রানিকুঠি ছাড়িয়ে আরও খানিকটা যাবার পর একটা বাজার মতো জায়গায় বাস এসে দাঁড়ায়। ধনঞ্জয় বলে, এই অইল বাশধানী। আমারে অহন নামতে হইব বাবুমশয়। বলতে বলতে সে উঠে পড়ে।
আগেই তার এবং নিজের টিকিট কেটে নিয়েছিল বিনয়। বলল, ঠিক আছে। আপনার সঙ্গে পরিচয় হয়ে ভলই হল। এ-দিককার অনেক কিছু জানতে পারলাম।
মাথাটা বুকের ওপর অনেকখানি ঝুঁকিয়ে ধনঞ্জয় বলল, পন্নাম বাবুমশয়।
বিনয় হাতজোড় করে, নমস্কার
সোময় কইরা একদিন আমাগো কুলোনিতে আইবেন কিলাম—
বললাম তো, যাব—
ধনঞ্জয় নেমে গেল।
বাস ফের চলতে শুরু করে। যতই এগুচ্ছে মানুষের বসতি ক্রমশ কমে আসছে। বাড়ছে ঝোপঝাড়, গাছগাছালি, পোড়ো জমি। ফাঁকে ফাঁকে উদ্বাস্তু কলোনি। অন্য দিকে রাস্তার ডান ধার ঘেঁষে পাশপাশি চলেছে একটা চওড়া খাল। এই শীতেও সেটা হেজেমেজে যায়নি। যথেষ্ট জল রয়েছে। এখন জোয়ারও নেই, ভাটাও না। স্থির জলে এখানে ওখানে থোক থোক কচুরি পানা।
একসময় বাস গড়িয়ার মোড়ে পৌঁছে যায়। এখানে চারপাশে প্রচুর দোকান পাট। রকমারি দোকান। কোনওটা মিষ্টির, কোনওটা ওষুধের, কোনওটা মুদিখানা বা লন্ড্রি। তারই ফাঁকে ফাঁকে শীতের নানারকম আনাজ–তরতাজা ফুলকপি, বাঁধাকপি, গাজর, পালং, মেথিশাক, কালো কুচকুচে সুপুষ্ট বেগুন, টোমাটো, ঘন সবুজ ধনেপাতা, কলাই শাক ইত্যাদি নিয়ে বসেছে কাছাকাছি এলাকার চাষীরা। তাছাড়া অনেকেই রাস্তার কিনারে বড় বড় চ্যাপটা কানা-উঁচু টিনের পরাতের ওপর নানা ধরনের টাকটা মাছ সাজিয়ে বসেছে। সরপুঁটি, দিশি পাবদা, পাতি ট্যাংরা, খলসে, বাঁশপাতা, বাটা, কালবোস, এমনি কত কী। মনে হয় সবই আশেপাশের খাল বিল থেকে ধরে আনা।
পুরোদমে কেনাবেচা চলছে। মানুষজনের ভিড়ে জায়গাটা দস্তুরমতো সরগরম।
দু-একজনকে জিজ্ঞেস করে যে রাস্তাটা বাজারের পাশ দিয়ে পাক খেয়ে দক্ষিণে চলে গেছে সেখানে এসে রাজপুরের দিকের একটা বাস ধরল বিনয়। কলকাতায় যে ধরনের বাস চলে অবিকল তেমনি। লম্বা টিনের বাক্সের মতো বডি। কাঠের সিটে দু-আড়াই ইঞ্চি পুরু নারকেল ছোবড়ার শক্ত গদি।
রাস্তার হাল বেজায় খারাপ। খানাখন্দে বোঝাই। বাস ঝাঁকুনি খেতে খেতে চলেছে।
গড়িয়ার বাসের মতো রাজপুরের এই বাসেও প্যাসেঞ্জার বেশ কম। অনেক সিট খালি পড়ে আছে।
গডিয়া বাজারের জমজমাট এলাকাটা পেছনে ফেলে আসার পর একটা লোহার সরু মতো পুল পাওয়া গেল। কিছুক্ষণ আগে গড়িয়ার বাসে বসে যে খালটা চোখে পড়েছিল সেটা পুলের তলা দিয়ে চলে গেছে। পুলের পর থেকে রাস্তা ক্রমশ সরু হচ্ছে। এধারে বাড়িঘর আরও কম। গাছপালা বেশি। ঝোপঝাড় বেশি। কত যে বট, অশ্বথ আর পাকুড়। শয়ে শয়ে নারকেলগাছ। আর আছে অজস্র ছোট ছোট খাল, এই শীতেও নিচু জমিতে জল জমে আছে। সব মিলিয়ে পূর্ব বাংলার কথা মনে পড়িয়ে দেয়। প্রসাদ লাহিড়ির লিস্টে লেখা ছিল, সোনার বাংলা উদ্বাস্তু পল্লিতে যেতে হলে কোন স্টপেজে নামতে হবে। টিকিট কাটার সময় বিনয় কন্ডাক্টরকে জানিয়ে রেখেছিল, ভুবনমোহিনী গার্লস হাইস্কুল-এর স্টপেজে যেন তাকে নামিয়ে দেয়। কন্ডাক্টরটার দায়িত্বজ্ঞান যথেষ্ট। মিনিট পনেরো কুড়ি পর এক জায়গায় বাস থামিয়ে সে হাঁকল, বাবু আপনার ইস্টপেজ এসে গেছে।
জানালার বাইরে অন্যমনস্কর মতো তাকিয়ে ছিল বিনয়। মুখ ফিরিয়ে ধড় করে সে নেমে পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে একটানা কলকলানি ভেসে আসে। অল্পবয়সী মেয়েদের মিলিত কণ্ঠস্বর।
বিনয় লক্ষ করল একটু দূরে, রাস্তার বাঁদিক ঘেঁষে ইংরেজি এল হরফের আকারে সেকেলে ধাঁচের মস্ত একখানা দোতলা বাড়ি। সামনের দিকে গেট। গেটের মাথায় কাঠের বোর্ডে বড় বড় অক্ষরে স্কুলের নাম লেখা রয়েছে। পাঁচ ছয় থেকে ষোল সতেরো বছর অবধি, নানা বয়সের মেয়ে কাঁধে বইখাতা বোঝাই কাপড়ের ব্যাগ ঝুলিয়ে কলর বলর করতে করতে স্রোতের মতো স্কুলে ঢুকছে।
প্রসাদ লিখে দিয়েছেন, ভুবন মোহিনী গার্লস হাইস্কুল-এর উলটো দিকে একটা গেঁয়ো মাটির পথ রয়েছে। বাস রাস্তা পেরিয়ে ওধারে যেতেই তেমন একটা পথ পাওয়া গেল। সেটা ধরে বেশি দূর হাঁটতে হল না। বড় জোর মিনিট খানেক। তারপরেই মোটা বাঁশের একটা খুঁটি পোঁতা। সেটার সঙ্গে পেরেক দিয়ে আটকানো এক টুকরো লম্বা টিনের পাত। পাতটায় আঁকাবাঁকা অক্ষরে লেখা: সোনার বাংলা উদ্বাস্তু পল্লি।
দূর থেকে পাঁচমেশালি শব্দ ভেসে আসছিল। ঠক ঠক, ঘসর ঘসর, দুম দাম। আরও খানিকটা এগোতেই কলোনিটা চোখে পড়ল। সেখানে এখন নতুন নতুন ঘর তোলার কাজ চলছে। কেউ টিন বা খড় দিয়ে ছাউনি দিচ্ছে। কেউ পেরেক ঠুকে বেড়া লাগাচ্ছে, কেউ বা খুঁটি পুঁতছে। তৈরি হচ্ছে নতুন বসতি। উৎখাত হয়ে আসা মানুষের উপনিবেশ।
হঠাৎ পথের একধারে একটা দৃশ্য বিনয়কে অবাক করে দেয়। সেখানে পাহাড়প্রমাণ পোড়া কাঠ, বাঁশ, টিন, হোগলা, টালি আর ছন। এই ধ্বংসস্তূপের হেতুটা কী, ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। \
উত্তুরে হাওয়ায় পোড়া ছন আর হোগলার ছাই উড়ছিল। বিনয় আর দাঁড়ায় না। কয়েক পা যেতেই কলোনির দিক থেকে দশ বারো জন দৌড়ে আসে। তাদের মধ্যে দুচারটি যুবক ছাড়া বাকি সবাই বয়স্ক মানুষ। উদ্বাস্তু বলতে ত্রস্ত, শুষ্ক যে চেহারাগুলো চোখের সামনে ফুঠে ওঠে এরাও অবিকল তাই। বলা নেই কওয়া নেই, অচেনা একটা মানুষ কী উদ্দেশ্যে আচমকা তাদের কলোনিতে চলে এসেছে, বুঝতে না পেরে তাদের চোখেমুখে কত কী যে ফুটে ওঠে! সংশয়, শঙ্কা, উৎকণ্ঠা এবং সেই সঙ্গে কৌতূহলও।
