যুগলের হাঁকাহাঁকি চলছেই। সুধা আর বসে থাকল না। ত্বরিত পায়ে উঠে বাইরের ঘরের দরজার কাছে গিয়ে উঁচু গলায় উমাকে ডেকে নিচে পাঠিয়ে দিল। তারপর ফিরে এসে নিজের চেয়ারটিতে বসে পড়ল।
.
৩৭.
একটু পরেই উমার সঙ্গে সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠে বাইরের ঘরে চলে এল যুগল। উমা অবশ্য দোতলার ভেতর দিকে গেল না, দরজার কাছে দাঁড়িয়ে রইল। যুগল এসেছে, সুধা যদি তার জন্য কিছু এনে দিতে বলে, কিংবা অন্য কোনও দরকার হয়, সেই কারণে তার অপেক্ষা করা।
যুগলের পোশাক আশাক দেখার মতো। মাথা এবং গলা কম্ফোর্টারে ঢাকা। পরনে পাজামা আর হাফ শার্টের ওপর পোকায়-কাটা সোয়েটার। তার ওপর চাদর। আষ্টেপৃষ্ঠে এত গরম জামাকাপড় প্যাচানো সত্ত্বেও সে ভীষণ কাঁপছিল। মেঝের ওপর থেবড়ে বসে পড়তে পড়তে বলল, আইজ জবর টালকি (শীত)। শীতটা দেখা যাচ্ছে, দ্বারিক দত্তর মতো যুগলকেও কাবু করে ফেলেছে। সিমেন্টের মেঝেটা ঠাণ্ডা বরফ হয়ে আছে। কিন্তু হাজার বললেও যুগল বিনয়দের সামনে চেয়ারে বসবে না।
সুধা উমাকে বলল, যুগলের জন্যে আগে মোটা আসন দিয়ে যা–
উমা দৌড়ে একটা কম্বল-কাটা পুরু আসন নিয়ে এল। সেটা পেতে তার উপর বসতে বসতে যুগল বলল, হুদা আসনে মানাইব না। জিভ্যায় (জিভে) ছ্যাকা লাগে, বড় গেলাস ভইরা এমুন চা কইরা দিতে কন উমা বুইনরে।
খানিক আগেই আগুন আগুন চায়ের কথা হচ্ছিল। সুধা হিরণদের দিকে তাকিয়ে চোখ কুঁচকে একটু হাসল। অর্থাৎ এক ঘণ্টা পরে নয়, যুগলের কল্যাণে ঢের আগেই চাটা পাওয়া যাবে। সে উমাকে বলল, যুগল কী বলেছে, শুনলি তো? সবার জন্যে চা, আর যুগলের জন্যে চায়ের সঙ্গে কিছু খাবারও নিয়ে আসিস।
উমা আর দাঁড়াল না।
যুগল বলল, ছুটো দিদি, আইজ রাইতে আপনেগো এইহানে থাকুম। রান্ধন কি হইয়া গ্যাছে?
সুধা জিজ্ঞেস করল, কেন বল তো?
তাইলে আমার লেইগা চাউরগা (চাট্টি) চাউল লইয়েন।
ওবেলার প্রচুর ডাল ভাত মাছ মাংস তরকারি বেঁচে গেছে। শীতকালে এত তাড়াতাড়ি রান্না জিনিস নষ্ট হয় না। সেগুলো গরম করে নিলেই চলবে। যুগল একা কেন, আরও পাঁচজন এলেও নতুন করে ভাতটাত চাপাতে হতো না। সুধা বলল, ও নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না।
কাইল দুফারেও এইহানে খাইয়া যামু কিলাম (কিন্তু)।
ঠিক আছে।
একধারে বসে যুগলকে লক্ষ করছিল বিনয়।
পৃথিবীতে এমন দুচারটে মানুষ আছে যাদের দেখলে মন ভাল হয়ে যায়। যুগল তাদেরই একজন। কিছুক্ষণ আগেও যে ক্রোধ, ক্ষোভ এবং উত্তেজনা বিনয়ের মস্তিষ্কে টগবগ করে ফুটছিল, এখন সে-সব অনেকটাই জুড়িয়ে এসেছে। সে জিজ্ঞেস করল, এই রাত্রিবেলা হঠাৎ কোত্থেকে এলে?
যুগল বলল, আইছি কি অহন? হেই দুফারে মুকুন্দুপর থিকা বাইর হইছিলাম।
কলকাতায় কিছু দরকার ছিল?
হ। কইলকাতা ছাড়া বাচনের পথ আছে নিকি?
আশু দত্তর কথা মনে পড়ে গেল বিনয়ের। বেশ কয়েকদিন আগে যুগল তাদের কলোনিতে একটা স্কুল বসাবার জন্য একরকম জোর করেই তাকে মুকুন্দপুরে টেনে নিয়ে গিয়েছিল। তাঁর কথা খেয়াল ছিল না। ব্যস্তভাবে বিনয় জিজ্ঞেস করল, আশু স্যার কেমন আছেন?
উমা চা আর মিষ্টি নিয়ে এল। আয়েস করে গরম চায়ে চুমুক দিয়ে যুগল বলল, তেনিও তো আমার লগে আইছেন।
এখানে নিয়ে এলে না কেন?
তমস্ত দিন দুইজনে গরমেনের অপিসে ঘুরাঘুরি করছি। মাস্টর মশয় বুড়া মানুষ। হয়রান হইয়া পড়ছিলেন। কইলেন, আমারে সন্তোষের বাসায় দিয়া আয়। কালীঘাটে উনার মাউসাতো ভাইয়ের বাসায় রাইখা আপনেগো এইহানে চইলা আইছি। সন্তোষবাবুরা তেনাগো বাড়িতে থাকতে কইছিল। কিন্তু উইহানে জাগা কম। উনাগো অসুবিধা হইত। হের লেইগা আপনেগো কাছে চইলা আইলম। মাস্টর মশয় জানাইতে কইছেন পরে যেইদিন কইলকাতায় আইবেন, আপনের লগে দেখা করবেন। সোময় সুযুগ কইরা আপনেরে মুকুন্দুপুরে যাইতে কইছেন।
বিনয় বলল, স্যার ঈশ্বর গাঙ্গুলি স্ট্রিটে এসেছেন। এত কাছে, আমার নিজেরই এখন একবার যাওয়া উচিত। কিন্তু শরীরটা আজ ভাল নেই। কাল সকালে গিয়ে যে দেখা করব, তাও হবে না। অফিসের দরকারি কাজে ভোর হতে না হতেই বেরিয়ে পড়তে হবে। এখন মাসখানেক ভীষণ ব্যস্ত থাকব। পরে এক ছুটির দিনে মুকুন্দপুরে চলে যাব। তা গভর্নমেন্ট অফিসের কথা বলছিলে না?
যুগল বলল, হ।
সেখানে এসেছিলে কেন?
যুগল বিপুল উৎসাহে তড়বড় করে আগের ঘটনা পরে, পরের ঘটনা আগে সব জড়িয়ে মুড়িয়ে এলোমেলোভাবে যা বলল তা গুছিয়ে নিলে এইরকম দাঁড়ায়। তাদের কলোনিতে স্কুলের জন্য আপাতত মস্ত একখানা ঘর তৈরির কাজ শুরু হয়ে গেছে। এই নিয়ে ওখানে প্রচণ্ড উদ্দীপনা। মুকুন্দপুরবাসীরা ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছে। তাদের জীবন কষ্টেসৃষ্টে কোনওরকমে কেটে যাচ্ছে। কিন্তু পেটে কালির অক্ষর না ঢুকলে সীমান্তের এপারে তাদের সন্তানদের টিকে থাকাই মুশকিল। ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া শিখলে চাকরিবাকরি মিলবে। তাদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিশ্চিন্ত হওয়া যাবে।
কিন্তু শুধুমাত্র উদ্দীপনা থাকলেই তো হয় না। যুগলরা না হয় ঘর বানিয়ে দিল। সেটাই তো সব নয়। স্কুল চালাতে গেলে বহু কিছু দরকার। আশু দত্তর যথেষ্ট বয়স হয়েছে। তার একার পক্ষে কলোনির এতগুলো বাচ্চাকে মুখে ফেনা তুলে কতকাল পড়ানো সম্ভব? সেজন্য এখনই আর একজন টিচার না নিলেই নয়। কিন্তু নিলেই তো হল না। তাকে পয়সাকড়ি দিতে হবে। ছেলেমেয়েদের বইপত্র খাতাপেন্সিল চাই।
