধরদা, আপনাদের ওখানে চলেছি। দরকারি কথা আছে।
অধর বলল, যান। কুলোনির বেবাকেই (সকলেই) আছে। তাগো লগে কথাবারা আরম্ভ করেন।
আপনারও থাকাটা জরুরি।
আমি বাবুমশয়রে বাসে তুইলা দিয়া অহনই আইতে আছি বলে বিনয়কে দেখিয়ে দিল অধর।
যুবকটি অধরের সঙ্গে কথা বলছিল ঠিকই, তবে বার বার তার চোখ চলে যাচ্ছিল বিনয়ের দিকে। তবে বিনয় সম্পর্কে অধরকে কোনও প্রশ্ন করল না। সঙ্গিনীকে নিয়ে সে কলোনির দিকে চলে গেল।
বিনয়ও দুজনকে লক্ষ করেছে। তাদের দেখে শরণার্থী বলে মনে হয় না। সোনার বাংলা উদ্বাস্তু পল্লিতে তাদের যে যাতায়াত আছে সেটা আন্দাজ করা যাচ্ছে। নইলে অমন অন্তরঙ্গ ভঙ্গিতে অধর ভুইমালীকে অধরদা বলত না। যুবক আর তরুণীটি সম্পর্কে কৌতূহল হচ্ছিল বিনয়ের। জিজ্ঞেস করল, এরা কারা?
অধর একটু চুপ করে থাকার পর বলল, পাট্টির লোক।
পাট্টি অর্থাৎ পার্টি। বিনয় আবছাভাবে শুনেছে, নানা রাজনৈতিক দল ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কলোনিগুলোতে ঢুকে পড়ছে। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে অধরের কাছ থেকে সে জেনে নেয় যুবকটির নাম ত্রিদিব সেন, তরুণীটি হল জয়ন্তী বসু। তারা সোনার বাংলা উদ্বাস্তু পল্লিতে কলোনি কমিটি বানাতে চায়। সেইজন্য প্রায়ই এখানে আসছে।
বিনয় বলে, কলোনি কমিটি কাদের দিয়ে গড়া হবে? তাদের কী কাজ?
অধর জানায়, কমিটি তৈরি হবে, সোনার বাংলা উদ্বাস্তু পল্লির বয়স্ক বুদ্ধিমান লোকজনদের নিয়ে। সে আরও জানালো, সামনে কলোনির মাতব্বররা থাকলেও, ত্রিদিব সেনরাই আসল। তাদের পরামর্শ মতো চলতে হবে। উদ্বাস্তুরা সীমান্তের এপারে এসে পশুর মতো জীবনযাপন করছে অথচ সরকার তারা যাতে মানুষের মতো বেঁচে থাকতে পারে তার কোনও ব্যবস্থাই নিচ্ছে না। সহজ কথায় কাজ হবে না। শরণার্থীদের দাবি দাওয়া যাতে সরকার মেনে নেয় সেজন্য ত্রিদিব সেনরা তাদের নিয়ে মিটিং মিছিল করবে, নানা ধরনের আন্দোলনের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। কমিটি গড়া হচ্ছে সেই কারণে।
