শিশির মাথাটা সামান্য হেলিয়ে বললেন, ও, তুমি এসে গেছ।
লোকটা বেশ বিনয়ী। বলল, হাঁ সাব। আপনি হুকুম করেছেন। আসব না?
কতক্ষণ দাঁড়িয়ে আছ?
জ্যাদা টেইম নেহী। হোগা পন্দ্র বিশ মিনট।
কথাবার্তার ধরনে বোঝা গেল, এই লোকটাই রাজমিস্তিরিদের হেড বংশী সিং। সে ছাড়া আর কে-ই বা হতে পারে? এইসময় তারই তো খান মঞ্জিল-এর সামনে অপেক্ষা করার কথা।
বংশীর সঙ্গে হিরণদের আলাপ করিয়ে দিলেন শিশির। পিঠ নুইয়ে সবাইকে নমস্তে জানায় সে।
হিরণ বাড়ির চাবি নিয়ে এসেছিল। গেটের ঢাউস তালা যখন সে খুলছে সেই সময় বিনয়ের। চোখ চলে যায় খানিক দূরে মধুসূদন ভট্টাচার্যের বাড়িটার দিকে। মধুসূদন সেদিনই বলে রেখেছিলেন, খান মঞ্জিল-এ যখনই বিনয়রা আসবে, একবার যেন তার সঙ্গে দেখা করে যায়।
একটু ভাল করে লক্ষ করতেই বিনয়ের মনে হল, মধুসূদনদের বাড়িটা আশ্চর্য রকমের নিঝুম। এ-ধার থেকে যেটুকু চোখে পড়ছে–সব দরজা জানালা বন্ধ।
কী জানি কেন, নিজের কাছে তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই বাড়িটা যেন বিনয়ের শিরায়ু ধরে টানতে লাগল। হিরণ গেটের তালা খুলে ফেলেছিল। বিনয় তাদের বলে, আপনারা ভেতরে যান। আমি একটু পরে আসছি।
হিরণ মোটামুটি আঁচ করে নিয়েছিল। জিজ্ঞেস করল, মধুসূদনবাবুর বাড়ি যাবে নাকি?
হ্যাঁ। এদিক যখন আসাই হল, একবার যাই—
ঠিক আছে। বেশি দেরি কোরো না।
না না, দেখা করেই চলে আসব।
ওঁকে বোলো, আমি আজ আর যেতে পারব না। বংশী সিংকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বাড়ি দেখাতে অনেকটা সময় লেগে যাবে। এরপর যেদিন আসব, নিশ্চয়ই দেখা করব।
আচ্ছা
শিশির এবং আনন্দ, দুজনেই জিজ্ঞেস করল, মধুসূদনবাবু কে?
হিরণ জানিয়ে দেয়, তাদের মতোই বাড়ি এক্সচেঞ্জ করে পাকিস্তান থেকে এ-পাড়ায় চলে এসেছেন মধুসূদন। খান মঞ্জিল মেরামত হয়ে গেলে তারা যখন পাকাপাকি ভাবে উঠে আসবে, মধুসূদনবাবুরা হবেন তাদের প্রতিবেশী। পাকিস্তানে থাকতে ওঁদের পরিবারে যে চরম বিপর্যয় ঘটে গেছে, নিচু গলায় তা জানাতে জানাতে হিরণ আনন্দ এবং শিশিরকে সঙ্গে করে খান মঞ্জিল-এর কমপাউন্ডে ঢুকে পড়ে। তাদের পিছু পিছু যায় বংশী সিং।
এদিকে বিনয় সোজা চলে আসে মধুসূদনদের বাড়ির সামনে। গেট খোলা রয়েছে। সেদিন এখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন মধুসূদন। আজ কারওকেই দেখা যাচ্ছে না।
কী ভেবে দুপাশের এবং রাস্তার উলটো দিকের বাড়িগুলোর দিকে তাকায় বিনয়। ওই সব বাড়ির জানালায় কিছু মুখ চোখে পড়ে। নানা বয়সের মহিলাই বেশি। কিছু পুরুষও রয়েছে। সকলেই কেমন যেন বিহূল। কোনও কারণে মানসিক দিক থেকে ভীষণভাবে ঝাঁকুনি খেলে যেমন হয়, অবিকল সেইরকম চেহারা।
বোঝা যাচ্ছে, মধুসূদনদের বাড়িতে কিছু একটা ঘটেছে। মারাত্মক কোনও ঘটনা। কী সেটা? চকিতে বিনয় একবার ভাবল, ফিরেই যায়। পর মুহূর্তে ঠিক করে ফেলে, বাড়ির গেট পর্যন্ত এসে দেখা করে না-যাওয়াটা বিশ্রী ব্যাপার। অনুচিতও। তাছাড়া, কৌতূহলের চেয়ে তীব্রভাবে যেটা তাকে ঠেসে ধরতে শুরু করেছে তা হল উৎকণ্ঠা। ভেতর থেকে অদৃশ্য কেউ জানান দিয়ে যাচ্ছে, মধুসূদনরা নিশ্চয়ই কোনও বিপদে পড়েছেন।
গেটের একটা পাল্লা আধাআধি খোলা ছিল। সেটা ঠেলে ভেতরে ঢুকে পড়ল বিনয়। কপা এগুলেই বাড়ির সদর দরজা। সেটা অবশ্য বন্ধ। সেখানে এসে সে ডাকতে লাগল, মধুসূদনবাবু মধুসূদনবাবু
অনেকক্ষণ ডাকাডাকির পর মধুসূদনই দরজা খুলে দিলেন। ভাঙা ভাঙা, ঝাপসা গলায় বললেন, ও, আপনি!
মধুসূদনের দিকে তাকিয়ে চমকে উঠল বিনয়। কয়েকদিন আগেও তাকে দেখে গেছে। তখনও যে খুব একটা সুস্থ, প্রাণবন্ত মনে হয়েছিল তা নয়। বিমর্ষ মুখ। বোঝা যাচ্ছিল, কী এক যন্ত্রণায় সারাক্ষণ কষ্ট পাচ্ছেন। তার কারণও পরে জানা গেছে। কিন্তু সেই মানুষটাকে আজ চেনাই যায় না। ফর্সা রং পুড়ে ছাইবর্ণ। গর্তে ঢুকে যাওয়া চোখের কোলে পুরু কালির ছোপ। গাল বসে গেছে। মুখময় কঁচাপাকা দাড়ি। চুল উষ্কখুষ্ক। চোখ দুটো এত লাল, মনে হয় রক্ত জমাট বেঁধে আছে। পরনে ময়লা ধুতি জামা চাদর।
মাত্র কটা দিনে একটা মানুষ ভেঙেচুরে এতটা তছনছ হয়ে যাবে, কে ভাবতে পেরেছিল! হঠাৎ দেখা গেল, মধুসূদনের পেছন থেকে উঁকি দিচ্ছে তার ছেলে মন্টু। ফুটফুটে কিশোরটিও ঠিক স্বাভাবিক নেই। ভীষণ আতঙ্কগ্রস্ত। চোখে মুখে নিদারুণ ভয়ের ছাপ।
মধুসূদনের সঙ্গে কোনও সম্পর্ক নেই। সে-রকম কোনও ঘনিষ্ঠতাও হয়নি। এর আগে একবারই মাত্র দেখা হয়েছে। তবু তাঁকে এবং মন্টুকে আজ দেখতে দেখতে উদ্বেগে বুকের ভেতরটা ভরে যাচ্ছে বিনয়ের। সে বলল, খান মঞ্জিল-এ এসেছিলাম। ভাবলাম আপনার সঙ্গে দেখা করে যাই। কিন্তু এ কী চেহারা হয়েছে আপনাদের।
তক্ষুনি উত্তর দিলেন না মধুসূদন। কিছুক্ষণ পর উদ্ভ্রান্তের মতো বললেন, আমাদের সর্বনাশ হয়ে গেছে। কীভাবে যে বেঁচে আছি, নিজেরাই জানি না। এর চেয়ে মরে যাওয়াই ভাল
উৎকণ্ঠা বহুগুণ বেড়ে যায় বিনয়ের। কোনও রকমে সে বলে, কী হয়েছে?
এক মুহূর্ত কী ভেবে মধুসূদন বললেন, ভেতরে এস, সব বলছি।
সদর দরজা দিয়ে ঢুকে একটু এগুলেই বসবার ঘর। মধুসূদন বিনয়কে সেখানে নিয়ে এলেন। মন্টুও সঙ্গে সঙ্গে এসেছে। আগের দিনও বিনয়দের এই ঘরেই এনে বসানো হয়েছিল।
