দীপালিকে জোর করে শোভানরা ধরে নিয়ে নদীর চরে আটকে রেখেছিল। সে ধর্ষিত। তার চরম সর্বনাশ ঘটে গেছে। এজন্য মধুসূদনের কষ্টের অবধি ছিল না। মেয়ের চূড়ান্ত লাঞ্ছনা, চিরকালের মতো তাকে হারানোর শোক সহ্য করতে পারেননি কমলা। তিনি প্রায় উন্মাদ হয়ে গিয়েছিলেন।
সংসারের ভিত ধসে পড়েছে। তবু তারই মধ্যে ইন্ডিয়ায় এসে মধুসূদন খানিকটা সামলে উঠে নতুন করে বাঁচার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু পরশু নবদ্বীপ সাহার মুখে দীপালির খবরটা শোনার পর ফের সমস্ত কিছু তছনছ হয়ে গেছে।
তাদের ব্রাহ্মণ পরিবারের মেয়ে মুসলমানকে বিয়ে করেছে। এমন মহাপাতক সৌরলোকে আর কখনও বুঝি হয়নি। বিশুদ্ধ ভট্টাচার্য বংশের মর্যাদা, গৌরব, পবিত্রতা–সব কিছু ধূলিসাৎ। এর চেয়ে বড় শোক, বড় আঘাত, বড় মনস্তাপের ঘটনা তাদের বংশের ইতিহাসে আর কখনও ঘটেনি।
মধুসূদনের বিলাপ চলতেই থাকে। হঠাৎ বিনয়ের মনে পড়ল, অনেকক্ষণ এ-বাড়িতে এসেছে সে। ওদিকে নিশ্চয়ই বংশী সিংকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে খান মঞ্জিল দেখানো শেষ করে হিরণরা তার জন্য অপেক্ষা করছে।
বিনয় বিষাদ-মাখানো সুরে বলল, আমাকে এবার উঠতে হবে। জরুরি একটা কাজ আছে। আজ। যাই– হিরণরা যে খান মঞ্জিল-এ এসেছে, সেটা আর জানালো না।
আস্তে মাথা হেলিয়ে দেন মধুসূদন, আচ্ছা—
পরে এসে মন্টুর মায়ের খবর নিয়ে যাব।
মধুসূদন উত্তর দিলেন না। উঠে দাঁড়ালেনও না। যেমন বসে ছিলেন তেমনি বসে রইলেন। মুহ্যমান। শোকে, গ্লানিতে জর্জরিত।
.
৩৪.
বাড়ির বাইরে এসে আচ্ছন্নের মতো হাঁটছিল বিনয়। পরশু গলায় ফাঁস লাগাবার পর এখনও জ্ঞান ফেরেনি কমলার। ফিরবে কি না, ডাক্তার তেমন কোনও ভরসা দেননি। শেষ পর্যন্ত যদি বেঁচেও যান, ফের যে আত্মহত্যার চেষ্টা করবেন না, কে বলতে পারে? মেয়ের জন্য পিতৃকুল এবং শশুরকুলের যাবতীয় সুকৃতি আর পুণ্য ধ্বংস হয়ে গেছে, এটা কি তিনি কোনও দিন ভুলতে পারবেন? মধুসূদনের কথা যত ভাবে, প্রবল পাষাণভার যেন বিনয়ের মাথায় চেপে বসতে থাকে।
খান মঞ্জিল-এ এসে একতলা দোতলা বা তেতলায় কোথাও হিরণদের দেখা পাওয়া গেল না। তবে ছাদ থেকে ওদের গলা ভেসে আসছিল। বিনয় সোজা সেখানে চলে এল।
হিরণরা বংশী সিংকে ভাঙা কার্নিস আর ছাদের ফাটল-ধরা, ছালচামড়া-ওঠা জায়গাগুলো দেখাচ্ছে। বহুকাল মেরামত না করায় কোথাও কোথাও বট-অশ্বখের চারা গজিয়েছে।
শিশির বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন, সারা বাড়িটা দেখেছ। ছাদের হালও দেখলে। গাছগুলো শেকড়সুদ্ধ উপড়ে ফেলে সারাই করবে।
বংশীর হাতে একটা মাঝারি নোটবই আর পেন্সিল রয়েছে। কী সব লিখতে লিখতে সে বলল, ও তো করতেই হবে।
রেন-ওয়াটার পাইপগুলো ঝাঁঝরা হয়ে গেছে। সেগুলো পালটাতে হবে।
হ্যাঁ।
হঠাৎ হিরণের যেন মনে পড়ে গেছে, এমনভাবে বলল, একতলার রান্নাঘরটা ভেঙে নতুন করে করতে হবে কিন্তু
বংশী ঘাড় কাত করে, ঠিক হ্যায়।
ছাদে একটা বড় ঠাকুর-ঘর হবে।
হয়ে যাবে।
এবার শিশির বললেন, কী কী করতে হবে, মোটামুটি জেনে নিলে। কত ইট সিমেন্ট বালি টালি লাগবে, তোমাদের মজুরি কীরকম পড়বে, তার একটা এস্টিমেট করে দিও।
বংশী ঝড়ের গতিতে লিখে যাচ্ছিল। বলল, ঠিক হ্যায় বড়ে সাব
তা হলে এখন ফেরা যাক।
বিনয় ছাদে ওঠার পর সবার পেছনে দাঁড়িয়ে ছিল। বাড়ি মেরামতের খুঁটিনাটি নিয়ে হিরণরা এমনই মগ্ন ছিল যে তার আসাটা কেউ লক্ষ করেনি। ছাদ থেকে নামার জন্য ঘুরে সিঁড়ির দিকে পা বাড়াতে যাবে, তখনই ওরা বিনয়কে দেখতে পেল।
আনন্দ বলল, কী আশ্চর্য, বলে গেলে তাড়াতাড়ি ফিরে আসবে। এই তোমার তাড়াতাড়ি! হাতের ঘড়িটা দেখে বলতে লাগল, পাক্কা একটি ঘন্টা পার করে এলে।
বিনয় বিব্রত বোধ করে, যেখানে গিয়েছিলাম, কথায় কথায় দেরি হয় গেল।
শিশির বললেন, তোমার জন্যে ওয়েট করে করে শেষ পর্যন্ত আমরা তিনজনে বংশীকে বাড়িটা দেখিয়ে কী করতে হবে, বুঝিয়ে দিলাম। তুমি হয়তো সবটা শোননি। পরে শুনে নিও। তখন যদি মনে হয়, আরও কিছু অ্যাডিশান বা চেঞ্জটেঞ্জ করতে হবে, বোলো। বংশী করে দেবে।
হিরণের হঠাৎ খেয়াল হল, তাড়াহুড়ো করা ঠিক হবে না। এত বড় একটা মেরামতি, তার সঙ্গে দুএকটা নতুন ঘর বানানো, সব মিলিয়ে প্রচুর খরচের ব্যাপার। যা করার একবারেই করতে হবে। পছন্দ হল না বলে ভেঙে নতুন করে কর, এত টাকা কোথায় পাবে সে? বলল, এক কাজ করা যাক, নেক্সট ছুটির দিনে বংশী সিংকে আমাদের বাসায় ডেকে বিনু আর আমি ওর সঙ্গে বসব। দাদু আর সুধাও থাকবে। যা যা করার কথা এখন ওকে বলা হল, তার সঙ্গে আরও যদি কিছু করতে হয়, বাড়ির সবাই মিলে ভেবে চিন্তে সেদিন জানিয়ে দেব।
শিশিরও সায় দিলেন, সেটাই ভাল। দ্বারিক জেঠু আর সুধা তো আজ আসতেই পারল না। বিনুও কোথায় গিয়ে আটকে রইল। সকলে একসঙ্গে থাকলে আজই সব ঠিক হয়ে যেত। বংশীকে বললেন, এর মধ্যে তাহলে আর এস্টিমেটটা কোরো না। হিরণদের সঙ্গে বসে ভাল করে সমস্তটা বুঝে নিও। কাজে হাত দিতে না হয় কদিন দেরি হবে।
বংশী বলল, ঠিক হ্যায় বড়েসাব।
এদিকে ভীষণ অবাক হয়ে গেছে বিনয়। দেশের বিষয় আশয়ের সঙ্গে এক্সচেঞ্জ করে হিরণরা খান মঞ্জিল-এর মতো বিরাট একখানা বাড়ি পেয়েছে। এ-বাড়ির পুরোটার মালিক ওরাই। বিনয়ের তাতে ছিটেফোঁটা অংশও নেই। তবু মেরামতের সময় কতটা অদলবদল করা হবে, নতুন কখানা ঘর তোলা দরকার, এ নিয়ে শিশির এবং হিরণ কেন যে তার মতামতকে গুরুত্ব দিচ্ছে, কিছুতেই তা মাথায় ঢুকছে না বিনয়ের। সে শুধু ওদের কথা শুনেই গেল, কোনও উত্তর দিল না।
