একই দেশে বাড়ি। বাবার চেয়ে দ্বারিক দত্ত বয়সে বড়। সেই সুবাদে জেঠামশাই। এবং গুরুজন। ব্রিটিশ কোম্পানিতে মস্ত অফিসার হলেও আপত্তি করতে সাহস হল না শিশিরের। ফাঁসির আসামীর মতো মুখ করে খাওয়া শুরু করলেন তিনি।
সুধার মধ্যে ঝলমলে, সতেজ, ঝোড়ো একটা ব্যাপার আছে। সে যেখানে থাকে তার চারপাশ যেন স্নিগ্ধ আলোয় ভরে যায়। মানুষকে মাতিয়ে রাখার অদ্ভুত ক্ষমতা মেয়েটার।
হালকা হাসি এবং মজার মজার কথায় ভোজের আসরটাকে পলকে জমিয়ে তুলল সুধা। দ্বারিক দত্তও কম যান না। নাত-বউয়ের সঙ্গে তিনিও সমানে পাল্লা দিতে লাগলেন। সবই খাওয়া দাওয়ার গল্প। রাজদিয়ায় থাকতে যুবা বয়সে তিনি, হেমনাথ এবং লালমোহন অর্থাৎ ফাদার লারমোর বাজি ধরে কোথায় কোন কোন বিয়ে বাড়িতে কী কী খেয়েছেন তার লম্বা ফিরিস্তি পেশ করতে থাকেন। তবে নতমস্তকে স্বীকার করলেন, গদু চক্কোত্তির ধারে কাছে তারা কেউ নেই। সেই সঙ্গে ছোটখাটো কিছু হা-হুতাশ। আজকালকার ছেলেমেয়েরা খেতে পারে না। তাদের পেটের খোল ছোট। হাবিজাবি খেয়ে হজমশক্তি তাদের নষ্ট হয়ে গেছে। দ্বারিক দত্তর আরও আক্ষেপ, কলকাতায় ওপার বাংলার মতো ভাল মাছ মেলে না, তরতাজা আনাজ দুর্লভ। দুধ, ঘি, তেলসমস্ত কিছুতে ভেজাল। ইত্যাদি ইত্যাদি।
তারই মধ্যে খান মঞ্জিল মেরামতের ব্যাপারে কী ঠিক হয়েছে, তা নিয়েও কথা হল।
বিনয় চুপচাপ খেয়ে যাচ্ছিল। মধুসূদন ভট্টাচার্যের স্ত্রীর গলায় দড়ি দেবার কথা শোনার পর থেকে গাঢ় বিষাদে মনটা আচ্ছন্ন হয়ে ছিল তার। সুধাদের লঘু চালের নানা গল্প, মুহুর্মুহু হা হা, হি হি– সব মিলিয়ে ভারাক্রান্ত ভাব অনেকটা কেটে গেছে। হঠাৎ শিশিরের ডাক কানে এল, বিনু
বিনয় চমকে পাত থেকে মুখ তোলে। আর তখনই মনে পড়ে যায়, শিশির শুধু খান মঞ্জিল সারাইয়ের ব্যবস্থা করতেই আসেননি, তার সঙ্গেও নাকি ওঁর জরুরি কিছু কথা আছে। সে জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে থাকে।
শিশির বললেন, আমাদের বাড়ি যাবার জন্যে আনন্দকে দিয়ে খবর পাঠিয়েছিলাম। তোমাকে বলেনি?
বিনয় মাথাটা সামান্য কাত করে, বলেছে।
রোজ ভাবি আসবে। কিন্তু এলে না তো?
রামকেশবের জন্য যে যাওয়া যায় নি একথা শিশিরের মুখের ওপর বলা যায় না। সে চুপ করে থাকে।
শিশির একটু ভেবে বললেন, শুনলাম তুমি একটা নতুন খবরের কাগজে জয়েন করেছ।
বিনয় বলল, হ্যাঁ। আনন্দদাই কাজটা পাইয়ে দিয়েছেন।
দেখ বিনু, এই ধরনের চাকরির কোনও ফিউচার আছে বলে আমি মনে করি না।
এমন মতামত আগেও কেউ কেউ জানিয়েছে। বিনয় জবাব দিল না।
শিশির বলতে লাগলেন, হিরণের কাছে শুনেছি, তোমার জন্যে সে স্টেট গভর্নমেন্টের দু-একটা ডিপার্টমেন্টে চাকরির চেষ্টা করছে।
বয়স্ক কেউ যদি পাশে বসে অনবরত কথা বলে যায়, মুখ বুজে বসে থাকাটা অভদ্রতা। বিনয় বলল, হ্যাঁ।
শিশির বললেন, গভর্নমেন্ট সার্ভিসে সিকিউরিটি আছে ঠিকই, কিন্তু স্যালারি ভীষণ কম। প্রোমোশন পেতে অনেক বছর লেগে যায়।
বিনয় বলে, আমি এ-সব ঠিক জানি না।
একটু চিন্তা করে শিশির এবার বললেন, আনন্দও সেদিন বলছিল, তোমার জন্যে ওদের অফিসে বলে রেখেছে। ওটা নামকরা ফার্ম। ওখানে হলে তো ভালই হয়। কিন্তু কবে হবে তার ঠিক নেই।
এ-সব কথার উত্তর হয় না। বিনয় নিঃশব্দে খেতে থাকে।
শিশির থামেননি, তোমার সম্বন্ধে আমি অনেক ভেবেছি। খবরের কাগজে পড়ে থাকার মানে হয় না। জেসপ কোম্পানির নাম শুনেছ?
বিনয় মাথা নাড়ে, শোনেনি।
বিরাট ইঞ্জিনিয়ারিং ফার্ম। খাস সাহেবদের কোম্পানি। বড় বড় রোড-রোলার ছাড়া আরও অনেক কিছু বানায়। ওদের অফিসে আর ফ্যাক্টরিতে বহু লোক চাকরি করে। মাস দেড়েকের ভেতর ওখানে একটা ভ্যাকান্সি হবে। খুব ভাল লোস্ট। শুরুতেই মাইনে সাতা শ টাকার মতো। তা ছাড়া অন্য সব সুযোগ সুবিধা। নানারকম বেনিফিট। আমার এক বন্ধু এদের হেড অফিসে একটা ডিপার্টমেন্টের ম্যানেজার। ওই পোেস্টটার জন্যে তাকে তোমার কথা বলে রেখেছি। সে কথা দিয়েছে, চাকরিটা হয়ে যাবে। শিশির বলতে লাগলেন, তুমি দু-একদিনের ভেতর আমাদের বাড়িতে চলে এস। একটা অ্যাপ্লিকেশন করতে হবে। কী লিখবে, আমি বলে দেব।
শিশিরদের বাড়িতে যাবার কোনও প্রশ্নই নেই। পৃথিবী উলটে গেলেও সে ও-বাড়ির ছায়া মাড়াবে না। কিন্তু শিশির তার একটা ভাল চাকরির জন্য কেন এমন উতলা হয়ে উঠেছেন, যত ভাবছে ততই অবাক হয়ে যাচ্ছে সে। মাথামুণ্ডু কিছুই বোধগম্য হচ্ছে না। বলল, কিন্তু
কিন্তু কী?
সবে কাগজের চাকরিটা পেয়েছি। আমাকে বিরাট অ্যাসাইনমেন্টও দেওয়া হয়েছে। চট করে কাজটা ছেড়ে দেওয়া ঠিক হবে না। তাতে
হাত তুলে বিনয়কে থামিয়ে দিয়ে শিশির বলেন, দেখ, বড় সুযোগ বার বার আসে না। হাতের লক্ষ্মী পায়ে ঠেলতে নেই। দ্বারিক দত্তর দিকে মুখ ফিরিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কী বলেন দ্বারিক জেঠা? সুযোগটা নেওয়া উচিত নয়?
দ্বারিক দত্ত তক্ষুনি সায় দিলেন, উচিত তো বটেই। শুরুতে এত টাকা মাইনে, ভবিষ্যতে নিশ্চয়ই অনেক উন্নতি হবে।
বিপুল উৎসাহে শিশির বললেন, তা তো হবেই। বেসরকারি ফার্ম। একটু কাজ দেখাতে পারলে তরতর করে ওপরে উঠে যাবে। বলতে বলতে আবার বিনয়ের দিকে তাকান, হিরণ সুধা সুনীতি আনন্দ, সবার ইচ্ছে তুমি এই কাজটা নাও। আমি তো বটেই, আমাদের বাড়ির ওরা, মানে কুমার মা, ঝুমা প্রত্যেকে তাই চাইছে।
