ছাদ থেকে সিঁড়ি দিয়ে সবাই নামতে শুরু করেছিল। দোতলায় এসে আচমকা কী ভেবে হিরণ বিনয়কে বলল, একটু দাঁড়াও। তোমাকে একটা জিনিস দেখাব। অন্যদের বলল, আপনারা নিচে চলে যান। আমরা এক্ষুনি আসছি।
আনন্দ, শিশির আর বংশী নামতে লাগল। হিরণ বাঁ পাশের রেলিং-লাগানো চওড়া বারান্দা দিয়ে বিনয়কে সঙ্গে করে এগিয়ে গেল।
খান মঞ্জিল-এ আগেও দুবার এসেছে বিনয়। এ-বাড়ির প্রতিটি ঘর, প্রতিটি বারান্দা, প্রতিটি সিঁড়ির ধাপ তার চেনা। তবু কী দেখাতে চায় হিরণ? বিস্ময় বাড়ছিল বিনয়ের। সে জিজ্ঞেস করে, কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন?
হিরণ বলল, আরে চলই না। নিজের চোখে সব দেখতে পাবে।
বিনয় আর কোনও প্রশ্ন করে না। একটু পরে কোণের দিকের একটা ঘরে চলে আসে তারা। চৌকো ধরনের প্রশস্ত ঘর। কম করে পঁচিশ ফিট বাই কুড়ি ফিট। দুধারের দেওয়ালে দুজোড়া করে বড় বড় জানালা। গরাদের বাইরে খড়খড়ি, ভেতরে রঙিন কাঁচের পান্না। জানালাগুলো বন্ধ ছিল। ক্ষিপ্র হাতে খুলে দিল হিরণ। লহমায় সারা ঘর রোদে ভরে গেল।
সোজাসুজি যে জোড়া জানালাটা রয়েছে হিরণ বিনয়কে সেখানে নিয়ে এল। সামনের দিকে মেন রাস্তা। বেশ লোজন দেখা যাচ্ছে। ঢিমে চালে কটা সাইকেল রিকশা চলেছে। একটা ঘোড়ার গাড়ি খট খট আওয়াজে শীতের অলস দুপুরটাকে ঝাঁকুনি দিতে দিতে দূরে ট্রাম রাস্তার দিকে ছুটে গেল।
বাড়ির সামনের অংশ আর বাঁ পাশটা দেখাতে দেখাতে হিরণ বুঝিয়ে দিল কোন দিকটা পুব আর কোনটা দক্ষিণ। বলল, ইস্ট আর সাউথ খোলা থাকায় এই ঘরে কোনওদিন আলো-হাওয়ার অভাব হবে না। তোমার ছোটদির ইচ্ছে, এই ঘরটায় তুমি থাকবে। তেতলায় ঠিক ওপরের ঘরটা আমার আর সুধার। এ-বাড়িতে এই ঘর দুটোই বেস্ট।
এখানে টেনে আনার উদ্দেশ্যটা এতক্ষণে পরিষ্কার হয়ে যায়। কী ভেবেছে হিরণরা, বাকি জীবন বিনয় তাদের কাছে কাটিয়ে দেবে? বোঝাই যাচ্ছে, সুধারা তাকে সহস্র পাকে জড়িয়ে রাখার পরিকল্পনা করেছে। কিন্তু বিনয়ের মধ্যে একটি স্বাধীন মানুষ রয়েছে, যার আত্মসম্মানবোধ প্রখর। সে ঠিকই করে রেখেছে, অফিসে প্রথম মাসের মাইনেটা পেলেই সুধাদের বাড়ি থেকে চলে যাবে। বোনের শ্বশুরবাড়িতে চিরকাল পড়ে থাকার আদৌ তার কোনও ইচ্ছা নেই। এ-সব বলতে গিয়েও থেমে গেল।
হিরণ বলল, যদি মনে হয়, এই ঘরের দেওয়াল কেটে কটা তাক বসাবে, বংশীকে বলে দিও
যে-ঘরে কোনও কালেই সে বাস করবে না তার দেওয়ালে তাক বসানোর বিন্দুমাত্র প্রয়োজনই সে বোধ করে না। কিন্তু এই মুহূর্তে তা জানালে হিরণ তুমুল হইচই বাধিয়ে দেবে। বিনয় শুধু বলল, পরে দেখা যাবে।
আচ্ছা
হিরণ চটপট জানালাগুলো বন্ধ করে বলল, চল–
শিশিররা আগেই নেমে এসে বিনয়দের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। হিরণ সদর দরজায় তালা লাগিয়ে সবাইকে নিয়ে রাস্তায় এসে দুটো রিকশা ডেকে উঠে পড়ল। বংশী ট্রাম রাস্তার দিকে হাঁটতে। লাগল।
খান মঞ্জিল-এ আসার সময় বিনয় আর আনন্দ এক রিকশায় উঠেছিল। অন্যটায় শিশির আর হিরণ। ফেরার সময় সঙ্গী বদল হয়েছে। এখন বিনয়ের পাশে হিরণ।
অলিগলি দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল দুই রিকশা। সূর্য এখন সোজাসুজি মাথার ওপর। দুপুরের তপ্ত রোদ উষ্ণতা ছড়িয়ে দিচ্ছে হাওয়ায়। বেশ আরাম লাগছিল বিনয়ের। অন্যমনস্কর মতো রাস্তার ধারের বাড়িঘর ডোবা গাছগাছালি দেখছিল সে। তবে নির্দিষ্টভাবে কিছু ভাবছিল না। টুকরো টুকরো নানা চিন্তা তার মাথায় আনাগোনা করছে। সবই এলোমেলো। অসংলগ্ন। একটার সঙ্গে অন্যটার সম্পর্ক নেই। খান মঞ্জিল,মধুসূদনদের বাড়ির শোচনীয় ঘটনা, ইত্যাদি ইত্যাদি। অবশ্য সমস্ত ছাপিয়ে অফিসের অ্যাসাইনমেন্টটা ঘুরে ফিরে মনে পড়ছে। আজ থেকে কলকাতার আশেপাশের রিফিউজি ক্যাম্প আর কলোনিগুলোতে তার যাবার কথা ছিল। কিন্তু হঠাৎ জ্বর বাধিয়ে বসায় যাওয়া হয়নি। তবে একটাই আশার কথা, সুধার ওষুধে বেশ কাজ হয়েছে। জ্বরটা কিছুক্ষণ আগে ছেড়ে গিয়েছিল। শরীর এখন অনেক চনমনে লাগছে। কাল কাছাকাছি কোনও একটা ক্যাম্প বা কলোনিতে তাকে যেতেই হবে।
খানিকক্ষণ চুপচাপ চলার পর হঠাৎ হিরণ ডাকল, বিনু
বিনয় মুখ ফিরিয়ে তাকায়, কিছু বলবেন?
মধুসূদনবাবুদের বাড়িতে এত দেরি হল কেন তোমার? কোনও খবর আছে?
বিনয় রীতিমতো অবাকই হল। এ-পাড়ায় মধুসূদনরা ছাড়া তার চেনাজানা অন্য কেউ যে নেই আর সেখানেই যে সে গিয়েছিল, হিরণ তা ঠিকই আঁচ করে নিয়েছে। কিন্তু এই মুহূর্তে মধুসূদনদের কথা হিরণ জানতে চাইবে, ভাবা যায়নি। বিনয়ের মনে হয়েছিল, খান মঞ্জিল-এর ব্যাপারে হিরণের আরও ব্যাপক কোনও পরিকল্পনা আছে। এক্সচেঞ্জ করে পাওয়া এই বাড়িটা তার স্বপ্নের বাড়ি। ভেবেছিল, এটা নিয়েই সে কিছু বলবে কিন্তু একেবারে অন্য প্রসঙ্গে চলে গেছে।
বিনয় বলল, হ্যাঁ, খুব খারাপ খবর।
মধুসূদনের দেশ ছেড়ে চলে আসার কারণ সেদিনই জেনে এসেছিল হিরণ। স্ত্রীকে নিয়ে মানুষটা যে মারাত্মক সংকটে রয়েছেন সেটাও নিজের চোখে দেখেছে। চকিতে কিছু ভেবে নিয়ে জিজ্ঞেস করে, ওঁর স্ত্রীকে নিয়ে কি কোনও প্রবলেম হয়েছে?
হ্যাঁ। ভদ্রমহিলা পরশু গলায় দড়ি দিয়েছিলেন। হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এখনও জ্ঞান। ফেরেনি।
