বিনয়ের মনে পড়ে গেল, সেদিন এখানে আসার কিছুক্ষণ পর মধুসূদনের স্ত্রীর বুকফাটা বিলাপ কানে এসেছিল। লহমায় তার স্নায়ুমণ্ডলী সজাগ হয়ে যায়। কিন্তু না, বাড়ির ভেতর দিকে অপার নৈঃশব্দ্য।
মধুসূদন বললেন, বোসো- বিনয় বসার পর তিনিও বসে পড়লেন। তারপর দুহাতে মুখ ঢেকে মুহ্যমানের মতো বসেই থাকেন।
তার দিকে তাকিয়ে থাকে বিনয়।
একসময় মধুসূদন ভাঙাচোরা গলায় জড়িয়ে জড়িয়ে বলে ওঠেন, পরশু রাতে আমার স্ত্রী গলায় দড়ি দিয়েছিল।
হৃৎপিন্ডে শানানো একটা ফলা আমূল ঢুকে যায় বিনয়ের। গলা চিরে তীব্র, কাতর চিৎকার বেরিয়ে এল তার, কেন?
ভেঙেপড়া, বিধ্বস্ত মধুসূদন ধীরে ধীরে মুখ থেকে হাত সরিয়ে বলতে লাগলেন, তুমি তো আমাদের ফ্যামিলির সব কথাই শুনেছ। প্রাণ নিয়ে আমরা তিনজন ইন্ডিয়ায় পালিয়ে আসতে পেরেছিলাম ঠিকই কিন্তু আমার মেয়ে দীপালিকে আনতে পারিনি।
এ-সব নতুন কিছু নয়। আগের দিনই শুনে গিয়েছিল বিনয়। তবু মধুসূদন যখন আবার বলছেন, বলুন। সে চুপ করে থাকে।
মধুসূদন থামেননি, তোমাকে সেদিনই বলেছি, আমরা মনে-প্রাণে চেয়েছি, দীপালির মরণ হোক। যে হারিয়ে গেছে, চিরকালের মতো হারিয়ে যাক। কিন্তু পরশু দিন যে-খবর পেলাম তাতে মনে হল, মাথার ওপর আকাশ ভেঙে পড়েছে। বুক ফেটে যাচ্ছিল। সে যে কী নরক যন্ত্রণা, বলে বোঝাতে পারব না।
কী খবর এসেছে, এখনও জানাননি মধুসূদন ভট্টাচার্য। তবে সেটা যে নিদারুণ কিছু, আঁচ করা যাচ্ছিল। শোনার জন্য রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করতে থাকে বিনয়।
মধুসূদন বলতে লাগলেন, পরশু দুপুরে আমাদের কুমিল্লারই একটা লোক, তার নাম নবদ্বীপ সাহা, এক মোক্তারের মুহুরি ছিল সে হঠাৎ এসে হাজির। আমরা দেশ ছেড়ে চলে আসার অনেক পরে ওরা ইন্ডিয়ায় এসেছে। আমরা তবু বাড়ি এক্সচেঞ্জ করতে পেরেছি, হুন্ডি করে কিছু টাকাও এনেছি। নবদ্বীপ একটা সিকি পয়সাও আনতে পারেনি। বউ ছেলে মেয়ে নিয়ে এক কাপড়ে চলে আসতে হয়েছিল। এপারে পৌঁছবার পর ওদের তোলা হয়েছে নিউ আলিপুরের এক রিফিউজি। ক্যাম্পে। কীভাবে আমাদের ঠিকানা জোগাড় করেছে, জিজ্ঞেস করিনি। খবরটা তার কাছেই পাওয়া গেল। কী বলল জানো?
কী?
নবদ্বীপের মুখে যা শুনেছিলেন তাই বলতে লাগলেন মধুসূদন। কুমিল্লায় সেই ভয়ঙ্কর রাতে শোভান এবং তার দলবল তাদের বাড়ি হানা দিয়েছিল এবং দীপালির মুখ বেঁধে জোর করে তুলে নিয়ে যায়। ওরা তাকে দশ মাইল দূরে এক নদীর চরে আটকে রাখে।
এদিকে ইন্ডিয়া এবং পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে, সীমান্তের দুধারেই রেসকিউ কমিটি গড়া হয়েছিল। তাদের কাজ হল পুলিশের সাহায্য নিয়ে নিখোঁজ মেয়েদের খুঁজে বার করে রেড ক্রসের হাতে তুলে দেওয়া। রেড ক্রস চেষ্টা করবে এই লাঞ্ছিত মেয়েদের মা-বাবা বা অন্য অভিভাবকদের কাছে পৌঁছে দিতে।
শুনতে শুনতে লাহোরের নীলমের কথা মনে পড়ে যায় বিনয়ের। সে নীরবে বসে থাকে।
মধুসূদন বলতে লাগলেন, ভারত-পাকিস্তানের অন্য সব জায়গার মতো কুমিল্লায় তাদের সেই শহরেও রেসকিউর কাজ শুরু হয়েছিল। তার দায়িত্বে ছিলেন এস ডি ও রফিকুল ইসলাম। লুটপাট, খুন জখম, হিন্দুদের হুমকি দিয়ে দেশ থেকে তাড়ানোর ঘটনাগুলো তিনি মেনে নিতে পারছিলেন না। বিশেষ করে নারীহরণ, ধর্ষণ–এ-সব তাকে ভীষণ কষ্ট দিচ্ছিল। ওই শহরের যে মেয়েরা লুট হয়ে গেছে তাদের কীভাবে উদ্ধার করা যায়, এটাই ছিল তার সর্বক্ষণের চিন্তা। চান নেই, খাওয়া নেই, সশস্ত্র ফোর্স নিয়ে সারা শহরের প্রতিটি বাড়িতে তো বটেই, কাছাকাছি নদীতেও হানা দিয়ে সন্দেহজনক নৌকো দেখলেই তল্লাশি চালিয়েছেন। অনেক ধর্ষিত মেয়েকে উদ্ধারও করেছেন। কিন্তু দীপালিকে কোথাও পাওয়া যাচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত নদীর চরে তার সন্ধান মিলল। সেখান থেকে তাকে নিয়ে এসে রফিকুল নিজে সঙ্গে করে ঢাকায় গিয়েছিলেন। ইচ্ছা, রেড ক্রসের দপ্তরে পৌঁছে দেওয়া। তারা দীপালিকে কলকাতায় পাঠিয়ে দেবে।
মধুসূদন বললেন, রেড ক্রসের অফিসে গিয়ে বেঁকে বসল দীপালি। সে কলকাতায় আমাদের কাছে ফিরতে রাজি নয়।
বিনয় চমকে ওঠে, কেন?
বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের যাবতীয় বিষাদ মধুসূদনের মুখে ঘন হতে থাকে। বিনয়ের প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে বললেন, আসবে না শুনে প্রথমটা আমার বুক ভেঙে গিয়েছিল। পরে ভেবে দেখলাম ঠিকই করেছে। যে-মেয়েকে দিনের পর দিন চরে আটকে রাখা হয়েছিল, যার চরম সর্বনাশ ঘটে গেছে, সে ফিরে এলে আমাদের কী হাল হতো চিন্তা করতে পারবে না। আত্মীয়স্বজন থেকে শুরু করে চেনাজানা কেউ ঘেন্নায় আমাদের ছায়া মাড়াত না, হঠাৎ দেখা হলে গায়ে থুতু দিত।
অবিকল আর-এক ঝিনুক। বিনয়ের বুকের ভেতরটা অসহ্য ক্লেশে উথালপাতাল হয়ে যেতে থাকে। ঝিনুকের পরিণতি কী হয়েছে, জানা নেই। বেঁচে আছে, না মরে ঝরে গেছে, কে বলবে।
কিছুক্ষণ নিঝুম বসে রইলেন মধুসূদন। তারপর ফের শুরু করেন। শুধু ইন্ডিয়ায় মা-বাবার কাছেই না, ধর্ষিত মেয়েদের জন্য যে উদ্ধারাশ্রম খোলা হয়েছিল সেখানেও দীপালিকে পাঠানো গেল না।
একটি হিন্দু মেয়ের জন্য যথেষ্ট করেছেন রফিকুল ইসলাম। প্রচণ্ড ঝুঁকি নিয়ে জবরদস্ত মুসলিম লিগের নেতার ছেলের মুঠো থেকে তাকে উদ্ধার করে এনেছেন। যে-দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল সেটা নিখুঁতভাবে পালন করা হয়েছে। দীপালির ব্যাপারে পুরোপুরি হাত ধুয়ে ফেলতে পারতেন রফিকুল, কিন্তু উভ্রান্ত, আতঙ্কগ্রস্ত মেয়েটিকে রাস্তায় ফেলে রেখে চলে যেতে পারেননি।
