কণ্ঠিধারী সেই লোকটা হাঁকডাক করে একটা বেতের মোড়া আনিয়ে বিনয়কে বসালো। আচমকা একজন এসে পড়েছে। হোক অনাহুত, তবু অতিথি তো। তাকে আপ্যায়ন করা দরকার। তাই চা এবং সস্তা লেড়ো বিস্কুটের ব্যবস্থাও হয়ে গেল।
বিনয় বুঝতে পারছিল এই লোকটা সোনার বাংলা উদ্বাস্তু পশ্লির মাতব্বর। এখানকার বাসিন্দারা তাকে যথেষ্ট মানে।
এদিকে কলোনিতে বিনয়ের আসার খবরটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে চারপাশ থেকে বাচ্চা কাচ্চা, ছেলেবুড়ো, যুবকযুবতী থেকে শুরু করে নানা বয়সের মানুষজন তার সামনে এসে ভিড় করে দাঁড়ায়।
চায়ের গেলাসে চুমুক দিয়ে বিনয় বলল, কেন এই কলোনিতে এসেছি, নিশ্চয়ই আপনাদের জানতে ইচ্ছে হচ্ছে–
জনতা উত্তর দেয় না। সবার তরফ থেকে কঠিধারী বলে, হাঁ বাবু
তার আসার উদ্দেশ্যটা জানিয়ে দেয় বিনয়। তারপর পকেট থেকে নোট-বুক আর পেন বার করে এই কলোনি সম্পর্কে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে নানা তথ্য টুকে নিতে থাকে।
সোনার বাংলা উদ্বাস্তু পল্লি তৈরির কাজ শুরু হয়েছিল ঠিক একবছর আগে। একসময় এখানে ছিল নাবাল জমি। পুরো ভূখণ্ডটি জুড়ে হাঁটু অবধি জলে উদ্দাম হোগলা বন। বন সাফ করে নিচু জমিতে মাটি ফেলে বসতি বানানো হল। মুকুন্দপুরে যুগলদের বাস্তুহারা কলোনিতে রাজদিয়া এবং তার চারপাশের বিশ পঁচিশটা গ্রামের মানুষই শুধু রয়েছে। কিন্তু এখানে এসেছে পূর্ব বাংলার নানা প্রান্তের লোজন। বরিশাল, খুলনা, যশোর, পাবনা, ফরিদপুর, ঢাকা-কোনও জেলাই বাদ নেই।
হকারি, ছোটখাটো দোকানদারি, বেতের কাজ, বাঁশের কাজ, ছাড়াও নানা ধরনের উঞ্ছবৃত্তি করে এই কলোনির বাসিন্দারা পেটের ভাত জোটাচ্ছে। কতদিন এভাবে চালানো সম্ভব হবে, জানা নেই।
মাথা গোঁজার মতো ঘর এরা তুলতে পেরেছে ঠিকই, কিন্তু সেখানেও পদে পদে সংকট। বিপদ তাদের নিত্য সঙ্গী। যে হোগলাবন সাফ করে জলা বুজিয়ে এখানে কলোনি বসানো হয়েছে সেই জমির মালিক এই অঞ্চলের সামন্তরা। তারা লোক ভাল নয়। বছরের পর বছর এখানকার পরিত্যক্ত জমিতে হোগলা আর ঝোপঝাড় গজিয়েছে। সাপখোপ পোকামাকড় শিয়াল বাঘডাসা বংশ বাড়িয়েছে। এসব নিয়ে এতকাল মাথাব্যথা ছিল না তাদের। কিন্তু উদ্বাস্তুরা এসে যেই বসতি বানালো, অমনি সামন্তদের মস্তিষ্কে অধিকার বোধ চাগাড় দিয়ে উঠল। বিষাক্ত সরীসৃপেরা থাকলে আপত্তি নেই। কীটপতঙ্গ, বুনো পাখির ঝাক কিংবা হোগলা বন, ঝোপঝাড়–এ-সব অবাধে থাকতে পারে। কিন্তু মানুষ এসে জনপদ বানিয়ে বসবাস করবে, সামন্তরা কিছুতেই তা মেনে নেবে না। সোনার বাংলা উদ্বাস্তু পল্লির বাসিন্দাদের উৎখাত করার জন্য নানাভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে তারা। কতবার যে সশস্ত্র গুণ্ডাবাহিনী পাঠিয়েছে তার হিসেব নেই। তিন তিনবার রাতের অন্ধকারে হানাদারেরা কলোনির ঘরের চালে, বাঁশের বেড়ায় পেট্রোল ঢেলে ছারখার করে দিতে চেয়েছে।
কণ্ঠিওলা লোকটা বলতে লাগল, সামন্তরা ঘরবাড়ি পোড়ায়ে আমাগেরে ভাগায়ে দিতি চায়। আমরা দখল ছাড়ি না। মাটি কামড় দে পড়ি থাকি। ঘরপোড়া ছাই, আর দগ্ধ বাঁশ খুঁটির স্তূপ দেখিয়ে বলল, বিশ দিন আগে আমাগের কুলোনিতে ওরা আগুন ধরায়ে দেছে। আমরা ছাই ভস্ম সরায়ে ফের ঘর বাঁধতিচি। যতবার আগুন দেবা, ততবার ঘর তুলি নেবা নে। জমিন য্যাকন একবার দখল করিচি, ও আর ছাড়বা না।
কলোনির সামনের দিকে এবং ভেতরে যে পোড়া টিন, টালি, বাঁশ টাশ স্তূপাকার হয়ে পড়ে আছে তার কারণ এতক্ষণ বুঝতে পারল বিনয়। অবিকল যুগলদের মুকুন্দপুর কলোনির মতোই ঘটনা। সেখানেও জমি মালিকের ঘাতকবাহিনী একই পদ্ধতিতে উদ্বাস্তুদের তাড়াতে চায়। এখানেও ঠিক তা-ই। বর্শা, রামদা, লাঠি ইত্যাদি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়া, নইলে ঘরে আগুন। কিন্তু সীমান্তের ওপারে সর্বস্ব খুইয়ে আসার পর ছিন্নমূল মানুষগুলোর পিঠ দেওয়ালে ঠেকে গেছে। বসুন্ধরার এক কোণে বনজঙ্গল সরীসৃপে বোঝাই পোড়ো জমি খুঁজে বার করে তারা নতুন নতুন লোকালয় গড়ে তুলছে। যত আক্রমণই আসুক, ভয়ে তারা পালিয়ে যাবে না। সব হানাদারির বিরুদ্ধে এককাট্টা হয়ে রুখে দাঁড়াবে।
বিনয় কথা বলছিল ঠিকই, সেই সঙ্গে দুরন্ত গতিতে তার কলম চলছিল।
ভিড়ের ভেতর থেকে ঢ্যাঙা, কৃশ চেহারার একটা লোক জিজ্ঞেস করে, আমাগো কথা লেইখা লইতে আছেন, এ দিয়া কী করবেন বাবুমশয়?
কথা শুনেই ধরা যায়, তার আদি বাড়ি খুলনা বা যশোরে নয়। ঢাকা কিংবা ফরিদপুরে। বিনয় বলল, লেখাটা আমাদের কাগজে ছাপা হবে।
ছাপা হইলে গরমেনের নজরে পড়ব?
বিনয় ধন্দে পড়ে যায়। তাদের কাগজ নতুন ভারত এখনও বাজারে বেরোয়নি। বেরুবার পর সোনার বাংলা উদ্বাস্তু পল্লি সম্পর্কে তার রিপোর্টটা ছাপা হলে গরমেন অর্থাৎ সরকারের নজরে পড়বে কি না, জানা নেই। একটা প্রশ্ন বিনয়কে উৎসুক করে তোলে। গভর্নমেন্টের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য লোকটার এত আগ্রহ কেন? অনিশ্চিতভাবে সে বলল, পড়তে পারে। কেন বলুন তো?
এবার ঢ্যাঙা লোকটা নয়, কষ্ঠিধারীটি বুঝিয়ে দিল। এই কলোনির বাসিন্দারা কী অসীম দুর্দশার মধ্যে রয়েছে, প্রতিটি মুহূর্তে শুধুমাত্র বেঁচে থাকার জন্য তাদের কী নিদারুণ যুদ্ধ–খবরের কাগজে এ-সব বেরুলে সরকারি কর্তাদের নির্ঘাত টনক নড়বে। এর আগে কণ্ঠিধারীরা বেশ কয়েকবার সাহায্যের জন্য সরকারের কাছে দরবার করেছে কিন্তু এখন অবধি একটি ঘষা আধলাও মেলেনি। যা পাওয়া গেছে তা হল অঢেল প্রতিশ্রুতি। কিন্তু কাগজ যদি সোনার বাংলা উদ্বাস্তু পল্লি সম্পর্কে নাড়াচাড়া দেয়, সরকারের সাধ্য নেই তা অগ্রাহ্য করে।
