অসহ্য রাগে ব্ৰহ্মরন্ধ্র জ্বলে যাচ্ছিল বিনয়ের। কিন্তু নিজেকে এবার আর ফেটে পড়তে দিল না। স্নায়ুমণ্ডলীকে প্রাণপণে নিয়ন্ত্রণে রাখল। খুব ঠাণ্ডা গলায় সে বলে, ছোটদি, একটা কথা তোকে স্পষ্ট করে বলছি।
বিনয়ের কণ্ঠস্বর শান্ত হলেও তার মধ্যে এমন একটা দৃঢ়তা এবং জেদ মেশানো রয়েছে যাতে চমকে ওঠে সুধা। ভয়ে ভয়ে বলে, কী রে?
শিশিরবাবু যে চাকরির কথা বলেছেন সেটা আমি কিছুতেই নেব না।
বিমূঢ়ের মতো সুধা বলে, এত ভাল চাকরি। নিবি না!
না। কিছুতেই না। তুই বা হিরণদা ভদ্রলোককে আমার কথাটা জানিয়ে দিস।
সুধা কিছুক্ষণ মুখ চুন করে থাকে। তারপর স্নান সুরে বলে, শিশিরদা আমাদের চেয়ে বয়েসে কত বড়। গুরুজন। নিজে বাড়িতে এসে বলে গেছেন। হুট করে কি তাকে না করে দেওয়া যায়? ভীষণ অপমানিত বোধ করবেন।
বিনয় বলল, ঠিক আছে, তোদর কিছু করতে হবে না। যা করার আমি করব।
শঙ্কাভরা চোখে ভাইয়ের মুখের দিকে তাকায় সুধা। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে তাকে দেখে। তারপর বলে, দেখিস বিনু, এমন কিছু করিস না, যাতে আমাদের সঙ্গে সম্পর্কটা নষ্ট হয়ে যায়। হাজার হোক, ওঁরা রাজদিয়ার লোক। দিদির দিক থেকেও ঘনিষ্ঠ কুটুম।
চিন্তা করিস না। তোদের সম্পর্ক নষ্ট হবে না।
একটু চুপচাপ।
তারপর সুধা বলল, চল। চা করে বাইরের ঘরে রেখে এসেছি। বোধহয় এতক্ষণে জুড়িয়ে গেল।
শীত পড়তেই এ-বাড়িতে দুপুরের পর দুবার চা হচ্ছে। একবার বিকেলে, একবার সন্ধের পরপর। আনন্দরা থাকতে বিকেলের চা খাওয়া হয়ে গিয়েছিল। এখন দ্বিতীয় প্রস্থ। বিনয় আস্তে আস্তে উঠে পড়ে। বলে, চল–
খাট থেকে দুজনে নেমে পড়ে। আলনা থেকে একটা চাদর নামিয়ে সারা শরীরে জড়িয়ে নেয় বিনয়।
বাইরের ঘরে এসে দেখা গেল দ্বারিক দত্ত কান-ঢাকা উলের টুপি এবং গায়ে শাল চাপিয়ে গুটিসুটি বসে আছেন। শীতকালটা বুড়ো মানুষদের ভীষণ কাবু করে ফেলে।
দ্বারিক দত্তর মুখোমুখি বসে ছিল হিরণ। তার পরনে ঘরে পরার পোশাক। পাজামা-শার্টের ওপর ফুলহাতা গরম সোয়েটার। মাঝখানের সেন্টার টেবলটায় কাঠের ট্রেতে চার কাপ চা। যাতে ঠাণ্ডা হয়ে না যায়, তাই সেগুলোর ওপর প্লেট ঢাকা দেওয়া রয়েছে। আর আছে মস্ত একটা প্লেট বোঝাই স্থানীয় কোনও বেকারির এস বিস্কুট। সেগুলো এমনই কড়কড়ে যে দ্বারিক দত্তর পক্ষে বাঁধানো দাঁত দিয়ে চিবানো শক্ত। তাই তার জন্য থিন অ্যারারুট বিস্কুটও আছে খানকতক।
বিনয় নিঃশব্দে হিরণের পাশে বসে পড়ে। সুধা বসল দ্বারিক দত্তর কাছাকাছি একটা চেয়ারে।
দ্বারিক দত্ত বললেন, বিনু, কী করছিলি এতক্ষণ? আমরা তোর জন্যে বসে আছি।
তার জন্য বুড়ো মানুষটির এখনও চা খাওয়া হয়নি, হিরণও হাত গুটিয়ে বসে আছে। বিনয় একটু লজ্জা পেল। কিছু একটা কৈফিয়ৎ দিতে যাচ্ছিল, তার আগেই সুধা বলে ওঠে, কাল জ্বর হয়েছিল। তারওপর দুপুর অবধি খুব ছোটাছুটি গেছে। শরীরটা ভাল নয়। তাই শুয়ে পড়েছিল। বিনয় যে ক্ষোভে রাগে উত্তেজনায় সবার কাছ থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিল সেটা আর জানালো না। পাছে চাকরির কথা, দাবার চতুর চালের মতো শিশিরের গোপন ফন্দির কথা উঠে পড়ে এবং তার ফলে খানিক আগের মতো বিনয় গনগনে ক্রোধে ফের একটা অগ্নিকাণ্ড ঘটিয়ে বসে, সেই ভয়ে একেবারে উতলা হয়ে আছে সুধা।
দ্বারিক দত্ত বললেন, নাও, সবাই চা খাও বলে একটা কাপ আর থিন বিস্কুট তুলে বিস্কুটটা চায়ে ভিজিয়ে নরম করে খেতে লাগলেন।
বিনয়রাও হাতে হাতে কাপ তুলে নিয়েছিল। কিন্তু চা প্রায় ঠাণ্ডা হয়ে এসেছে। শীতের সন্ধ্যায় এমন পানীয়ে গা গরম হয় না।
হিরণ সুধাকে বলল, ধুর, জুত হচ্ছে না। শীতকালে আগুন আগুন চা না হলে চলে! উমাকে আর-এক বার চা করতে বল।
সুধা বলল, এখনও তো হাতের কাপটা শেষ হয়নি। ঘন্টাখানেক পর চায়ের জল চড়াতে বলব।
ঠিক আছে। যখন হোক পেলেই হল।
সুধার শঙ্কা বা দুশ্চিন্তা ধীরে ধীরে কেটে যেতে থাকে। না, ওবেলার মতো খান মঞ্জিল, বিনয়ের চাকরি, এই সব নিয়ে কেউ একটি শব্দও মুখ থেকে বার করল না। বরং এ-বছরের শীত নিয়ে আলোচনাটা একই বৃত্তে পাক খেতে লাগল। অল ইণ্ডিয়া রেডিওর নিউজে জানিয়েছে, খবরের কাগজেও বেরিয়েছে, এমন শীত নাকি কলকাতায় গত দশ বছরের মধ্যে পড়েনি।
দ্বারিক দত্ত বললেন, তোমাদের গরম রক্ত। ঠাণ্ডা সহ্য করার শক্তি আছে। আমার তিনকাল গিয়ে এক কালে ঠেকেছে। রাতে লেপ-তোষকের ভেতর হিহি করে কপি। মনে হয়, বরফের মধ্যে শুয়ে আছি। আরও ঠাণ্ডা পড়লে বাঁচব না। এটাই হবে আমার জীবনের শেষ শীত।
সুধা ধমকে ওঠে, কী বাজে কথা বলছেন দাদু! কলকাতা শহরে এক শ বছরের বেশি কত লোক বেঁচে আছে জানেন?
দ্বারিক দত্ত হাসেন, তারা এক্সট্রা-অর্ডিনারি। ভগবানের বরে অক্ষয় পরমায়ু নিয়ে জন্মেছে।
এই ধরনের লঘু চালের কথাবার্তা যখন চলছে, আচমকা বাইরে থেকে যুগলের উঁচু গলার ডাক ভেসে এল, ছুটো দিদি, জামাইবাবু, ছুটোবাবু, তরাতরি দুয়ার খোলেন। একেরে কালাইয়া (জমে) গ্যালাম। সে যখনই আসে দশ দিগন্ত কাঁপিয়ে হাঁক পাড়ে।
সবাই অবাক। মাত্র একবার ছাড়া আগে আর কখনও যুগল সন্ধের পর এ-বাড়িতে আসেনি। আজ হঠাৎ কী এমন ঘটতে পারে যে তাকে এসময় আসতে হল!
