ঝুমার নাম শোনার সঙ্গে সঙ্গে সারা শরীরে চমক খেলে যায় বিনয়ের। শিশিরের এ-বাড়িতে ছুটে আসা, সাহেব কোম্পানিতে দামি চাকরি জোগাড় করে দিয়ে তার নিরাপদ, ঝলমলে ভবিষ্যতের ব্যবস্থা করে দেওয়া, এসবের মধ্যে কীসের একটা সংকেত যেন দ্রুত ফুটে উঠছে।
শিশির যে চাকরিটার কথা বলেছেন, মুরুব্বির জোর ছাড়া তা পাওয়া অসম্ভব। ওটা পাওয়া মানে আকাশের চাঁদ মুঠোয় পুরে ফেলা। অন্য কেউ হলে আহ্বাদে গলে পড়ত। কিন্তু বিনয় টের পাচ্ছে, চাপা একটা রাগ আর অস্বাচ্ছন্দ্য তার ভেতরে কোনও একটা বিন্দু থেকে উঠে এসে তপ্ত বাষ্পের মতো মস্তিষ্কে ছড়িয়ে পড়ছে। ঘাড় গোঁজ করে বসে থাকে সে।
শিশির বিনয়ের মুখচোখের দিকে লক্ষ করেননি। বলতে লাগলেন, তোমার কাগজের অফিস সেন্ট্রাল অ্যাভেনিউতে। আমাদের বাড়ি থেকে খুবই কাছে। আমি অফিস থেকে ছটা সাড়ে ছটার ভেতর চলে আসি। কাল কি পরশু একটু সময় করে সন্ধেবেলায় আমাদের বাড়ি একবার এস। যদি তাড়া থাকে অ্যাপ্লিকেশনটা লিখে দিয়েই চলে যেও। মনে থাকবে তো?
থালায় ভাত নাড়াচাড়া করতে করতে অস্পষ্ট জড়ানো গলায় বিনয় কী উত্তর দিল, নিজের কাছেই তা পরিষ্কার নয়। তবে সে ঠিকই করে ফেলেছে, জেসপ কোম্পানির চাকরিটা কোনওভাবেই নেবে না। নতুন ভারত ছাড়বার কথা এই মুহূর্তে সে ভাবতেই পারছে না।
শিশির বললেন, তোমার জন্য ওয়েট করব। অবশ্যই এস কিন্তু
বিনয় আগের মতোই আবছা গলায় কিছু বলল।
.
বিনয়দের খাওয়াদাওয়া চুকলে সুধা-সুনীতিরাও খেয়ে নিল। তারপর বাইরের ঘরে খানিকক্ষণ হালকা মেজাজে সবাই মিলে গল্পগুজব। বিনয় অবশ্য একধারে চুপচাপ বসে আছে। এই আড্ডা তার ভাল লাগছিল না। কেউ তাকে কিছু বললে, শুধু হাঁ করে যাচ্ছিল। হিমঋতুর দিনটা দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। শীতের বেলা এই আছে এই নেই। আনন্দরা আর দেরি করল না। সেই উত্তর কলকাতায় যেতে হবে। বিকেলের চা খেয়ে একসময় তারা উঠে পড়ল। হিরণ বিনয় এবং সুধা বড় রাস্তা অবধি সঙ্গে সঙ্গে গিয়ে তাদের ট্যাক্সিতে তুলে দিল। গাড়িটা চলতে শুরু করলে জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে বিনয়কে আরও একবার তাদের বাড়িতে যাওয়ার কথাটা মনে করিয়ে দিলেন শিশির।
৩৬-৪০. বড় রাস্তা থেকে বাড়ি ফিরে
৩৬.
বড় রাস্তা থেকে বাড়ি ফিরে সোজা নিজের ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ল বিনয়। রাগে তার মাথায় আগুন ধরে গেছে ঠিকই, তবে তার চেয়ে অনেক বেশি অবাক হয়েছে সে। তার ভাল একটা চাকরির জন্য শিশিরের এত আগ্রহের তো একটাই উদ্দেশ্য। প্রথমে তাকে দাঁড় করিয়ে দেবেন। ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করার পর ঝুমার সঙ্গে বিয়ের কথা পাড়বেন। এর পেছনে নিশ্চয়ই ঝুমার জোরালো চাপ রয়েছে। সে কী ধরনের মেয়ে, বিনয়ের চেয়ে কে আর ভাল জানে। ঝুমা যা চায়, পৃথিবীর সব বাধা চুরমার করে তা আদায় করে নেবার শক্তি তার আছে। হয়তো শিশিরকে তার ইচ্ছার কথা সরাসরি বলেনি। হাজার হোক তিনি বাবা। হয়তো স্মৃতিরেখা কিংবা সুনীতিকে বলেছে। তারা জানিয়েছে শিশিরকে। আনন্দদের সঙ্গে নিখুঁত পরিকল্পনা ছকে তিনি ছুটে এসেছেন টালিগঞ্জে। খান মঞ্জিল সারানোর ব্যবস্থা করা নিশ্চয়ই একটা কারণ, কিন্তু সেটা তো বংশী সিংকে চিঠি লিখে পাঠিয়ে দিলেই চলত। আসল কারণটা হল, আপাতত লোভনীয় চাকরির টোপ নাকের সামনে ঝুলিয়ে বিনয়কে মুঠোয় পুরে ফেলা। টোপটা গিললেই রূপকথার সেই গল্পের মতো ইহার পর ইহারা সুখে স্বচ্ছন্দে ঘর-সংসার করিতে লাগিল গোছের পরম রমণীয় একটা পরিসমাপ্তির দিকে তাকে টেনে নিয়ে যাবেন শিশিররা।
কিন্তু এরা ভেবেছে কী? পৃথিবী নামে গ্রহে ঝিনুক নামে যে একটি মেয়ে ছিল, মাত্র মাসখানেক হল সে নিরুদ্দেশ হয়েছে, সেটা কি এদের স্মৃতি থেকে একেবারেই মুছে গেছে? ঝিনুকের নামটা কারও মুখে একবারও তো শোনা গেল না! সবাই ভুললেও বিনয় কিন্তু তাকে মুহূর্তের জন্যও ভোলেনি। সে মিশে আছে তার শ্বাসবায়ুতে, আছে তার রক্তেমাংসে, তার হাডেমজ্জায়। কতভাবে যে মেয়েটা তাকে জড়িয়ে রয়েছে, একমাত্র সেই জানে। যখনই কোনও ধর্ষিত মেয়ের কথা কানে আসে কিংবা খবরের কাগজে তাদের মর্মান্তিক লাঞ্ছনার বিবরণ পড়ে, এই যেমন লাহোরের নীলম, কুমিল্লার দীপালি, তারপাশা স্টেশনে যে মাঝবয়সী জননীটি অঝোরে কেঁদে যাচ্ছিল তার মেয়ে, মুকুন্দপুর কলোনির কটি তরুণী ছাড়াও সর্বস্বখোয়ানো শত সহস্র কিশোরী যুবতী–তখনই ঝিনুক হাজার দিক থেকে তাকে বেড়াজালের মতো ঘিরে ধরে।
বিনয়ের বদ্ধমূল বিশ্বাস, নিরুদ্দেশ হয়ে গেলেও কোথাও না কোথাও সে বেঁচে আছে। শুধু তাই না, একদিন না একদিন তার সঙ্গে দেখাও হয়ে যাবে। কেন এমনটা মনে হয়, যুক্তি দিয়ে বিনয় বোঝাতে পারবে না। বিশ্বাস বিশ্বাসই।
সবচেয়ে যেটা আশ্চর্যের ব্যাপার তা হল সুধা আর হিরণের আচরণ। হেমনলিনী যখন ঘাড়ধাক্কা দিয়ে ঝিনুককে বাড়ি থেকে বার করে দিয়েছিলেন, সুধারাই অফুরান মমতায় তাকে কাছে টেনে নিয়েছিল। আগলে আগলে রেখেছিল দুহাত দিয়ে। অথচ শিশির কী কারণে এ-বাড়িতে এসেছিলেন, সব জেনেও ওরা কেউ আপত্তি করেনি। বরং মনে হয়েছে শিশিরের কথায় ওদের যথেষ্ট সায় রয়েছে।
এটা ঠিক, প্রায় সারাদিন প্রচুর কথাবার্তা হয়েছে, অবিরল হাসিঠাট্টা, কিন্তু কুমার নাম একবারও কারও মুখে শোনা যায়নি। কিন্তু শিশির যখন চাকরির ব্যাপারটা টেনে আনলেন তখন থেকেই তার অস্তিত্ব টের পাওয়া যাচ্ছিল। তাকে চোখে দেখা যাচ্ছিল না ঠিকই কিন্তু সে ছিল, প্রবলভাবেই ছিল। তারই জন্য চাকরির সোনালি সুতোর ফাঁসে বিনয়কে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়াতে চান শিশির, তা বুঝেও একটি বার ঝিনুকের কথা মনে পড়ল না সুধাদের? সুধারা কি জানে না, ঝিনুকের জন্য দিনের পর দিন, বছরের পর বছর, এমনকি শত আলোকবৰ্ষ সে অপেক্ষা করে থাকবে?
