প্রশ্নটার উত্তর না দিয়ে অধরের একটা হাত আঁকড়ে ধরে বিনয়, বলুন কী করছিল, বউঠাকুরণ? বলুন, বলুন–তার কণ্ঠস্বরে অধীরতা, তীব্র উত্তেজনা।
পলকহীন বিনয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে অধর। বলে, শিয়ালদায় মাইষে ক্যান যায়? টেরেন ধরনের লেইগা–
ঝিনুক নিরুদ্দেশ হবার পর একটা চিন্তা প্রায়ই বিনয়কে উতলা করে রাখত। লাঞ্ছিত, চিরদুঃখী মেয়েটা হয়তো আবার পাকিস্তানেই ফিরে গেছে। পরে আশু দত্ত বা রামকেশবের সঙ্গে যখন দেখা হল তখন নিশ্চিতভাবে জানা গেল, সে অন্তত রাজদিয়ায় যায়নি। তারপরও বিনয়ের মাঝে মাঝে মনে হতো, এমনও তো হতে পারে, ঝিনুক পাকিস্তানের ট্রেনেই উঠেছিল কিন্তু রাজদিয়া অবধি পৌঁছতে পারেনি। পথেই ধর্ষক কিংবা ঘাতকবাহিনীর হাতে ধরা পড়ে গেছে। তারপর কী হতে পারে, ভাবতে সাহস হয়নি বিনয়ের। আতঙ্কে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠেছে।
বিনয়ের ব্যাকুলতা হাজার গুণ বেড়ে যায়। সে বলে, আপনার বউঠাকুরনকে কি পাকিস্তানের ট্রেনে উঠতে দেখেছেন?
না ধীরে ধীরে মাথা নাড়ে অধর, আমি যহন তেনারে দেখছি, ইস্টিশানে পাকিস্থানের টেরেন আছিল না।
বিমূঢ়ের মতো বিনয় জিজ্ঞেস করে, তা হলে?
চোখ কুঁচকে কিছুক্ষণ ভেবে অধর বলে, যদূর মনে লয়, কলকাতার আশেপাশে যেই হগল টেরেন যায় হের কুনো একটায় বউঠাইরেন উঠছিল।
অধরের হাতটা ধরাই ছিল। জোরে ঝাঁকুনি দিয়ে বিনয় বলে, শিয়ালদা থেকে কত দিকেই তো লোকাল ট্রেন যায়। তার কোনটায়?
এবার দিশেহারা হয়ে পড়ে অধর। আকাশপাতাল হাতড়াতে হাতড়াতে বলে,পনরো যুলো দিন আগের কথা। ঠিক ঠাওর পাইতে আছি না। কুনো টেরেন যায় বোনগার দিকে। কুনো টেরেন ধরেন গিয়া কাঁচরাপাড়া নৈহাটি লালগোলার দিকে। না বাবুমশয়, মনে পড়ে না।
ঝিনুক নিখোঁজ হবার পর কেউ একজন তাকে স্বচক্ষে দেখেছে এবং কলকাতার কাছাকাছি কোথাও সে আছে, সোনার বাংলা উদ্বাস্তু পশ্লিতে এসে এটুকু অন্তত জানা গেল। কলকাতার চৌহদ্দির বাইরে ওধারে মুকুন্দপুর আর গড়িয়ার এধারে সোনার বাংলা উদ্বাস্তু পল্লি পর্যন্ত তার দৌড়। এ ছাড়া চারপাশে অজস্র নগণ্য শহর আর গ্রাম ছড়িয়ে আছে। সে-সব জায়গায় যাওয়া তো দুরের কথা, নাম পর্যন্ত জানা নেই। এই সমস্ত লোকালয়ের কোথায় ঝিনুক রয়েছে, কে তার সন্ধান দেবে?
হঠাৎ অদম্য এক জেদ মাথায় ভর করে বিনয়ের। একবার যখন ঝিনুকের খবর পাওয়া গেছে, যেভাবে হোক তাকে খুঁজে বার করবে সে। কিন্তু এখানে ওখানে উদভ্রান্তের মতো ছোটাছুটি করলে তো তাকে পাওয়া যাবে না। আরও কিছু তথ্য দরকার যার খেই ধরে এগুলে কাজ হবে।
বিনয় জিজ্ঞেস করে, শিয়ালদায় আপনার বউঠাকরুন কি একলাই ছিল?
কোন ট্রেনে উঠেছে অধর তা সঠিক জানাতে না পারলেও, এই প্রশ্নের জবাবটা সঙ্গে সঙ্গেই পাওয়া গেল। না বাবুমশয়, লগে একজন আছিল। মনে লয় (হয়), আপনেগো কুনো আত্মজন (আত্মীয়)।
আত্মীয়-পরিজন বলতে এই শহরে হিরণরা এবং আনন্দরা ছাড়া অন্য কেউ নেই বিনয়ের। তবে দেশভাগের পর রাজদিয়া আর তার চারপাশের কুড়ি-পঁচিশটা গ্রামগঞ্জের বহু মানুষ এখানে চলে। এসেছে। তাদের অনেকের সঙ্গেই সম্পর্ক আত্মীয়ের মতোই। তাদের কারও কারও সঙ্গে দেখাও হয়েছে বিনয়ের। ঝিনুকের নিরুদ্দেশ হবার খবরটা প্রায় সবাই জানে। এদের কেউ তাকে দেখলে তক্ষুনি বিনয়কে জানিয়ে দিত। সেদিক থেকে মনে হয়, শিয়ালদা স্টেশনে পনেরো কুড়িদিন আগে ঝিনুকের। সঙ্গে যে ছিল সে পরিচিত কেউ নয়।
অনন্ত আগ্রহে বিনয় জিজ্ঞেস করে, যার কথা বললেন সে কি পুরুষ, না মেয়েলোক?
অধর বলল, পুরুষ মানুষ।
কেমন দেখতে?
অধরের স্মৃতিশক্তি এবার কোনওরকম গোলমাল করল না। ঝিনুকের সঙ্গীর মোটামুটি নিখুঁত বর্ণনা দিল সে। লোকটি আধবুড়ো, চুল উষ্কখুষ্ক, গালে খোঁচা খোঁচা কাঁচাপাকা দাড়ি, রোগা পাকানো চেহারা, চোখে পুরু কাঁচওলা নিকেলের টেড়াবাকা আদ্যিকালের চশমা, গায়ে ময়লা ধুতি আর ফতুয়ার ওপর ধুসো চাদর।
এমন সাদামাঠা, গরিব গরিব, কৃশ চেহারার প্রৌঢ় রাস্তায় বেরুলে প্রতি কুড়ি জনের ভেতর দু-একটা পাওয়া যাবেই। খানিকটা দমে যায় বিনয়। এরপর কী বলবে যখন ভাবছে, সেই সময় আচমকা কিছু মনে পড়ে যায় অধরের। উৎসাহের সুরে বলে, আমার কী মনে লয় জানেন?
কী?
বউ ঠাইরেনের লগে যেনি আছিল তেনি পাকিস্থানের মানুষ
বিনয় উগ্রীব হয়ে ওঠে, কী করে বুঝলেন?
অধর বলে, আধবুড়া মানুষটা বউঠাইরেনরে কিছু কইতে আছিল। দু-একহান কথা আমার কানে আইছে। পদ্মাপাইরারা ছাড়া অ্যামন কইরা কেও কয় না। ভাষা এবং উচ্চারণ শুনে তার ধারণা। হয়েছে প্রৌঢ়টির বাড়ি একসময় পদ্মার তীরবর্তী কোনও অঞ্চলে ছিল।
অধর থামেনি, মনে লয়, মানুষটা বেশিদিন বডারের এই ধারে আহে নাই। আমাগো লাখান রিফুজও হইতে পারে।
বিনয় জিজ্ঞেস করল, রিফিউজি যে, টের পেলেন কী করে?
অধর বলে, দ্যাশের ভিটামাটি খুয়াইয়া যারা পশ্চিম বঙ্গে আইছে হেগো চোখেমুখে অন্য কিসিমের। ছাপ থাকে। ঠিক বুঝান যায় না। তয় দ্যাখলেই ট্যার পাওন যায়।
অর্থাৎ উদ্বাস্তুদের সারা শরীরে, পোশাকে আশাকে এমন একটা মার্কামারা ব্যাপার থাকে যাতে হাজার মানুষের জটলাতেও তাদের চিনে নেওয়া যায়। বিনয় বলল, ভদ্রলোক আপনার বউঠাকরুনকে কী বলছিলেন, মনে আছে?
