সূর্য মাথার ওপর উঠে এসেছিল। হঠাৎ বিনয়ের খেয়াল হল, তার ডিউটি দুটো থেকে। এখান থেকে অফিসে পৌঁছতে কম করে ঘণ্টা দুই লেগে যাবে। সে ব্যস্ত হয়ে ওঠে, আরও কিছুক্ষণ আপনাদের সঙ্গে থাকতে পারলে ভাল লাগত কিন্তু এখন আমাকে যেতে হবে। সে যে-পথ দিয়ে কলোনিতে ঢুকেছিল সেদিকে হাঁটতে থাকে।
জনতাও সঙ্গে সঙ্গে চলেছে। রাধামাধব হাত কচলাতে কচলাতে কুণ্ঠিতভাবে বলে, বেইল (বেলা) দুফার হয়ে গিয়েলো। বুলতে সাহস হচ্ছে না। দুটি ভাত খায়ে গেলি মনে বড় শান্তি পাতাম। কিন্তুক আমাগের হাতে ভাত কি খাবেন?
রাধামাধবের দ্বিধার কারণটা আন্দাজ করতে পারছিল বিনয়। স্পষ্ট করে জানিয়ে দেয়, সে জাতপাত মানে না। তবে আজ আর এক লহমাও এখানে থাকার উপায় নেই। যথেষ্ট দেরি হয়ে গেছে। দুটোর ভেতর যেভাবেই হোক তাকে অফিসে হাজিরা দিতে হবে। পরে একদিন সময় করে এসে নিশ্চয়ই খেয়ে যাবে।
দেখা হবার পর থেকে অধর ভুইমালী জোঁকের মতো বিয়ের গায়ে সেঁটে ছিল। কলোনির মুখে এসে রাধামাধবদের উদ্দেশে বলল, তুমাগো আর কষ্ট কইরা যাইতে অইব না। আমি বাবুমশয়রে বাসে তুইলা দিয়া আহি।
রাধামাধবরা এর পরেও বড় রাস্তা পর্যন্ত যেতে চেয়েছিল কিন্তু একরকম কাকুতি মিনতি করে তাদের থামিয়ে দিয়ে অধর ভুইমালী বিনয়ের পাশাপাশি হাঁটতে লাগল। আগেই অধর জানিয়ে রেখেছে, একান্ত গোপনে সে বিনয়কে কিছু বলতে চায়।
বিনয় বলল, আমার কিন্তু ভীষণ তাড়া আছে। গড়িয়ার বাস এলেই উঠে পড়ব। কী বলবেন বলুন–
অধর সতর্কভাবে চারদিক দেখে নিল। যদিও আশপাশে কেউ নেই, তবু গলার স্বর অনেকখানি নামিয়ে বলল, আপনে তো জানেন বাবুমশয়, কত বুদ্ধি খাটাইয়া, কত কষ্ট কইরা দ্যাশ থিকা আমাগো দলিলপত্তরগুলান আনছিলাম। কিন্তু বিশ্বাস কইরা হেই কথা কেওরে (কাউকে) কইতে পারি না, যদিন হাতাইয়া লয়। শুনাশুন কানে আইছে, ম্যালা (অনেক) মাইষে দ্যাশের বিষয় আশয়ের লগে এহানকার মুসলমানগো জমিজমা এচ্চেঞ্জ করতে আছে। কথাটা কি ঠিক?
ঠিক।
যারা এচ্চেঞ্জ করায় ত্যামন কেওরে আপনে চিনেন?
নিত্য দাসের মুখটা চোখের সামনে ফুটে ওঠে বিনয়ের। সে বলে, চিনি। আপনি যদি চান তাকে পাঠিয়ে দিতে পারি।
দ্বিধার সুরে অধর জিজ্ঞেস করে, আমার লগে বাটপারি করব না তো?
নিত্য দাসের প্রচণ্ড টাকার লোভ। কিন্তু বিনয় জানে, দালালি পেলেই সে খুশি। কারও সঙ্গে জালিয়াতি জুয়াচুরি করেছে, এমন দুর্নাম তার নেই।
বিনয় বলল, আমি যাকে পাঠাব সে আপনাকে ঠকাবে না।
উৎসাহে চোখমুখ জ্বলজ্বল করতে থাকে অধর ভুইমালীর। বলে, তাইলে পাঠাইয়া দিয়েন। তেনার লগে কথাবাত্রা কইয়া দেখি। হের পর আসল কামের সোময় আপনেরে কিন্তুক থাকতে অইব।
থাকব।
আপনের ঠিকানাখান দ্যান বাবুমশয়–
পকেট থেকে নোট বই এবং কলম বার করে একটা কাগজ ছিঁড়ে সুধাদের বাড়ির ঠিকানা লিখে অধরকে দিল বিনয়।
অধরের চোখেমুখে কৃতজ্ঞতা ফুটে ওঠে। হাতজোড় করে বলে, আমার কী উপকার যে অইব, কইয়া বুঝাইতে পারুম না।
একটু চুপচাপ।
বিনয়রা বড় রাস্তায় চলে এসেছিল। বেশ লোজন রয়েছে। দুচারটে গাড়িও চলছে। কিন্তু গড়িয়ার দিকের বাসের দেখা নেই।
হঠাৎ কী মনে পড়ে যাওয়ায় ভীষণ ব্যস্ত হয়ে পড়ে অধর। ব্যগ্র সুরে বলে, আরে একহান কথা কইতেই তো ভুইলা গ্যাছি
বিনয় একটু অবাক হল, কী কথা?
দুই হপ্তা আগে আমরা যেইদিন এই কুলোনিতে আইলাম–হ, তারও তিন চাইর দিন আগে আতখা (হঠাৎ) বউ ঠাইরেন শিয়ালদার ইস্টিশানে দেখছি। কিন্তুক আপনে তেনার লগে আছিলেন না।
কে বউ ঠাকরুন?
আপনার ইস্তিরি।
তার মানে ঝিনুক। রাজদিয়া থেকে কলকাতায় আসার সময় পথে যার সঙ্গেই আলাপ হয়েছে তারা সবাই ধরে নিয়েছে ঝিনুক তার স্ত্রী। ঝিনুকের কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে পা থেকে মাথা পর্যন্ত তড়িৎপ্রবাহ খেলে যায় বিনয়ের। টের পায় হৃৎপিণ্ডে দমাদম কেউ হাতুড়ি পিটিয়ে চলেছে অবিরল। অনেকক্ষণ পর কিছুটা সামলে নিয়ে রুদ্ধস্বরে বলল, আপনি ঠিক দেখেছেন?
অধর সামান্য হাসে, ঠিকই দেখছি।
তবু বিনয় অধীর গলায় বলে, আপনার কোনও ভুল হয়নি তো?
কথা হোনো বাবুমশয়ের! আমার চৌখে অহনও চাইলশা ধরে নাই। আপনে, বউ ঠাইরেন, হেই বুড়া মাস্টরমশয়, তেনার বউ-মাইয়ারা, আমরা, আরও হাজারে হাজারে রিফুজ একলগে ইন্ডিয়ায়। আইলাম। আর আপনে কন আমার ভুল অইচে কি না। যেনারে একবার দেহি তেনারে কুনোদিন, ভুলি না বাবুমশয়–
বিনয়ের মনে হল, সে দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না। তার চারপাশে মহাবিশ্ব দুরন্ত গতিতে ঘুরে চলেছে। ঘুরেই চলেছে। ঘুরেই চলেছে।
অধর ভুইমালী তীক্ষ্ণ নজরে বিনয়কে লক্ষ করছিল। খানিক আগে যে মানুষটিকে ধীর স্থির শান্ত মনে হচ্ছিল, মুহূর্তে সে আগাগোড়া বদলে গেছে। চোখেমুখে কেমন যেন অস্থির অস্থির, উতলা ভাব। ব্যস্তভাবে অধর জিজ্ঞেস করে, শরীল নি খারাপ লাগে বাবুমশয়?
না না, আমি ঠিক আছি। ব্যাকুলভাবে বিনয় বলে, আপনার বউঠাকুরনকে শিয়ালদায় কী করছিল?
অধর হতবাক। নিজের স্ত্রী সম্বন্ধে খবর রাখে না, বিনয়কে এতটা আলাভোলা বা দায়িত্বজ্ঞানহীন কখনও মনে হয়নি তার। পাকিস্তান থেকে আসার সময় তারপাশার স্টিমারে বা গোয়ালন্দের ট্রেনে সে তো দেখেছে বিনয় কীভাবে, কত যত্নে স্ত্রীকে বুকের ভেতর আগলে আগলে নিয়ে এসেছে। অসীম বিস্ময়ে অধর বলে, শিয়ালদায় ক্যান গ্যাছিল, আপনে জানেন না?
