একটা আধবুড়ো লোক–পরনে ময়লা খাটো ধুতি আর নিমার ওপর জ্যালজেলে চাদর, হাতের এবং গলার শিরাগুলো প্রকট, ঘোলা ঘোলা চোখ, ভাঙা গালে খাপচা খাপচা কাঁচাপাকা দাড়ি, গলায় তিন ফের তুলসির মালা–ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করে, আপনিরে তো চিনতি পাল্লেম না বাবু তার গলায় যশোর কি খুলনা জেলার টান। তবে এপারে আসার পর এখানকার ভাষা আর সীমান্তের ওপারের ভাষা মিলেমিশে তার কথাগুলো কিছুটা তেউড়ে গেছে।
বিনয়ের উত্তর দেওয়া হয় না। তার আগেই জটলার ভেতর থেকে কেউ বলে ওঠে, উনারে আমি চিনি। বড় ভালা মানুষ। আমরা একলগে পাকিস্থান থিকা ইন্ডিয়ায় আইছি।
এধারে ওধারে তাকিয়ে লোকটাকে দেখতে পেল বিনয়। শীর্ণ, দড়ি-পাকানো শরীর। দেখামাত্রই চেনা গেল। হরিদাস সাহা। তারপাশা স্টিমারঘাটে তাকে প্রথম দেখেছিল সে। কোন এক নয়া চিকন্দি গ্রামে ছিল হরিদাসের সাত পুরুষের ভিটেমাটি। হানাদার বাহিনী একদিন রাতে তার যুবতী মেয়েকে জোর করে তুলে নিয়ে যায়। তখনই তারা সিদ্ধান্ত নেয় পাকিস্তান ছেড়ে চলে যাবে।
বিনয়ের মনে পড়ে, মেয়ে হারানোর শোকে সমস্ত রাত হরিদাস সাহার স্ত্রী নদীর পাড়ে মুখে আঁচল চাপা দিয়ে কেঁদেছিল। সেই সঙ্গে বিরামহীন, সকরুণ, বুকফাটা বিলাপ। গোয়ালন্দের স্টিমারে ওঠার পরও সেই কান্না তার থামেনি। গোয়ালন্দ থেকে রিফিউজিদের জন্য স্পেশাল ট্রেনের গাদাগাদি ভিড়েও তার সেই অবিরল কান্না শোনা গেছে। আরও পরে শিয়ালদা স্টেশনে গাড়ি পৌঁছলে তার সঙ্গে আর দেখা হয়েছিল কি না, বিনয়ের মনে পড়ে না।
তারপাশার স্টিমারঘাটে বা রিফিউজি স্পেশালে কাছাকাছি থাকলেও হরিদাস সাহার সঙ্গে একটি কথাও হয়নি বিনয়ের। লোকটার সঙ্গে কেউ আলাপও করিয়ে দেয়নি। ওদের সম্বন্ধে সে যেটুকু যা শুনেছে, সবই তেঁড়াদার হরিন্দর মুখে। আলাপ পরিচয় না হলেও শোকাতুর মানুষটা তার গতিবিধি লক্ষ করেছে এবং তাকে মনেও করে রেখেছে। হরিদাস সাহার সঙ্গে আর কোনওদিন দেখা হবে, ভাবতে পারেনি বিনয়। দেশভাগের পর চেনাজানা কত মানুষ কোথায় কত দিকে ছিটকে পড়েছে। কীভাবে বউ ছেলেমেয়ে নিয়ে মাথা গোঁজার মতো একটু জায়গা করে নেবে, কীভাবে দুটো পয়সা রোজগার করে নিজেদের পায়ে দাঁড়াবার চেষ্টা করবে, এমন হাজারটা চিন্তা সবার মাথায় পাষাণভারের মতো চেপে আছে। অন্যের কথা ভাববে, তেমন বাড়তি সময় কারও হাতে নেই। হরিদাস সাহাও একদিন বিনয়ের স্মৃতি থেকে নিশ্চয়ই বিলীন হয়ে যেত। কিন্তু হল না।
সোনার বাংলা উদ্বাস্তু পল্লিতে হরিদাসকে দেখে ভাল লাগল বিনয়ের। পরক্ষণে তীব্র ক্লেশে শতখান হয়ে যাওয়া তার স্ত্রীর কথা মনে পড়ল। সে কি এখনও তেমনি কাঁদে? ভাবতেই বুকে অদ্ভুত চাপা কষ্ট অনুভব করতে থাকে বিনয়।
এদিকে আগন্তুকটি কলোনির বাসিন্দা হরিদাসের পরিচিত এবং সে তাকে ভালমানুষ বলে ঢালাও প্রশস্তি করেছে, ফলে যারা ভিড় করে দাঁড়িয়ে ছিল তাদের সংশয় কেটে যায়। বিনয় সম্পর্কে আর ভয় নেই। তারা নিশ্চিত, এই যুবকটি তাদের কোনওরকম সংকট বা বিপদে ফেলবে না। মুখ চোখ দেখেই এখন টের পাওয়া যায়, লোকগুলো বেশ স্বস্তি বোধ করছে।
বিনয় ভিড়ের দিকে তাকিয়ে বলল, হঠাৎ আমাকে দেখে আপনারা নিশ্চয়ই অবাক হয়ে গেছেন।
কেউ জবাব দিল না।
বিনয় বলে, বিশেষ দরকারে আমাকে এই কলোনিতে আসতে হয়েছে। শুনলে বুঝতে পারবেন।
গলায় যার তুলসীর মালা, সেই আধবয়সী লোকটা সসম্ভ্রমে বলল, সব শোনবো। মুখ দেখি মনে হতিচে, অনেক দূর থেকি আসতিচেন। খুব ধকল গেছে। আগে কলোনিতে যায়ে জিরোয়ে লেন। তারপর কথা হবে নে
বিনয়কে সঙ্গে নিয়ে সবাই সামনের দিকে এগিয়ে চলে।
.
৩৯.
হরিদাস সাহা বিনয়ের গা ঘেঁষে হাঁটছিল। বাকি সবাই কেউ সামনে, কেউ পেছনে। হরিদাস একটানা বলে যাচ্ছিল, দ্যাশ থিকা আইয়া আপনেগো লগে শিয়ালদার ইস্টিশানে তো লামলাম। হের পর আপনেরা কুনখানে যে গ্যালেন দেখি নাই। আমরা এক্কেয়ে উথাল সমুপুরে পড়লাম খান। চাইর দিকে খালি রিফুজ আর রিফুজ। গু, মুতে, কফে, ছ্যাপে (থুতু) জাগাখান আস্তা নরককুণ্ডু। দুই ব্যালা (বেলা) সরকারি বাবুরা দুই দলা কইরা খিচোরি কি ডাইল-ভাত দ্যায়। হেই খাইয়া কুনোরকমে বাইচা থাকি। এইভাবে চিরকাল তো চলে না। কিন্তুক কী করুম, ভাইবা ভাইবা দিশা পাই না। শিয়ালদার পেলাটফরোমে মইরা ঝইরা শ্যাষ হইয়াই যাইতাম। আত (আচমকা) খবর পাইলাম গইরার (গড়িয়ার) এইদিকে রিফুজরা কুলোনি বহাইতে আছে। এই হানে আইলে জমিন মিলব। ভাবলাম দেহি একবার চ্যাষ্টা কইরা। বউ পোলাপানগো হাত ধইরা আরও কয় ঘর রিফুজের লগে রাতারাতি চইলা আইলাম। হেই থিকা এহানেই আছি।
সব জবরদখল কলোনি তৈরির পেছনে প্রায় একই ইতিহাস। রিফিউজি ক্যাম্প বা শিয়ালদা স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম কিংবা কলকাতার ফুটপাথ থেকে চলে এসে জলা জমি ভরাট করে, বনজঙ্গল কেটে ছিন্নমূল মানুষ ঘরবাড়ি তুলছে। বিনয় জিজ্ঞেস করে, কতদিন হল আপনি এখানে আছেন?
দিন পনরো যুলো
কথায় কথায় সবাই কলোনির ভেতর চলে আসে। বিনয় লক্ষ করল, অনেকটা জায়গা জুড়ে প্রচুর ঘর। নতুন নতুন আরও অনেকগুলোর কাজ চলছে। এখানেও একধারে পোড়া কাঠ, টালি, ছন আর খড়ের ছাই ভঁই হয়ে আছে।
