আত্মহত্যার পেছনে নিদারুণ হেতুটা কী, জানিয়ে দিল বিনয়।
শোনার পর অনেকটা সময় নিঃশব্দে বসে থাকে হিরণ। তারপর জোরে শ্বাস ফেলে বলে, পার্টিশান ফ্যামিলিটাকে একেবারে শেষ করে দিল।
বিনয় উত্তর দেয় না।
.
৩৫.
সুধাদের রান্নাটান্না হয়ে গিয়েছিল। হিরণরা বাড়ি ফিরতেই দুই বোন তাড়া লাগায়, অনেক বেলা হয়ে গেছে। হাতমুখ ধুয়ে খেতে বসে যাও।
রান্নাঘরটা বেশ প্রশস্ত। এক পাশে রান্নার সরঞ্জাম। জোড়া উনুন, স্টোভ। এ ছাড়া জাল-লাগানো মিট সেফ। সারি সারি তাকে কাঁসার থালা, বাটি, গেলাস, কাসি, ঘটি এমনি সব বাসনকোসন। আর আছে নানা মাপের অগুনতি কৌটো, কাঁচের বয়ম। এত কিছু থাকা সত্ত্বেও ঘরের অর্ধেকটা ফাঁকা পড়ে থাকে। হিরণরা সেখানে বসেই খায়। বাড়ির লোকেদের ব্যাপারটা আলাদা। কিন্তু মান্য আত্মীয়-পরিজনেরা এলে তাদের তো আর রান্নাঘরে হাঁড়ি কড়া উনুন টুনুনের পাশে খেতে বসিয়ে দেওয়া যায় না। বিশেষ করে শিশির সেই কত কাল আগে এ-বাড়িতে এসেছিলেন। তারপর এই। তাকে খাতিরযত্ন না করলে চলে?
বাইরের ঘরের সোফা চেয়ার টেয়ার আগেই সরিয়ে রেখেছিল সুধা। সবার মুখটুখ ধোওয়া হয়ে গেলে সেখানে ফুলকাটা আসন বিছিয়ে হিরণ আনন্দ শিশির বিনয় এবং দ্বারিক দত্তকে খেতে বসিয়ে দেওয়া হল।
সুধা আর সুনীতি পরিপাটি করে থালায় মিহি চালের ভাত এবং থালাগুলোর চারপাশে বাটিতে বাটিতে তিন চার রকমের মাছ, মাংস, ডাল, নিরামিষ তরকারি, চাটনি ইত্যাদি সাজিয়ে দিয়েছে। উমা দরজার কাছে এক পায়ে খাড়া। সুধা ইশারা করলেই রান্নাঘর থেকে আরও মাছ, আরও ভাত, আরও মাংস নিয়ে আসবে।
উৎকৃষ্ট খাদ্যবস্তুগুলোর সুগন্ধে ঘরের বাতাস ম ম করছে। মুখোমুখি খেতে বসেছে হিরণরা। একদিকে দ্বারিক দত্ত আর শিশির। আর-এক দিকে হিরণ, আনন্দ এবং বিনয়।
বিপুল পরিমাণ সুখাদ্যের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকেন শিশির। তার চোখ যেন আতঙ্কে ঠিকরে বেরিয়ে আসবে। করুণ সুরে বলেন, কী ব্যাপার বল তো সুধা?
সুধা মোটামুটি কিছু একটা আঁচ করে নিয়ে জিজ্ঞেস করে, কীসের ব্যাপার?
আমাকে তুমি কি গদু চক্কোত্তির ভায়রাভাই ঠাউরে নিয়েছ?
বিনয় কোনাকুনি তার পাতের সামনে নীরবে বসে ছিল। অনেক দিন পর গদু চক্কোত্তির নামটা শুনল সে। মাঝখানে কটা বছর তার ওপর দিয়ে এত ঝড়ঝাঁপটা গেছে, যে গদুর কথা তার স্মৃতি থেকে একেবারেই মুছে গিয়েছিল। বহুকাল পর ফের তাকে মনে পড়ে গেল।
গদু ছিল বিক্রমপুরের সব চাইতে নামকরা খাইয়ে তোক। এমন ভোজনপটু মানুষ জীবনে দ্বিতীয়টি দেখেনি বিনয়। এমনিতে রোগা পাতলা মাঝারি ধাঁচের চেহারা ছিল তার। কিন্তু গদুর খাওয়ার বহর দেখলে চোখ কপালে উঠে যেত।
জীবনে খাওয়াই ছিল তার একমাত্র কাজ। রাজদিয়াকে ঘিরে যে চল্লিশ পঞ্চাশটা গ্রাম রয়েছে, শীত-গ্রীষ্ম বারোমাস সে-সব জায়গায় সে চষে বেড়াত। গরমের সময় তার পরনে থাকত খাটো ধুতি, শরীরের ওপর দিকটা খালি, কাঁধে চাপানো থাকত একখানা দলা-মোচড়া ফতুয়া। শীতকালে ফতুয়াটি পরে তার ওপর জড়িয়ে নিত পুরানো এন্ডির চাদর। বর্ষাকালে অবশ্য মাথার ওপর থাকত মান্ধাতার বাপের আমলের তালি-মারা ছাতা।
পূর্ব বাংলা ছিল এক স্বপ্নের পৃথিবী। সেখানে তখন অঢেল মাছ, অঢেল দুধ, মাঠের পর মাঠ জুড়ে সোনালি শস্য। লক্ষ্মীপুজো, দুর্গাপুজো, হাজারটা পার্বণ, মেয়ের বিয়ে, কুমারী মেয়েদের ব্রতসাঙ্গ, শ্রাদ্ধ–ছড়ানো ছিটানো চল্লিশ পঞ্চাশখানা গ্রামের কোনও না কোনও বাড়িতে অনুষ্ঠান লেগেই থাকত। নেমন্তন্নর দরকার হতো না গদুর। সব বাড়ির দরজাই তার কাছে ভোলা। গেরস্তরা তাকে দেখলে খুশিতে হইচই বাধিয়ে দিত। তক্ষুনি তার হাত-মুখ ধোওয়ার ব্যবস্থা করে খেতে বসানো হতো। কাঁচা ফলারের ব্যবস্থা থাকলে সের দুই চিড়ে, ডজন দুই মোহন বাঁশি কলা, সের খানেক পাতক্ষীর, গোটা পঞ্চাশেক ক্ষীরমোহন, আর পাকা ফলার হলে দিস্তা দিস্তা লুচি, বেগুনভাজা, ছোলার ডাল, ষাট সত্তর টুকরো পাকা রুই, চিতলের পেটি এবং সেই সঙ্গে এক গামলা রসগোল্লা আর এক থালা সন্দেশ উড়িয়ে দিত। এইভাবে সারা বিক্রমপুর জুড়ে দিগ্বিজয় করে বেড়াত সে।
রাজদিয়ায় থাকার সময় সুধাও গদুকে দেখেছে। সে বলল, গদু চক্কোত্তি এখন এ বাড়িতে থাকলে সবার জন্যে যা রান্না করেছি, একাই সে সাবাড় করে দিত। উঃ, কী খেতে যে পারত নোকটা! ওইরকম রোগাপটকা চেহারা, কোথায় যে এত খাবার ঢোকাত, কে জানে। বলে হি হি হাসতে লাগল। মনমেজাজ ভাল থাকলে কথায় কথায় তার মসি।
দ্বারিক দত্ত হেসে হেসে বললেন, গদুর চার-পাঁচটা এক্সট্রা পাকস্থলী ছিল।
শিশির সুধাকে বললেন, না না সুধা, এত আমি খেতেই পারব না। ভাত মাছ কপির ডালনা সব অর্ধেক অর্ধেক তুলে নাও। তখন ঠেসে ঠেসে অত লুচি তরকারি খাওয়ালে। এখনও সেগুলো হজম হয়নি। পেটে গিজ গিজ করছে।
সুধা নাছোড়বান্দা। জোরে জোরে মাথা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বলল, কিচ্ছু তুলব না। যা দিয়েছি লক্ষ্মী ছেলের মতো খেয়ে নিন।
শিশির বললেন, আমার কত বয়েস হয়েছে জানো? পঞ্চাশ পেরিয়ে গেছি। এই বয়েসে এত খাওয়া যায়?
দ্বারিক দত্ত পাশ থেকে বললেন, না না করিস না শিশির। তোর পঞ্চাশ আর আমি সত্তর পেরিয়েছি। তুই আমার কাছে ছেলেমানুষ। সুধা-সুনীতি যা দিয়েছে সমস্ত তো খাবই, আরও দুচারখানা মাছও নেব। হাত গুটিয়ে বসে থাকিস না। গদু চক্কোত্তির মতো না হলেও এখনও যথেষ্ট পরিমাণে তিনি খান। পরিপাক যন্ত্রটি যে-কোনও যুবকের মতোই তাঁর পুরোমাত্রায় সক্রিয়। পেট ভুটভাট, অগ্নিমান্দ্য–এ-সব তার ত্রিসীমানায় ঘেঁষতে পারেনি।
