খবরের কাগজের ছাপার হরফ যে অলৌকিক শক্তিধর এবং সেগুলো যে আকাশ থেকে চন্দ্র সূর্য পেড়ে আনতে পারে, এটা জানা ছিল না বিনয়ের। কিন্তু এখানকার লোকজনের কাগজ সম্পর্কে অটুট বিশ্বাস, অনন্ত ভরসা। কেন এই নিরক্ষর মানুষগুলোর এমন ধারণা, কে জানে। এ নিয়ে প্রশ্ন করতে গিয়েও করল না বিনয়।
কণ্ঠিধারী বলল, আমাগের কথা ভাল করি গুছায়ে গাছায়ে লিখি দিবেন বাবু
বিনয় ঘাড় কাত করে, হ্যাঁ, লিখব। একটু ভেবে বলল, আপনার নামটা কিন্তু জানা হয়নি।
কণ্ঠধারী জানায় তার নাম রাধামাধব দাস। শুধু তাই না, অন্যদের সঙ্গেও পরিচয় করিয়ে দেয়। তাদের কেউ নিতাই কর্মকার, কেউ মথুরা করাতি, কেউ গণেশ শীল ইত্যাদি।
বিনয় এবার বলে, আপনাদের কলোনিটা একটু ঘুরে দেখা যাবে?
নিচ্চয় বাবু। আসেন,
বিনয় উঠে পড়ে। কণ্ঠিধারী অর্থাৎ রাধামাধব দাস পথ দেখিয়ে তাকে নিয়ে যেতে থাকে। হরিদাস সাহা এবং অন্য সবাই তাদের সঙ্গে সঙ্গে চলেছে।
সামনের দিকে বসে যতটা মনে হয়েছিল, ভেতর দিকে যেতে যেতে বিনয় দেখতে পেল, কলোনিটা আয়তনে তার চেয়ে অনেক বড়। রাধামাধব বলেছিল হোগলাবন নির্মূল করে এখানে বসতি গড়ে তোলা হয়েছে। এখন চোখে পড়ল, দূরে এখনও প্রচুর হোগলা এবং নানা ধরনের বুনো ঝোপঝাড় রয়েছে। তার মানে পুরোটা সাফ হয়নি। ওগুলো কেটে ফেললে আরও বহু মানুষের বাসস্থানের বন্দোবস্ত হতে পারে। বিনয়ের আসার খবর পেয়ে কেউ কেউ তাকে দেখতে এলেও ভেতরের দিকে যারা ছিল তারা হয়তো জানতে পারেনি। এদের কেউ কেউ ঘর তুলছে। মেয়েরা রান্নাবান্না বা অন্য কাজে ব্যস্ত। প্রচুর বাচ্চাকাচ্চা সারি সারি ঘরের সামনে খোলা জায়গায় ছোটাছুটি হুটোপাটি করছে।
যারা ঘর বানাচ্ছিল, রাধামাধবের সঙ্গে একটি নতুন লোককে দেখে তারা এগিয়ে আসে। মেয়েরা। ঘরকন্না স্থগিত রেখে মাথায় আধঘোমটা টেনে গভীর কৌতূহলে বিনয়কে লক্ষ করতে থাকে। বাচ্চাগুলো হুল্লোড় থামিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। সবার চোখেমুখে অপার বিস্ময় ফুটে ওঠে।
এখানে কোন বাড়িটা কার, তার দেশ পূর্ব পাকিস্তানের কোন জেলায় ছিল, পর পর বলে যাচ্ছে রাধামাধব। হঠাৎ ডান পাশের শেষ মাথা থেকে উঁচু গলায় কেউ ডেকে ওঠে, বাবুমশয় না? পরক্ষণে দেখা গেল, একটা লোক দৌড়তে দৌড়তে এদিকে আসছে।
বিনয় দাঁড়িয়ে যায়। কাছাকাছি আসতে লোকটাকে চিনতে পারল। সেই অত্যন্ত চতুর, অতীব ফন্দিবাজ অধর ছুঁইমালী। তারপাশা থেকে গোয়ালন্দে আসার সময় স্টিমারে তার সঙ্গে আলাপ হয়েছিল। লোকটা বাঁ পায়ের ঊরুতে পুরোনো কাপড়ের পুরু ব্যান্ডেজ বেঁধে তার ভেতর দেশের বিষয় আশয়ের যাবতীয় দলিল ভরে খোঁড়াতে খোঁড়তে সীমান্তের এপারে চলে এসেছে। করুণ, কাতর মুখ করে তার পা টেনে টেনে চলার ভঙ্গিটা এমনই নিখুঁত ছিল যে বর্ডারের পাকিস্তানি অফিসাররা ধরতেই পারেনি লোকটা কত বড় ধোঁকাবাজ।
অধর হাতজোড় করে মাথা ঝুঁকিয়ে শশব্যস্তে বলল, পন্নাম বাবুমশয়। আপনের লগে এই জনমে ফির যে দেখা অইব, ভাবতে পারি নাই।
হরিদাস সাহার পর অধর ছুঁইমালীকে সোনার বাংলা উদ্বাস্তু পল্লিতে দেখে আরও একবার অবাক হল বিনয়। কিছু একটা আন্দাজ করে নিয়ে বলল, আমিও ভাবিনি। তা সাহা মশাই আর আপনারা কি একসঙ্গে এই কলোনিতে এসেছেন?
ঠিকই ধরছেন। শিয়ালদায় পইচা মরতে আছিলাম। মাইনষের লাখান বাচনের লেইগা অন্য রিফুজগো লগে আমরা দুই ঘর এইহানে চইলা আইলাম।
রাধামাধব অধরকে বলল, মনে হতিচে বাবুর সঙ্গি তোমারও চেনাজানা আছে?
অধর বলল, আছেই তো। আমরা এক লগে পাকিস্থান থিকা ইণ্ডিয়ায় আইছি। পিরথিমীতে বাবুমশয়ের লাখান মানুষ হয় না। য্যামন বিদ্বান, ত্যামন মাইষের লেইগা তেনার দয়ামায়া। পাকিস্থান থিকা আসার সোময় এক বুড়া মাস্টরমশয় আর তেনার ফেমিলির লেইগা উনি যা করছেন, নিজের চৌখে তো দেখছি ।
জামতলির বৃদ্ধ হেড মাস্টার রামরতন গাঙ্গুলি এবং তার স্ত্রী আর মেয়েদের কথা ভোলেনি অধর। সেই কথাই বিশদভাবে রাধামাধবকে বলতে লাগল।
বিনয় মনে করে, সে রামরতনদের জন্য যেটুকু করেছে তা ঢাক পিটিয়ে বলার মতো কোনও ঘটনাই নয়। অধর ভুইমালীকে থামাতে যাচ্ছিল, তার আগেই লোকটা একেবারে অন্য কথায় চলে যায়, জানেন বাবুমশয়, শিয়ালদার ইস্টিশানে হেই যে আমরা আইয়া নামছিলাম হের পর আপনেরে কত যে বিচারাইছি (খুঁজেছি), কিন্তুক ভিড়ের মইদ্যে কুনোহানে পাইলাম না। দিনের পর দিন ভগমানের কাছে কানছি (কেঁদেছি), আপনের লগে য্যান দ্যাখা করাইয়া দ্যায়। অ্যাদ্দিনে ভগমানের দয়া হইছে। আপনের দ্যাখ্যা পাইলাম। কী আনন্দ যে অইতে আছে, বুঝাইয়া কইতে পারুম না। উচ্ছ্বাসের ফেনা মরে এলে গলা নামিয়ে বলল, আপনের লগে আমার ম্যালা (অনেক) কামের কথা আছে।
বিনয় অবাক হল, কী কথা?
হেইটা আপনের আর আমার মইদ্যে অইব (হবে)। অন্য মাইনষের সুমখে (মানুষের সামনে) না। আমাগো কুলোনিখান পুরা দেইখা লন। হের (তার) পর গুপনে (গোপনে) কমু।
ঘুরে ঘুরে একসময় কলোনি দেখা শেষ হল। এখানে ঢোকার পর কিছু লোকের সঙ্গে আগেই আলাপ করিয়ে দিয়েছিল রাধামাধব। যারা অনেকটা ভেতরে দিকে ছিল তাদের সঙ্গেও পরিচয় হল। তাদের নাম, পূর্ব পাকিস্তানের কোন কোন জেলায় তাদের সাত পুরুষের ভিটেমাটি ছিল, কেন তাদের দেশ ছেড়ে চলে আসতে হয়েছে, সব নোটবুকে টুকে নিয়েছে বিনয়। লক্ষ লক্ষ ছিন্নমূল মানুষের জন্মভূমি ফেলে আসার মূল কারণ দুটো। পাকিস্তানীদের গায়ের জোরে বিষয় সম্পত্তি দখল করার চেষ্টা, নইলে যুবতী মেয়েদের ছিনিয়ে নেবার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়া। সোনার বাংলা উদ্বাস্তু পল্লির বাসিন্দাদের বেলাতেও হেতুগুলো আলাদা কিছু নয়।
