রাস্তার দুধারে চেনা সব দৃশ্য। ডোবা, পানাপুকুর, টালি বা খাপরার চালে ছাওয়া বস্তি। ফাঁকা মাঠে ঢ্যাঙা তালগাছ। টালিগঞ্জের এদিকটায় প্রচুর পাখি। চড়াই, চিল, কাক, বুলবুলি, পাখি, বক। নানা ধরনের গাছও রয়েছে অজস্র। গাছগুলোর মাথায় এবং আকাশে ঝাঁকে ঝাকে পাখি উড়ছে।
সুধা যে পিলটা দিয়েছিল সেটা বেশ তেজী। গায়ের ব্যথা অনেক কম লাগছে। মাথার টিপ টিপ আর জ্বর জ্বর ভাবটাও প্রায় নেই বললেই হয়। সারা শরীরে ঘন করে চাদর জড়িয়ে আনন্দর পাশে বসে অন্যমনস্কর মতো দুপাশের বাড়িটাড়ি মাঠঘাট দেখছিল বিনয়। কিন্তু মাথায় সেই চিন্তাটাই পাক খাচ্ছে। রাজদিয়ায় থাকার সময় শিশিরের খুব কাছাকাছি কখনও যায়নি সে। যেটুকু দেখেছে, দূর থেকেই। পাঁচ দুবছর বাদে আবার দেখা হল। কিন্তু তার কাছে শিশিরের কী প্রয়োজন থাকতে পারে, কিছুতেই আঁচ করা যাচ্ছে না। খানিক আগে সুধা আর সুনীতির মুখে চাপা হাসি দেখে একটু অন্তত বোঝা গেছে, ওরা সব জানে। দিদিরা যখন জানে, তাদের স্বামীদের কি আর তা অজানা আছে?
আচমকা বিনয়ের মনে হল, আনন্দকে জিজ্ঞেস করলে ব্যাপারটা হয়তত পরিষ্কার হবে। ঘাড় ফিরিয়ে লক্ষ করল, খুব মন দিয়ে চারদিক দেখছে আনন্দ। নিচু গলায় তাকে ডাকল বিনয়।
আনন্দ মুখ ফেরায় না। যেমন দেখছিল তেমনই দেখতে দেখতে জিজ্ঞেস করল, কিছু বলবে?
তার কাছে শিশিরের কী প্রয়োজন, জানতে চাইল বিনয়।
যথাযথ উত্তর এবারও পাওয়া গেল না। ভাসা-ভাসা ভাবে আনন্দ বলল, তোমার ফিউচার প্ল্যান কী, এই নিয়ে বোধহয় শিশিরদা আলোচনা করবেন।
বিনয় বিরক্ত হল। জেনেশুনেও সবাই এড়িয়ে যাচ্ছে। সে চুপ করে রইল। পরক্ষণে ভেতরে ভেতরে চঞ্চল হয়ে ওঠে, তার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে শিশিরের এত আগ্রহ কেন? আকাশপাতাল হাতড়েও সঠিক কারণটা খুঁজে না পেয়ে তার মন ঘোলাটে হয়ে থাকে।
রিকশা একসময় সেই গরিব মুসলমানদের বস্তিটার সামনে চলে আসে।
সেটা পেরুবার পর আনন্দ বলল, টালিগঞ্জের এদিকটায় আগে কখনও আসিনি। তবে জানি, ফর্টি-সিক্সের ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডেতে এখান থেকে মুসলমানরা মিছিল বার করেছিল। তাদের স্লোগান ছিল, লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান। খুব গন্ডগোল হয়েছিল এই এরিয়ায়।
শিশিরকে বাদ দিয়ে একেবারে অন্য প্রসঙ্গে চলে এসেছে আনন্দ। বিনয় অন্যমনস্কর মতো বলল, হিরণদাও সেদিন তাই বলছিল।
শুনেছিলাম, পাকিস্তান হবার পর এখানকার মুসলমানেরা ভিটেমাটি ফেলে চলে গেছে। এখন তো দেখছি সবাই যায়নি।
ওপারের সব হিন্দুই কি চলে এসেছে?
কথাটা বুঝতে না পেরে আনন্দ বলল, মানে?
বিনয় বলে, লাখ লাখ হিন্দু যেমন চলে এসেছে তেমন যাদের উপায় নেই তারা পাকিস্তানেই থেকে গেছে। অজানা, নতুন জায়গায় গিয়ে কী খাবে, কী করবে, সেই দুশ্চিন্তা তো রয়েছে। এখানকার মুসলিমদের সম্পর্কেও একই কথা–
কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর আনন্দ জিজ্ঞেস করে, হিরণদের খান মঞ্জিল এখান থেকে আর কত দূরে?
বিনয় বলল, আরও মিনিট পাঁচ-সাতেক লাগবে।
রিকশায় পাঁচ-সাত মিনিটের পথ আর কতটুকু? এমন এক জায়গায় হিরণরা বাড়ি এক্সচেঞ্জ করল যার গা ঘেঁষে কিনা মুসলিম বস্তি! আনন্দকে রীতিমতো চিন্তাগ্রস্ত দেখায়। আর কোনও সেফ জায়গায় ওরা বাড়ি পেল না?
আনন্দর দুর্ভাবনার কারণটা স্পষ্ট। সেই অবিশ্বাস। কলকাতার সবচেয়ে নিরাপদ এলাকায় বাস করেও টু নেশন থিয়োরির বিষ তার মধ্যেও ঢুকে গেছে। বিনয় বলল, যতদূর শুনেছি, এরা খুব নিরীহ মানুষ। বারি জামাকাপড়ের চেহারা দেখে বুঝতেই পারছেন ভীষণ গরিব। নিজেরাই ভয়ে ভয়ে থাকে। ওরা অন্যের ক্ষতি করবে, ভাবাই যায় না।
আনন্দ তার কথা যেন শুনতেই পেল না। বলল, যেখানে হিরণরা বাড়ি নিয়েছে তার আশেপাশে কত মুসলিম আছে?
আগে অনেক ছিল। বেশির ভাগই চলে গেছে। যারা এখনও রয়েছে, তাদের কেউ কেউ পাকিস্তানে যাবার জন্য পা বাড়িয়ে আছে। প্রপার্টি এক্সচেঞ্জ বা বিক্রি করতে যেটুকু সময় লাগে তার বেশি একদিনও থাকবে না।
একসময় খান মঞ্জিল-এর সামনে এসে পর পর দুই রিকশা থামল। সবাই নেমে পড়ে। পয়সা বার করার জন্য পকেটে হাত ঢুকিয়েছিল হিরণ। দেখতে পেয়ে গম্ভীর মুখে ধমকের সুরে শিশির বললেন, তোমার সাহস তো কম নয়। আমি সবার বড়। তুমি কি না ভাড়া দিতে চাইছ! পকেট থেকে হাত বার কর।
রিকশা পিছু ছআনা ভাড়া। দুই রিকশাওলাকে তাদের পয়সা মিটিয়ে দিয়ে শিশির খান মঞ্জিল– এর দিকে তাকালেন। হিরণকে জিজ্ঞেস করলেন, এই বাড়ি?
হিরণ আস্তে মাথা নাড়ে, হ্যাঁ
বাইরে থেকে মনে হচ্ছে বেশ শক্তপোক্ত। এক্সচেঞ্জ করে বেশ ভাল বাড়িই তো পেয়েছ।
হিরণ খুশি হল। দেশের সম্পত্তি বদলাবদলি করে সে যা পেয়েছে তাতে অন্তত ঠকতে হয়নি। যারাই দেখেছে, বাড়িটার প্রশংসা করেছে।
একটু হেসে হিরণ বলল, আসুন
খান মঞ্জিল-এর দিকে পা বাড়াতে গিয়ে চোখে পড়ল, বন্ধ গেটের সামনে একটা নিরেট চেহারার লোক দাঁড়িয়ে আছে। বয়স পঁয়তাল্লিশ থেকে পঞ্চাশের ভেতর। মাথায় কাঁচাপাকা চুলে কদমছাঁট। পরনে খাটো ধুতি, আর ছিটের ফুল শার্টের ওপর রোয়াওলা চাদর। পায়ে হাঁটু অবধি মোজা আর বেটপ ভারী বুট। বাঁ হাতে গোলাকার ঘড়ি।
কাছাকাছি যেতেই লোকটা হাতজোড় করে পিঠ ঝুঁকিয়ে সসম্ভ্রমে শিশিরের উদ্দেশে বলল, নমস্তে বড়ে সাব
