বাসে প্যাসেঞ্জারও বেশ কম। রোগাটে চেহারার কন্ডাক্টরটা–গায়ে ময়লা খাটো পাজামা আর হাফ শার্টের ওপর সস্তা সোয়েটার, মাথা আর গলা পেঁচিয়ে কম্ফোর্টার-পাদানিতে দাঁড়িয়ে খ্যানখেনে গলায় গিটকিরি খেলিয়ে চেঁচিয়ে চলেছে একটানা-টালিগঞ্জ টেরাম ডিপো, রানিকুঠি, বাঁশধানি, নাকতলা, গড়িয়া–চলে আসুন, চলে আসুন, খালি গাড়ি
কলকাতায় আসার পর বিনয় যে বাসেই উঠেছে, সেটা যদি মুড়ির টিনের মতো বোঝাইও থাকে, সব কন্ডাক্টরের মুখে এক সুরে একই লজ, খালি গাড়ি, খালি গাড়ি– কথাটা মনে পড়তেই তার হাসি পায়।
একটা জোড়া সিটের জানালার পাশে বসে ছিল বিনয়। টালিগঞ্জে তার দৌড় সুধাদের জাফর শা রোডের বাড়ি, খান মঞ্জিল-এর সামনের রাস্তা, আর আদি গঙ্গার ধারের বাজার অবধি। এ-দিকটায় আগে আর কখনও আসেনি সে। ট্রাম রাস্তার দুধারই ফাঁকা ফাঁকা। প্রচুর বড় বড় ঝাড়ালো। গাছ চোখে পড়ছে। এইসব বনস্পতির মাথায় উড়ছে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি। তাদের ডানার অজস্র রঙে। রোদ পড়ে একটা ঝলমলে মায়াবি নকশা তৈরি হচ্ছে।
দুটো স্টপেজ পেরুবার পর একটা লোক বাসে উঠল। বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। ক্ষয়াটে, পাকানো চেহারা। কণ্ঠমণি ঠেলে বেরিয়ে এসেছে। খেলো ধুতি-শার্টের ওপর চাদর। চেহারা দেখেই টের পাওয়া যায় তার ওপর দিয়ে অনেক ঝড়ঝাঁপটা গেছে। এধারে ওধারে আট দশটা খালি সিট। চারদিকে তাকিয়ে কী ভেবে লোকটা বিনয়ের পাশে বসে পড়ল। তারপর গায়ের চাদরটা বেশ ঘন করে বুক পিঠ আর গলায় সাপটে জড়িয়ে নিল।
এক পলক তাকে দেখে ফের জানালার বাইরে চোখ ফিরিয়ে নেয় বিনয়। কিন্তু কলকাতার এই অচেনা এলাকাটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে যে দেখবে তার কি উপায় আছে? কেননা তার পাশের সহযাত্রীটি ভীষণ ছটফটে আর গায়ে-পড়া। চুপচাপ বসে থাকা তার ধাতে নেই। ঘাড় কাত করে দু-একবার বিনয়কে দেখে নেয়। তারপর জিজ্ঞেস করে, কদূর যাইবেন বাবুমশয়?
অগত্যা মুখ ফেরাতেই হয়। কোথায় চলেছে সেটা জানিয়ে দেয় বিনয়।
লোকটা বলল, হে তো ম্যালা (অনেক) দূর। আমি অতখানি যামু না। বাশধানীতে লামুম। লন (চলুন), কথা কইতে কইতে যাই।
ভাষা আর উচ্চারণ শুনে আগেই টের পাওয়া গেছে, লোকটা ওপার বাংলার। বিনয় বলল, বাশধানীটা কোথায়?
লোকটা বেশ অবাক হল, বাশধানী কুনখানে জানেন না? জাগানের নামও বুঝিন হুনেন নাই?
বাশধানীর নাম না-শোনা এবং এই শহরের কোথায় তার অবস্থান সেটা না-জানা কতটা অপরাধের, বোঝা যাচ্ছে না। বিনয় শুধু মাথা নাড়ে, না।
কী একটু চিন্তা করে লোকটা বলল, আপনে কি কইলকাতার মানুষ না?
খুব ছেলেবেলাটা অবশ্য কলকাতায় কেটেছে বিনয়ের। তারপর থেকে রাজদিয়াই তো তার সর্বস্ব। ধীরে ধীরে মাথা নাড়ে সে, না। আমি এখানে নতুন এসেছি।
লোকটা বিনয় সম্পর্কে কৌতূহলী হয়ে ওঠে, আপনের দ্যাশ কুনখানে?
ঢাকা ডিস্ট্রিক্টের রাজদিয়ায়।
লোকটার দুচোখ প্রবল উৎসাহে চকচক করতে থাকে। কন কী! রাইজদা তো আমি চিনি। বিক্রমপুরে। আমাগো বাড়ি আছিল বজরযুগনিতে (বজ্রযোগিনীতে)। বজরযুগনির নাম নি শোনছেন?
বিনয় ঘাড় কাত করল, শুনেছি। নাম-করা গ্রাম। দু-একবার সেখানে গেছিও।
লোকটা বলল, আপনেও বিক্রমপুইরা, আমিও বিক্রমপুইরা। কী ভালা যে লাগতে আছে। তা কবে আইছেন কইলকাতায়?
প্রথম দিকে বিরক্ত হচ্ছিল বিনয়। কিন্তু লোকটার কথাবার্তায়, স্বভাবে অদ্ভুত সারল্য মাখানো। তাছাড়া একই দেশে বাড়ি। তাকে এখন অসহনীয় মনে হচ্ছে না। বিনয় বলল, মাস দুই হবে। একটু বেশিও হতে পারে। আপনি কতদিন আগে এসেছেন?
বচ্ছরখানেক আগে। পাকিস্থানে তো আর থাকন গ্যাল না। ভিটামাটি খুয়াইয়া শিয়ালদর ইস্টিশানে আইয়া মাস তিন চাইর পোলামাইয়া লইয়া পইড়া রইলাম। হাজারে হাজারে রিফুজ। জাগাখান (জায়গাটা) এক্কেরে থিকথিকা নরক। একদিন ঠিক কইরা ফালাইলাম, উইহানে আর থাকাথাকি নাই। থাকলে পথের কুত্তা বিলাইয়ের (বেড়ালের) লাখান গুষ্টিসুদ্ধা শ্যাষ হইয়া যামু। শুনাশুন কানে আইল, রানীকুঠি বাঁশধানীর দিকে রিফুজরা জবরদখল কুলোনি বহাইতে আছে। অ্যামনেও মরুম, ওমনেও মরুম। ভাবলাম বাচনের চ্যাষ্টা কইরা দেখি। শিয়ালদায় সরকারি অফসরগো কিছু না জানাইয়া একদিন। রইতে চইলা আইলাম বাশধানীতে। হেই থিকা উইহানেই ঘর তুইলা রইছি। শিয়ালদার তুলনায় এই কুলোনি স্বগ্ন।
হুবহু যুগলদেরই কাহিনি। পশ্চিমবঙ্গের এক টুকরো ভূখণ্ড দখল করে তেমনি ঘরবাড়ি বানিয়ে নতুন করে বাঁচার অবিরল, প্রাণপণ প্রয়াস। বিনয় লোকটা সম্বন্ধে এবার রীতিমতো আগ্রহ বোধ করে। তাকে অফিস থেকে নানা রিফিউজি ক্যাম্প এবং কলোনিতে ঘুরে ঘুরে তথ্য জোগাড়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। লোকটা যেচে আলাপ করেছে, এ একরকম ভালই হল। ওদের কলোনিতেও যাবে। সে। হয়তো সেখানে চমকপ্রদ অনেক খবরাখবর পাওয়া যাবে। জিজ্ঞেস করে করে সে জেনে নিল, ওদের কলোনির নাম দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন নগর। ভারতবর্ষের এক সর্বত্যাগী জননায়কের নামে নতুন এই উপনিবেশের নাম। বাশধানীতে নেমে বাঁ দিকে মিনিট পনেরো হাঁটলে তাদের কলোনিতে পৌঁছনো যাবে। আরও জানা গেল, তার নাম ধনঞ্জয় বণিক।
প্রসাদ লাহিড়ির সেই লিস্টটায় দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন নগর-এর নাম আছে কি না, বিনয় মনে করতে পারল না। বলল, একদিন আপনাদের কলোনিতে যাব।
