নিয্যস (নিশ্চয়ই) আইবেন। দেইখা যাইয়েন আমরা ক্যামন কইরা বাইচা আছি।
একটু চুপচাপ।
তারপর লোকটা, অর্থাৎ ধনঞ্জয় বণিক বলে ওঠে, তহন কইলেন কইলকাতার এই মাথায় আগে কুনোদিন আহেন নাই।
হ্যাঁ– বিনয় ঘাড় কাত করে। তাইলে আপনের ম্যালা (অনেক) কিছু চিনন জানন (চেনা জানা) দরকার। বলে ডান পাশে, রাস্তার ওধারে আঙুল বাড়িয়ে একটা উঁচু পাঁচিল দেখিয়ে ধনঞ্জয়। বলল, এহানে কী হয় জানেন?
জবরদখল কলোনি থেকে একেবারে আলাদা প্রসঙ্গে চলে গেছে লোকটা। বিনয় লক্ষ করল, পাঁচিলটা ফুটপাথের গা ঘেঁষে একটানা চলেছে তো চলেছেই। আন্দাজ করা যায়, ওটার ওপাশে অনেকখানি এলাকা রয়েছে। ভেতরে কী আছে, ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। যা চোখে পড়ছে তা হল উঁচু উঁচু সব বনস্পতি। বিনয় বলল, না, জানি না। ছুটির দিনে উইহানে সাহেব মেমগো মেলা বইয়া যায়। লম্বা লম্বা লোহার কাঠি আর সাদা বল দিয়া হেরা তমস্ত (সারা) দিন খেলে। এই খেলাটার কয়ে গলফো।
বিনয় অনুমান করে নিল, ধনঞ্জয়ের গলফো হল গলফ। কলকাতায় একটা বিশাল গলফ ক্লাব আছে, সেটা আগেই শুনেছে সে। খেলাটা কী ধরনের, সে-সম্বন্ধে তার বিন্দুমাত্র ধারণা নেই। তবে গলফ ক্লাবটা যে টালিগঞ্জেই, ধনঞ্জয়ের দৌলতে তা জানা গেল।
গলফ ক্লাবের লম্বা পাঁচিল পেছনে ফেলে কিছুক্ষণের মধ্যে ছনম্বর বাস একটা মোড়ের মাথায় চলে আসে। ফাটা রেকর্ডের মতো একটানা এক সুরে কন্ডাক্টরের চিল্লানি চলছেই, রানিকুঠি, গাছতলা, নাকতলা, রথতলা, গড়িয়াখালি গাড়ি, খালি গাড়ি–
মোড়ের মুখে মস্ত মস্ত শেডের তলায় কাতার দিয়ে ঝকঝকে অগুনতি ট্রাম দাঁড়িয়ে আছে। ধনঞ্জয় বলল, এইটা হইল গিয়া টালিগুঞ্জের টেরাম ডিপু। কইলকাতার টেরাম এই তরি (অবধি) আহে।
ধনঞ্জয় উপযাচক হয়ে গাইডের ভূমিকাটি নিয়েছে। অনেকটা যুগলেরই মতো। ধনঞ্জয়ের ধারণা সে কলকাতায় এসেছে বিনয়ের অনেক আগে, এই শহর সম্পর্কে সে অনেক বেশি অভিজ্ঞ। এখানকার পথঘাট, অন্ধিসন্ধি, সমস্ত কিছুই তার নখদর্পণে। কাজেই সদ্য-চেনা, তারই মতো বিক্রমপুইরা যুবকটিকে টালিগঞ্জ এলাকার যাবতীয় গুরুত্বপূর্ণ জায়গা চিনিয়ে দেওয়ার দায় যেন তারই। বিনয় মনে মনে একটু হাসে। উত্তর দেয় না।
ধনঞ্জয় সোজা রাস্তাটার দিকে একবার আঙুল বাড়ায়, এবং একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য পেশ করে। উই যে পথহান দেখতে আছেন, উইটা সিধা কুঘাটে গিয়া ঠেকছে। তার দুই ধারে আলিসান আলিসান সিনেমা বানানের কারখানা
কথাটা ঠিক বোধগম্য হল না বিনয়ের। একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, সিনেমা বানানোর কারখানা মানে?
বিনয়ের অজ্ঞতায় হয়তো করুণাই বোধ করে ধনঞ্জয়। তার দিকে ঝুঁকে জিজ্ঞেস করে, কাননবালা, অহীন্দ চধরি, রোবিন মজুমদার, বরুয়া, ভারতী, চন্দাবতী, জহর গাঙ্গুলি, রেণুকা রায়, ছবি বিশ্বাস, ফণী রায়-এনাগো নাম নি হোনছেন?
বিনয় বলল, এঁদের নাম কে না জানে? ঢাকায় গিয়ে ওঁদের ছবিও দেখেছি। শেষ উত্তর, মানে না মানা, শহর থেকে দূরে, দেবদাস, উদয়ের পথে–এমনি অনেক।
ধনঞ্জয় নিশ্চিন্ত হয়ে গেল। দুই হাত ঝাড়া দিয়ে বলে, তাইলে তো আপনে বেবাইক জানেন। যেনাগো নাম কইলেন তেনারাই এইহানে সিনেমা বানায়।
বাস বাঁয়ে ঘুরে একটা সরু রাস্তায়, খানিকটা পিচের, খানিকটা খোয়র, এবড়োখেবড়ো এসে পড়ে। মোড় থেকে দেড়শ দুশ ফিট যায়নি, হঠাৎ বাঁ পাশে হাত বাড়িয়ে খুবই উত্তেজিত হয়ে পড়ে ধনঞ্জয়। এই দ্যাহেন একখান সিনেমার কারখানা
বিনয় মাথা ঝুঁকিয়ে লক্ষ করল, একটা মস্ত গেটের মাথায় আধখানা বৃত্তের আকারে সাইনবোর্ড। তাতে লেখা ইন্দ্রপুরী স্টুডিও। গেট থেকে নুড়ি-বিছানো রাস্তা ভেতর দিকে যেখানে গিয়ে ঠেকেছে। সেই জায়গাটায় ফ্যাক্টরির শেডের মতো অ্যাসবেস্টসের ঢালু ছাদওলা উঁচু উঁচু অনেকগুলো বাড়ি।
লহমায় স্টুডিও পেছনে ফেলে ভাঙাচোরা রাস্তায় টাল খেতে খেতে অনেকটা এগিয়ে এল বাসটা। এবার দুধারে প্রচুর গাছপালা, ডোবা, পানাপুকুর, মাঝেমধ্যে ছিরিছাঁদহীন আদ্যিকালের কিছু বাড়িঘর। ফাঁকা, পোড়ো জমিই বেশি।
একসময় ধনঞ্জয় বলল, বাও (বাঁ দিকে নজর করেন বাবুমশয়। এইহান থিকা জবরদখল কুলোনি শুরু হইছে।
বিনয় দেখল, কাঁচা বাঁশের বেড়া, টিন কি টালির চালের ছাউনি মাথায় নিয়ে কত যে ঘর এলোমেলো বিশৃঙ্খলভাবে দাঁড়িয়ে আছে! ছিন্নমূল মানুষের ছন্নছাড়া উপনিবেশ। বিনয়ের মনে হল, সে যেন পূর্ব বাংলার কোনও হতদরিদ্র মানুষজনের গ্রামে চলে এসেছে।
ধনঞ্জয় একের পর এক কলোনিগুলোর নাম বলে যাচ্ছিল। অনেকটা রেডিওতে ধারাবিবরণী দেবার সুরে। বিনয় ভাবল, সুধাদের বাড়ির এত কাছে সার দিয়ে কলোনি রয়েছে। আর সে কিনা চলেছে অনেক দূরের কোন এক সোনার বাংলা উদ্বাস্তু পল্লিতে! টালিগঞ্জের এই এলাকাটা থেকে শুরু করলেই ভাল হতো। সে কি এখানেই কোথাও নেমে যাবে? পরক্ষণে মনে হল, না, থাক। সোনার বাংলা উদ্বাস্তু পল্লিতে যাওয়া যখন আগেই স্থির করে ফেলেছে তখন সেখানেই যাবে।
একটা তেমাথায় এসে গোলাপি রঙের বিশাল তেতলা বাড়ির সামনে বাস থামল। ধনঞ্জয় বলল, এই জাগাখানের নাম রানিকুঠি। মস্ত বাড়িটা দেখিয়ে বলে, যুঝের (যুদ্ধের) সোময় এই দালানখান মিলিটারিরা দখল কইরা নিছিল। জুয়ান পোলারা এইখানে আইয়া যুঝে যাওনের লেইগা নাম লিখাইত।
