রফিকুলের মা-বাবা কেউ বেঁচে নেই। একমাত্র আপা অর্থাৎ দিদি থাকেন ঢাকায়। ভগ্নীপতি একটা বিদেশি কোম্পানিতে বিরাট অফিসার। নিরুপায় রফিকুল দীপালিকে তার দিদির বাড়িতে নিয়ে তুলেছিলেন। রফিকুলের দিদির নাম আফরোজা। ভগ্নীপতি হলেন হাফিজুর রহমান। তারা অসীম মমতায় দীপালিকে কাছে টেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু কোনও সম্পর্ক নেই, ধর্ম আলাদা, এমন এক অনাত্মীয় তরুণী তো অনন্ত কাল কারও বাড়িতে থাকতে পারে না। ভদ্র, শিক্ষিত পরিবারের মেয়ে। তাকে দাসী বাঁদি করে রাখা যায় না। সে আবার নিজের মা-বাবার কাছে ফিরে যেতে রাজি নয়। দীপালিকে নিয়ে বড় ধরনের সংকট না হলেও ক্রমশ আফরোজা আর হাফিজুরের দুশ্চিন্তা শুরু হয়েছিল। একটি লাঞ্ছিত ব্রাহ্মণ তরুণী কী পরিচয়ে তাদের কাছে থাকবে, তার ভবিষ্যৎই বা কী, ভেবে ভেবে তারা কূল-কিনারা পাচ্ছিলেন না। মেয়েটাকে নিয়ে কী করতে চান, আত্মীয়পরিজন বন্ধুবান্ধবের কাছ থেকে এমন প্রশ্ন শুনতে হচ্ছিল অনবরত। এদিকে রফিকুল তো বোন-ভগ্নীপতির হাতে দীপালিকে সঁপে দিয়ে কুমিল্লার সেই শহরে ফিরে গিয়েছিলেন। কিন্তু মেয়েটাকে মুহূর্তের জন্যও ভুলতে পারেননি। ফি শনিবার তিনি দিদির বাড়িতে তার খোঁজখবর নিতে আসতেন। প্রথম দিকে ছিল শুধুই করুণা। শুধুই সহানুভূতি। তারপর কবে অসহায় মেয়েটিকে ভালবেসে ফেলেছিলেন, নিজেও টের পাননি। ধর্ষণের গ্লানি নিয়ে এই পৃথিবীতে দীপালি বাকি জীবন কাটিয়ে দিক, এটা ভাবতেও তার ভীষণ কষ্ট হতো। একদিন সরাসরি বলেছিলেন, দীপালি ব্রাহ্মণ কন্যা আর তিনি মুসলমান। যদি সংস্কার কাটিয়ে সে তাকে বিয়ে করতে চায়, রফিকুলের কাছে সেটা হবে বিরাট একটা পাওয়া। আসলে দীপালি সম্মানজনকভাবে মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকুক, সেটাই ছিল একান্তভাবে রফিকুলের কাম্য।
প্রথমটা হকচকিয়ে গিয়েছিল দীপালি। রফিকুল তার কাছে পরমাশ্চর্য এক দেবদূত। তার ত্রাণকর্তা। চর থেকে উদ্ধার করে না নিয়ে এলে অন্ধকার এক নরকে তাকে পচে গলে মরে যেতে হতো। তবু নিজের মধ্যে কোথাও একটা বাধা ছিল। যার রক্তে আবহমান কালের বিশুদ্ধ ব্রাহ্মণের রক্ত বয়ে চলেছে তার পক্ষে একটি মুসলমানকে বিয়ে করায় মন সায় দেয়নি। পরক্ষণেই দীপালি ভেবেছে, সে তো একেবারে খাদের প্রান্তে গিয়ে ঠেকেছে। বাবা-মা তাকে বাড়িতে ঢুকতে দেবে না। পৃথিবীর একদিকের সব দরজা চিরকালের মতো তার কাছে বন্ধ হয়ে গেছে। একটা পথই তখন তার সামনে খোলা। রফিকুলের সঙ্গে বিয়ে। তবু আরও একটা দ্বিধা ভেতর থেকে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল। তার দেহ নিপাপ নেই। সারা শরীরে জগতের সবটুকু কালি আর দুর্গন্ধ মাখানো রয়েছে।
দুহাতে মুখ ঢেকে দীপালি বলেছিল, আমি একেবারে নষ্ট হয়ে গেছি। এই অবস্থায়
রফিকুল সদয় সুরে বলেছিলেন, ওটা এক দুর্ঘটনা। ভুলে যেতে চেষ্টা কর।
এরপর বিয়েটা হয়ে গিয়েছিল। রফিকুলের দিদি এবং ভগ্নীপতি পরম উদারতায় দীপালিকে গ্রহণ করেছিলেন।
বিয়ের পর কুমিল্লার সেই শহরে দীপালিকে নিয়ে যাননি রফিকুল। তখনও সেখানে অনেক হিন্দু ছিল। তারা দেশ ছেড়ে ইন্ডিয়ায় চলে যায়নি। সকলেই দীপালির চেনাজানা। ওদের সঙ্গে দেখা হলে সে স্বস্তি বোধ করত না।
কিন্তু রফিকুল স্ত্রীকে ছেড়ে কুমিল্লায় থাকতে চাইছিলেন না। ঢাকায় অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের উঁচু মহলে ধরাধরি করে ময়মনসিংয়ে বদলি হয়ে গিয়েছিলেন। ……..
নবদ্বীপ সাহার মুখে যা শুনেছিলেন, সবিস্তার সব জানিয়ে নতমুখে বসে রইলেন মধুসূদন। মাথাটা। ভেঙে বুকের ওপর ঝুলে পড়ল। তারই মধ্যে গোঙানির মতো আওয়াজ করে বলতে লাগলেন, খবরটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে আমার স্ত্রী কমলা অজ্ঞান হয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর জ্ঞান ফেরে, তক্ষুনি আবার মূৰ্ছ। যেটুকু সময় হুশ থাকে শুধু কান্না আর কান্না। আমাদের সংসারে যেন বজ্রপাত ঘটে গেল। পরশু থেকে কীভাবে সময় কাটছে, আমরাই শুধু জানি। কাল রাত্তিরে কখন যে বিছানা থেকে উঠে গিয়ে কমলা বাথরুমে গলায় শাড়ির ফাঁস লাগিয়েছিল, আমি টের পাইনি। মন্টু কিছু একটা শব্দ শুনে দৌড়ে গিয়ে ওর মাকে সিলিংয়ের বরগা থেকে ঝুলতে দেখে চিৎকার করে ওঠে। আমিও ছুটে যাই। ধরাধরি করে ওর মাকে নামাই। পাড়ার লোকজনকে ডেকে লেকের ধারের হাসপাতালে নিয়ে যাই।
মধুসূদনের স্ত্রী এখনও যে বেঁচে আছেন সেটা মন্টুকে দেখে বোঝা যাচ্ছে। মারা গেলে ওর পরনে থাকত গুরুদশার সাজ। নতুন কোরা ধুতি-চাদর। গলায় ঝুলত লোহার কাঠি। জোরে শ্বাস টেনে বিনয় ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করে, উনি এখন কেমন আছেন?
মধুসূদন গভীর হতাশায় জোরে জোরে মাথা নাড়েন, জ্ঞান ফেরেনি। যেভাবে গলায় ফাঁস আটকেছিল তাতে ডাক্তার খুব একটা ভরসা দিচ্ছেন না। তারপর মুখ তুলে কপালে আঙুল ঠেকিয়ে বলেন, সবই অদৃষ্ট।
বিনয় কী বলবে, ভেবে পেল না।
মধুসূদন এবার বলেন, মেয়েটা নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিল, তার কোনও খোঁজ পাচ্ছিলাম না– ধীরে ধীরে তা একরকম সয়ে যেত। ভাবতাম মরে গেছে। কিন্তু নবদ্বীপ এসে সমস্ত ওলটপালট করে দিল। একটু থেমে ফের শুরু করলেন, আমরা নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ। মেয়েটা যা করেছে, আমাদের চোদ্দ পুরুষের সব পুণ্য নষ্ট হয়ে গেল। মরার পর নরকেও আমাদের জায়গা হবে না। যন্ত্রণায়, পাপবোধে, কষ্টে তার কণ্ঠস্বর বুজে আসে।
