অর্থাৎ মুকুন্দপুর জবরদখল কলোনিতে পূর্ব বাংলায় ফেলে আসা প্রিয় ভূখণ্ডটিকে নতুন করে গড়ে তোলার কাজ হাজার ব্যস্ততার মধ্যেও পুরোদমে চালিয়ে যাচ্ছে যুগল। রিফিউজি স্পেশাল বোঝাই হয়ে সীমান্তের ওপারের যে উদ্বাস্তুদের ঢল রোজ শিয়ালদায় নামে তাদের ভেতর থেকে রাজদিয়া অঞ্চলের লোক বেছে বেছে সে কলোনিতে নিয়ে যায়।
যুগল ফের বলে, মুকুন্দপুরে গ্যালেই দেখতে পাইবেন নয়া মানুষগুলান আপনের অচিনা (অচেনা) না। দ্যাশে থাকতে তাগো দ্যাখছেন।
কথায় কথায় রাত বাড়ে। শীতে শহর ক্রমশ নিঝুম ও অসাড় হয়ে যেতে থাকে। দূরের বড় রাস্তা থেকে ক্কচিৎ দু-একটা ট্রাম, বাস কি ঘোড়ার গাড়ির ছুটে চলার আওয়াজ ভেসে আসে।
এদিকে সুধা চঞ্চল হয়ে উঠেছে। কাল নটার ভেতর হিরণের অফিসের ভাত দিতে হবে। বিনয়ও বলে রেখেছে, সকাল সকাল বেরিয়ে পড়বে। তার জন্য তো বটেই, যুগল এসেছে, বাড়ির অন্য লোজন রয়েছে–এদের সবার জন্যও জলখাবার করতে হবে। খাওয়াদাওয়ার পর্ব চুকিয়ে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়া দরকার। সুধার আর বসে থাকার উপায় নেই। সে উঠে পড়ে, অনেক রাত হয়েছে। আর গল্প নয়। উমা আর আমি খাবার গরম করে দশ মিনিটের ভেতর তোমাদের ডাকছি। হাত মুখ ধুয়ে নাও। বলে সে বাইরের ঘর থেকে বেরিয়ে রান্নাঘরের দিকে চলে যায়।
.
খাওয়ার পালা চুকতে ঢুকতে রাত দশটা বেজে গেল। যুগল থাকবে। তার জন্য বাইরের ঘরে বিছানা পেতে দিল উমা।
.
৩৮.
নতুন ভারত-এর চিফ রিপোর্টার প্রসাদ লাহিড়ির সঙ্গে শান্তিনিবাস মেসে যেদিন বিনয় দেখা করতে যায় সেদিন তিনি রিফিউজি ক্যাম্প আর জবরদখল কলোনির লম্বা একটা লিস্ট তাকে দিয়েছিলেন। সেই তালিকার ভেতর থেকে সোনার বাংলা উদ্বাস্তু পল্লিটা বেছে রেখেছিল বিনয়। নামটা তার খুব ভাল লেগেছে। দেশ থেকে উৎখাত হওয়ার পর হাজার কষ্টেও এই কলোনির বাসিন্দাদের মন থেকে সোনার বাংলা মুছে যায়নি। যুগলের মতো তেমনই একটি কলোনি বঙ্গদেশ সীমান্তের এপারে তারাও বুঝিবা গড়ে তুলতে চায়। বিনয় ঠিক করেছে প্রসাদ যে অ্যাসাইনমেন্ট দিয়েছেন সোনার বাংলা উদ্বাস্তু পল্লি দিয়েই সেটা শুরু করবে। কাল রাতেই সে ভেবে রেখেছিল ভোর ভোর উঠে বেরিয়ে পড়বে। কিন্তু ঘুম ভাঙতে দেরি হয়ে গেল। ধড়মড় করে বিছানা থেকে বাইরে আসতে বিনয়ের চোখে পড়ল, দুজন ছাড়া সারা বাড়ি জেগে গেছে। দ্বারিক দত্তর যথেষ্ট বয়স হয়েছে, আর সরস্বতী সুস্থ হয়ে উঠলে এখনও বেশ দুর্বল। ওঁরা বেশ বেলা করে ওঠেন।
রান্নাঘরে এর মধ্যেই ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেছে। একই সঙ্গে চলছে রান্নাবান্না এবং জলখাবার তৈরির তোড়জোড়। সুধা আর উমার হাত চলছে নিপুণ যন্ত্রের মতো। কুটনো কোটা, চালধোয়া, জলখাবারের জন্য ময়দা মেখে লুচি বেলা–কাজ কি একটা দুটো? বিশ হাতে দুজনে তা সামলাচ্ছে।
সুধাকে এক ডেকচি গরম জল করে চানঘরে পাঠিয়ে দিতে বলে বিনয় শেভ করে, মুখ ধুয়ে নিল। তার মধ্যেই গরম জল পৌঁছে গেছে। তাড়াতাড়ি স্নান সেরে পোশাক পালটে সে সোজা চলে এল বাইরের ঘরে। সেখানে খবরের কাগজে চোখ বুলোত বুলোতে যুগলের সঙ্গে কথা বলছিল হিরণ। বিনয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, বেরুবার জন্যে একেবারে রেডি দেখছি।
হ্যাঁ সামান্য হেসে একটা চেয়ারে বসে পড়ে বিনয়।
প্রায় সঙ্গে সঙ্গে সুধা আর উমা বিনয় এবং যুগলের জন্য থালা বোঝাই করে লুচি তরকারি আর চা নিয়ে এল। হিরণের জন্য অবশ্য শুধুই চা আর একখানা বিস্কুট। ছুটির দিন বাদে সকালে চা-বিস্কুট ছাড়া আর কিছু খায় না সে।
সুধা বিনয়কে জিজ্ঞেস করে, এখন তো বেরুচ্ছিস। কখন ফিরবি?
যেখানে যাচ্ছে সেখানকার কাজ কখন শেষ হবে, কে জানে। বিনয় বলল, ঠিক বুঝতে পারছি না। দেরি হলে সোজা অফিসে চলে যাব।
দুপুরে কোথায় খাবি?
অফিসের কাছে নিশ্চয়ই হোটেল টোটেল আছে। সেখানে কোথাও খেয়ে নেব।
সুধা একটু ভেবে লল, যদি তাড়াতাড়ি কাজ হয়ে যায় বাড়িতে এসে খেয়ে যাস।
আচ্ছা—
সুধা আর উমা চলে গেল।
লুচি ছিঁড়ে ছিঁড়ে মুখে পুরছিল ঠিকই কিন্তু মাথার ভেতর সোনার বাংলা উদ্বাস্তু পল্লিটা ঘুরছিল। প্রসাদের লিস্টে কলোনিটার ঠিকানা দেওয়া আছে। গড়িয়ার মোড় থেকে রাজপুরের দিকে খানিকটা গেলে সেখানে পৌঁছনো যাবে।
টালিগঞ্জ থেকে শ্যামবাজার পর্যন্ত যাবতীয় রাস্তা, অলি গলি, বাসের রুট, ট্রামের রুট সড়গড় হয়ে গেছে বিনয়ের। কিন্তু গড়িয়া উড়িয়া তার কাছে সম্পূর্ণ অচেনা। সেখানে কীভাবে, কত নম্বর বাস ধরে যেতে হবে, খেতে খেতে হিরণের কাছে বিশদভাবে জেনে নিল।
খাওয়া শেষ হলে সে বলল, হিরণদা, এবার বেরিয়ে পড়ি। যুগলকে বলল, পরে তোমার সঙ্গে আবার দেখা হবে। তারপর রান্নাঘরের দরজার সামনে গিয়ে বলল, চলি রে ছোটদি–
সাবধানে যাস– সুধা কাটা আনাজ ধুচ্ছিল। আঁচলে ভেজা হাত মুছতে মুছতে বাইরে বেরিয়ে ভাইয়ের সঙ্গে সিঁড়ির মুখ পর্যন্ত এল।
.
বিনয় বড় রাস্তায় এসে ছনম্বর রুটের বাস ধরল। এটা গড়িয়া পর্যন্ত যাবে। সেখানে নেমে হরিনাভি রাজপুরের দিকের বাস ধরতে হবে।
কুয়াশা কেটে গিয়েছিল অনেকক্ষণ আগেই। এখন সোনালি রোদে ভরে গেছে সারা শহর। কিন্তু রোদটা এতটাই নিস্তেজ যে শরীরকে তপ্ত করে তোলার পক্ষে যথেষ্ট নয়। শীতল বাতাস ধীর চালে বয়ে চলেছে।
