ঘরের জানালাগুলো বন্ধ। সামনের দিকের দরজার একটা পাল্লা সামান্য খোলা। গলা পর্যন্ত ভারী লেপ টেনে সেই ফঁক দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে বিনয়। অন্যমনস্কর মতো। দিনের শেষে আলোটুকু আরও মলিন হয়ে গেছে। কুয়াশা গাঢ় হতে শুরু করেছে। রাস্তায় মিউনিসিপ্যালিটির টিমটিমে বাতিগুলো এর মধ্যেই জ্বলে উঠেছে। সামান্য ম্যাড়মেড়ে আলো ছাড়া সেগুলোর কাছ থেকে আর কিছু পাওয়ার আশা নেই। যতদূর নজর যায়, সেই ট্রাম রাস্তা অবধি, সবই ঘোলাটে, ঝাপসা। এখনও ভাল করে সন্ধে নামেনি, তবু চারপাশ ঠাণ্ডায় কেমন যেন কুঁকড়ে যাচ্ছে।
বিনয় তাকিয়ে ছিল ঠিকই কিন্তু কিছুই লক্ষ করছিল না। তার বুক ঝিনুকের জন্য নতুন করে উথালপাতাল হয়ে যাচ্ছিল।
সুধা ঘরে ঢুকল। ভেতরটা বাইরের থেকে অনেক বেশি অন্ধকার। সে সুইচ টিপতেই সারা ঘর আলোয় ভরে গেল। অসময়ে বিনয়কে লেপ ঢাকা দিয়ে শুয়ে থাকতে দেখে সে যতটা অবাক, তার চেয়ে অনেক বেশি চিন্তিত। উদ্বিগ্ন সুরে জিজ্ঞেস করল, কি রে, এই সময় শুয়ে আছিস যে?
বিনয় উত্তর দিল না।
সুধা আপাতত আর কিছু বলল না। সন্ধেবেলায় ঘরে ঘরে ধূপ জ্বালানো তার দৈনন্দিন কর্মসূচির মধ্যে পড়ে। সংসারের কোনও কাজই সে হেলাফেলা করে সারে না। সমস্ত কিছুর মধ্যেই থাকে। তার যত্ন এবং নিষ্ঠা। ভাইয়ের দিকে কয়েক পলক তাকিয়ে থেকে ডানপাশের দেওয়ালের কাছে চলে গেল। দেওয়ালের গায়ে একটা সিমেন্টের চওড়া তাক। সেটার ওপর গঙ্গাজলের বোতল, ধুপকাঠির বাক্স, দেশলাই আর অজস্র ছিদ্রওলা পেতলের ধূপদানি সাজানো রয়েছে।
সুধা গঙ্গাজলে হাত ধুয়ে বাক্স থেকে চারটে ধূপকাঠি বার করে, দেশলাই দিয়ে ধরিয়ে নিচের ছুঁচোলো অংশগুলো ধূপদানির সরু সরু ফুটোয় গুঁজে দিল। জ্বলন্ত ধূপকাঠি থেকে ধোঁয়া বেরিয়ে চন্দনের সুগন্ধ ছড়িয়ে দিতে লাগল চারদিকে।
এবার সুধা চলে আসে ভাইয়ের কাছে। অনেকখানি ঝুঁকে বলে, শরীর খারাপ লাগছে? আবার কি জ্বরটা এল?
নীরস গলায় বিনয় বলল, না।
কথাটা বুঝি বা বিশ্বাস হল না সুধার। ভাইয়ের পাশে বসে তার কপালে গালে গলায় হাত বুলিয়ে পরখ করে নিল। উৎকণ্ঠার কারণ নেই। মানুষের শরীরে স্বাভাবিক যেটুকু তাপ থাকা দরকার তার বেশি কিছু নয়। নিশ্চিন্ত হয়ে সুধা বলে, গা তো বেশ ঠাণ্ডাই। ভর সন্ধেবেলায়, কেউ শুয়ে থাকে? ওঠ ওঠ। উমার চা হয়ে গেছে। দাদু আর তোর হিরণদা বাইরের ঘরে তোর জন্যে অপেক্ষা করছে। চা খাবি চল–
এক ঝটকায় গা থেকে লেপটা সরিয়ে দিয়ে উঠে বসে বিনয়। ঝাঁঝালো গলায় বলে, এ-সবের মানে কী? তার মুখ কঠোর হয়ে উঠতে থাকে।
বিনয় ছেলেবেলায় একটু আধটু দুষ্টুমি করত ঠিকই। সুধার সঙ্গে সারাক্ষণ তুমুল যুদ্ধ লেগেই থাকত। কিন্তু বড় হবার পর খুব শান্ত হয়ে গিয়েছিল। তাকে এমন উগ্র মেজাজে দেখে হকচকিয়ে যায় সুধা। কিছু একটা জবাব দিতে যাচ্ছিল, তার আগেই গলার স্বর আরও চড়িয়ে দেয় বিনয়, আমার চাকরির জন্যে শিশিরবাবু কেন এত উঠে পড়ে লেগেছেন তা কি আমি বুঝতে পারিনি? আর তোরাও তা জানিস।
সুধা ঘাবড়ে যায়। মানে–মানে–
রোষে ফুঁসতে থাকে বিনয়, ঝিনুক বলে একটা মেয়ে যে ছিল তার কথা একবারও তোদের মনে পড়ল না? ওকে সুস্থ করে তুলতে, ওর মন থেকে ভয় সংকোচ লজ্জা ঘুচিয়ে দিতে কী না করেছিস তোরা? আর এই অল্প কটা দিনের ভেতর শেষের দিকে তার গলা বুজে আসে।
পাংশু মুখে বসে থাকে সুধা।
বিনয় আবার আগের মতো ঝাঁঝের সুরে বলে, ঝিনুকের সঙ্গে আমার সম্পর্কটা তোরা জানিস না?
সুধা, সুনীতি বা জগৎ সংসারের আর কারও কাছেই এত সোজাসুজি, এমন স্পষ্ট করে আগে কখনও ঝিনুকের সঙ্গে তার সম্পর্কের কথা বলেনি বিনয়। প্রয়োজনও হয়নি। আত্মীয় পরিজন থেকে শুরু করে চেনাজানা সবাই জানত, ঝিনুক তার জীবনের কত বিশাল একটা অংশ জুড়ে রয়েছে। সেই কোন ছেলেবেলা থেকে তার যাবতীয় আশা, যাবতীয় সুখদুঃখ, সমস্ত কিছুর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মেয়েটা। তাকে বাদ দিয়ে নিজের কথা ভাবতেই পারে না বিনয়। তাকে যদি দুখণ্ড করা যায় তার একটা অংশ অবশ্যই ঝিনুক।
সুধার উত্তর শোনার আগেই বিনয় ফের বলে ওঠে, তোরা যা মতলব করেছিস তা কখনই হবে না।
সুধা ভাইয়ের পিঠে একটা হাত রেখে তাকে শান্ত করতে চেষ্টা করে। নরম গলায় বোঝাতে থাকে, দ্যাখ, শিশিরদাদের অনেকদিন ধরেই হয়তো ইচ্ছে ছিল ঝুমার সঙ্গে তোর বিয়ে হোক। আমি সেটা জানতে পেরেছি এই সেদিন। ঝিনুক থাকলে নিশ্চয়ই ওরা এ ব্যাপারে এগুতো না। কিন্তু কত খোঁজাখুঁজি করা হল। এত দিনেও তার হদিস পাওয়া গেল না। নিজের থেকে যে হারিয়ে যায় তার সন্ধান কি আর মেলে? সে সবিস্তার বলে যায়, তাই শিশিরদা আর স্মৃতিরেখাদি যখন আনন্দদা আর দিদিকে তোর চাকরি আর ঝুমার সঙ্গে বিয়ের কথা বলল, আনন্দদারা সঙ্গে সঙ্গে আমাদের তা জানিয়ে দিয়েছে। আমরাও অনেক ভেবে দেখলাম, ছন্নছাড়ার মতো বাকি জীবন কাটিয়ে দিবি, তা তো আর হয় না। তাছাড়া, এক্সচেঞ্জ করে খান মঞ্জিল-এর মতো অত বড় একখানা বাড়ি পাওয়া গেছে। একতলা দোতলা তিনতলা মিলিয়ে কত ঘর–তোর বিয়ে হলে সবাই একসঙ্গে থাকা যাবে। বাড়ি জমজমাট হয়ে উঠবে।
বিনয় থ হয়ে যায়। তাকে নিয়ে সুধারা এমন সুদূরপ্রসারী একটা পরিকল্পনা যে করেছে, আগে ঘুণাক্ষরেও টের পাওয়া যায়নি। চকিতে মনে পড়ে গেল, আজই দুপুরে তাকে আলাদাভাবে খান মঞ্জিল-এর দোতলায় পুব-দক্ষিণ ভোলা প্রশস্ত ঘরখানায় টেনে নিয়ে গিয়ে হিরণ বলেছিল, এই ঘরখানা তার। বিনয়ের যদি মনে হয়, ঘরটার কিছু অদলবদল করবে, করে নিতে পারে। তখন খেয়াল হয়নি, এখন হিরণের উদ্দেশ্যটা পরিষ্কার হয়ে গেল। ঝুমার সঙ্গে বিয়ের বিয়ে হবে এবং পাকাপাকিভাবে তারা ওদের কাছে থেকে যাবে, এটাই ওদের একান্ত ইচ্ছা।
