মা-বাপদের হাল তো নুন আনতে পান্তা ফুরোয়। একবেলা ভাত জোটে তো আর-এক বেলা হরিমটর। স্কুল চালাতে গেলে আসল যেটা দরকার তা হল টাকা। তাছাড়া স্কুল খুললে সরকারি অনুমোদনও পেতে হবে।
রাজদিয়া হাইস্কুলে আশু দত্তর একজন প্রাক্তন ছাত্র এখন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের শিক্ষা দপ্তরে মস্ত বড় মাপের অফিসার। তাঁর কাছে গেলে মুকুন্দপুর স্কুলের সব সমস্যার সুরাহা হয়ে যাবে।
যুগল বলতে লাগল, মাস্টর মশয় তেনির ছাত্রর.কথা জানতেন। ঠিক কইরা রাখছিলেন, ইস্কুলের ঘরখান বানাইনা (তৈরি) হইলে ছাত্রর লগে দ্যাখা করবেন। হেইমতো আইজ মাস্টর মশয় আমারে টানতে টানতে ডালৎসিতে একহান বাড়ি লইয়া আইলেন। তিনতালা বাড়ি। কুনহানে আগা, কুনহানে শ্যাষ ঠাহর পাই না। কাতার দিয়া ঘরের পর ঘর। সুখের দিকে চওড়া বারিন্দা। এরে-ওরে জিগাইয়া একতালা দুইলা তিনতালা ঘুইরা যহন হেই অফসররে বাইর করলাম, মাজা (কোমর) বেইকা (বেঁকে) গ্যাছে। আমারই যদি এই অবোস্তা হয়, মাস্টর মশয়ের কী হাল হইছে, বুইঝা দ্যাহেন।
একটানা কথা বলে হাঁপিয়ে পড়েছিল যুগল। খানিকক্ষণ দম নিয়ে ফের শুরু করে, অফসরের নাম শিবনাথ স্যানগুপ্ত। পাও থিকা মাথার চুল তরি (অবধি) পুরা সাহেব। এত বড় অফসর কিন্তুক মাটির মানুষ। পুরানা মাস্টর মশয়রে ভুলে নাই। ম্যালা (অনেক) বচ্ছর পর আশু দত্তরে দেইখা পরথমে আটাস (অবাক) অইয়া গেল। হের পর তেনার পায়ে মাথা রাইখা স্যাবা দিল (প্রণাম করল)। হের পর মাস্টর মশয়রে গদি-আলা লম্বা চ্যারে (চেয়ারে) ধইরা ধইরা নিয়া বহাইল। চা আইল, বড় বড় সন্দেশ আইল, রসগুল্লা আইল। তরিজুত কইরা খাওয়ানের পর মাস্টর মশয়ের মুখে আমাগো ইস্কুলের কথা মন দিয়া হোনলেন।
ঘরের সবাই গভীর আগ্রহে শুনে যাচ্ছিল। দ্বারিক দত্ত জিজ্ঞেস করলেন, তারপর?
হগল হুইন্যা তেনি ভরসা দিয়া কইলেন, কুনো চিন্তা নাই। আমাগো কুলোনির স্কুলের লেইগা যত ট্যাকা দরকার, সরকার থিকা পাওন যাইব। আমরা অহন নিচ্চিন্ত। মাস্টর মশয়রে জোর কইরা কুলোনিতে ধইরা নিয়া গ্যাছিলাম। নাইলে স্কুলটা করতে পারতাম না। আমাগো পোলাপানগুলানও মানুষ হইত না।
দ্বারিক দত্ত বললেন, সেই কত বছর আগে ঢাকা থেকে এম এ পাস করে আসার পর হেমনাথ আর মোতাহার হোসেনের সঙ্গে আশু রাজদিয়ায় স্কুল বসিয়েছিল। এই বয়েসে কলোনিতে গিয়ে আবার বসাচ্ছে। বিয়েশাদি করে সংসার করল না। সারাটা জীবন স্কুল আর ছাত্রই ওর ধ্যানজ্ঞান। এমন মানুষ হয় না।
একধারে বসে শুনে যাচ্ছিল বিনয়। চকিতে একজনের কথা মনে পড়ে যায়। রামরতন গাঙ্গুলি। আশু দত্তর মতো তিনিও ইউনিভার্সিটিতে চোখ ধাঁধানো রেজাল্ট করার পর হেলায় নিজের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে পূর্ব বাংলার নগণ্য এক গ্রামে স্কুল বসিয়েছিলেন।
রামরতন সীমান্তের এপারে পৌঁছাতে পারেননি। আসতে পারলে আশু দত্তর মতো তিনিও হয়তো কোনও নিরক্ষর উদ্বাস্তুদের কলোনিতে স্কুল বসাতেন।
রামরতনের কথা ভাবার সঙ্গে সঙ্গে সারি সারি কটি মুখ চোখের সামনে ফুটে ওঠে। তার বৃদ্ধা স্ত্রী, বাসন্তী, ছায়া, মায়া। মাঝখানে কটা দিন নিজেকে নিয়ে বিনয়কে এতই ব্যতিব্যস্ত থাকতে হয়েছে যে ছায়া-মায়াদের একেবারেই ভুলে গিয়েছিল। অথচ ওরা তার মুখ চেয়ে বসে আছে। নিজেকে বড় বেশি আত্মকেন্দ্রিক মনে হয় বিনয়ের।
অসহায় চার রমণীকে নিদারুণ একটা খবর দেবার ছিল। নিত্য দাস জানিয়ে গিয়েছিল, জামতলির নাসের আলি তাদের দেশের বিষয়আশয় বিক্রির ব্যবস্থা করতে গিয়ে খুন হয়ে গেছেন। ওপার থেকে কিছু টাকা পয়সা পাওয়ার যে ক্ষীণ আশাটুকু ছিল তা বিলীন হয়ে গেছে। এই খবরটা ওদের জানানো হয়নি। তাছাড়া ছায়া-মায়ার চাকরির জন্য তার কাছে কত যে কাকুতি মিনতি করেছেন রামরতনের স্ত্রী। তা নিয়েও কিছুই করা হয়নি। ভেবেছিল, আনন্দ আর হিরণকে দুজনের জন্য যে কোনও সম্মানজনক কাজ জোগাড় করে দিতে ক্রমাগত চাপ দিয়ে যাবে। দেওয়া হয়নি। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ছায়া-মায়াদের সঙ্গে দেখা করতেই হবে।
এদিকে যুগল বলছিল, আইজ পুরা কাম হয় নাই। হেই অফসর কাইল দুফারে দুইটার সোময় ফির যাইতে কইছেন। আশু মাস্টর মশয়রে অনেকগুলান সরকারি চোতায় সই মই করতে অইব। হের পর আমরা মুকুন্দুপুর চইলা যামু।
বিনয় জিজ্ঞেস করল স্যারের মা তো সন্তোষবাবুদের কাছে ছিলেন।
হ। অহনও আছেন। সন্তোষবাবুরা তেনারে খুব যত্ন করেন।
স্যার কি এর মধ্যে তাঁকে মুকুন্দপুর নিয়ে যাবেন?
না না। বিলের কিনারে আমাগো কুলোনি। জবর টালকি (ঠান্ডা)। কইলকাতার থিকা পাঁচ সাতগুণ বেশি। এই সোময় বুড়া মানুষরে নিয়া গ্যালে বাঁচব না। শীতকালটা কাটুক, ফাগুন মাস পড়ক, রইদের (রোদের তাপ বাড়ুক, তহন উনি যাইবেন।
কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর একটু ভেবে বিনয় জিজ্ঞেস করে, মাঝখানে বেশ কয়েকদিন আমার মুকুন্দপুরে যাওয়া হয়নি। এর ভেতর নতুন কোনও রিফিউজি সেখানে গেছে?
যুগল বলল, গ্যাছে বিশ পঁচিশখান ফেমিলি। শিয়ালদহর ইস্টিশান থিকা আমিই তাগো লইয়া গ্যাছি।
এরা সব কোন জেলার লোক?
কুন জিলার আবার? ঢাকা বিক্রমপুরের। আমাগো রাইজদার চাইর পাশের গেরাম গুয়াখোলা, গিরিগঞ্জ, ডাকাইতা পাড়ায় তাগো ভিটামাটি আছিল।
