সুধা প্লেটের দিকে আঙুল বাড়িয়ে শিশিরদের বলে, লুচি ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে। খেয়ে নিন। আমাদের আর দাঁড়াবার সময় নেই। রান্নাবান্না সব পড়ে আছে।
খাদ্যবস্তুর পরিমাণ আগেই নজরে পড়েছিল শিশিরের। নানা কথায় অন্যমনস্ক থাকায় তা নিয়ে মাথা ঘামাননি। এবার প্রায় আঁতকে উঠলেন, কী করেছ সুধা! এত কখনও খাওয়া যায়।
যায় যায়। দুপুরে ভাত খেতে অনেক দেরি হবে। নিন, প্লেটে হাত দিন।
সুধা যা মেয়ে, কোনও ওজরই কানে তুলবে না। নিরুপায় শিশির কাঁধ ঝাঁকিয়ে, করুণ মুখে লুচির কোনা ছিঁড়তে লাগলেন।
সুধা ঘরের বাকি সবাইকে খাওয়ার জন্য তাড়া দিয়ে সুনীতিকে সঙ্গে করে রান্না ঘরের দিকে চলে গেল।
খেতে খেতে শিশির দ্বারিক দত্তকে বললেন, আপনাদের সঙ্গে দেখা করা তো আছেই, আরও দুটো বিশেষ দরকারে আজ আমাকে আসতে হল।
দ্বারিক দত্ত বললেন, একটা তো জানি। রাজমিস্তিরির ব্যাপারে কী সব ব্যবস্থা করেছিস। সেদিন হিরণ বলছিল, তুই আসবি।
হ্যাঁ। আপনাদের খান মঞ্জিল সারাবার জন্যে হিরণ ভাল মিস্তিরি জোগাড় করে দিতে আনন্দকে ধরেছিল। আনন্দ গিয়ে আমাকে বলল। আমাদের বাড়িতে গত বছর যে বিহারি মিস্তিরিরা কাজ করেছিল তাদের ডাকিয়ে আনলাম। ওরা লোক ভাল। বিশ্বাসী। গলাকাটা মজুরি হাঁকে না। হিরণের পক্ষে তো অফিস ফেলে সারাক্ষণ পেছনে লেগে থাকা সম্ভব নয়। কী কী করতে হবে, বলে দেবে। আমার মিস্তিরিরা একখানা ইট কি এতটুকু সিমেন্টও সরাবে না।
দ্বারিক দত্ত খুবই উৎসাহিত হয়ে ওঠেন, এরকম লোকই তো দরকার। কবে থেকে ওরা কাজে লাগবে?
আপনারা যেদিন থেকে বলবেন। শিশির বলতে লাগলেন, আনন্দ খান মঞ্জিল-এর ঠিকানা দিয়ে এসেছিল। আজ সাড়ে দশটায় আমি ওদের হেড মিস্তিরি বংশী সিংকে ওই বাড়িটার সামনে দাঁড়াতে বলেছি। ও বাড়িটা দেখুক, কী খরচাটরচা পড়বে তার একটা এস্টিমেট দিক। তারপর শুভদিন দেখে কাজ শুরু করুক।
দ্বারিক দত্ত বললেন, খুব ভাল। এবার তোর দুনম্বর দরকারটার কথা বল।
মাথা সামান্য কাত করে শিশির বিনয়কে এক লহমা দেখে নিলেন। তারপর বললেন, সেটা বিনুর ব্যাপারে–
মুখটা তেতো তেতো লাগছিল বিনয়ের। একেবারেই খেতে ইচ্ছা করছিল না। তবু খুঁটে খুঁটে একটু আধটু মুখে দিচ্ছিল। শিশিরের কথা কানে যেতে চমকে উঠল। খান মঞ্জিল সারানোর ব্যবস্থা করা না হয় ঠিক আছে, কিন্তু তার কাছে এমন কী প্রয়োজন থাকতে পারে যে শিশিরকে জাফর শা রোডে ছুটে আসতে হয়েছে? দ্বারিক দত্ত জিজ্ঞেস করলেন, বিনুর ব্যাপারে কী দরকার রে শিশির?
শিশির বললেন, এখন না। খান মঞ্জিল থেকে ফিরে এসে বলব-হৈঠাৎ সামনের দেওয়ালে ঘরির দিকে চোখ পড়তে চঞ্চল হয়ে উঠলেন, হিরণ বিনু আনন্দ-তাড়াতাড়ি খাওয়া শেষ করে নাও। দশটা বেজে বাইশ হয়ে গেছে। দ্বারিক দত্তকে বললেন, আপনিও চলুন দ্বারিক জেঠা—-
দ্বারিক দত্ত বললেন, আমি তো সেদিনই দেখে এসেছি। তারা আজ যা। মিস্তিরিরা কাজে লাগলে তখন যাব।
বিনয়ের যাবার খুব একটা ইচ্ছে ছিল না। শরীর খারাপ লাগলেও শিশিরের মুখের ওপর না বলা গেল না। কোনও রকমে দুটো লুচি খেয়ে সে ভেতরে চলে গেল। বেরুবার আগে ওষুধ টোষুধ কিছু খেয়ে নিতে হবে।
বাইরের ঘরের সামনে সরু প্যাসেজ। সেটার ডান ধারে কিচেন। আর-একটু এগিয়ে গেলে বা পাশে পর পর বেড-রুম।
রান্নাঘরের দরজার মুখে আসতে বিনয়ের চোখে পড়ল, এলাহি কাণ্ড চলছে। উনুন ছাড়াও দু দুটো স্টোভ জ্বলছে। সেগুলোর মাথায় বড় বড় কড়াইতে মাংস, পালং-এর ঘন্ট, মুগের ডাল চাপানো হয়েছে। আরও তিন রকমের মাছ রান্না হবে। সেগুলো কেটে কুটে আলাদা আলাদা কানা-উঁচু বোগি থালায় নুন হলুদ মাখিয়ে রাখা হয়েছে। দুই বোন সুধা-সুনীতি একেবারে হিমসিম। তারই মধ্যে চলছে নানা মজার কথায় হি হি হাসি। এক কোণে উমা শিলে বাটনা বেটে চলেছে।
বিনয় ডাকে, ছোটদি—
সুধারা মুখ ফিরিয়ে তাকায়। সুধা জিজ্ঞেস করে কি রে, কিছু চাই?
হ্যাঁ। তোর কাছে গা ব্যথার পিল-টিল আছে?
কেন রে?
শরীরটা ম্যাজ ম্যাজ করছে।
রাত্তিরে অফিস থেকে ফিরিস। নিশ্চয়ই ঠাণ্ডা লেগেছে। দাঁড়া, ওষুধ নিয়ে আসছি।
কিচেন থেকে বেরিয়ে ওধারে তাদের বেডরুম থেকে একটা বাদামি রঙের গোলাকার পিল এক গেলাস জলসুদ্ধ বিনয়কে দিল সুধা।–খেয়ে ফেল। দশ মিনিটের ভেতর ব্যথা কমে যাবে। দেখবি বেশ ঝরঝরে লাগছে।
ওষুধ খেয়ে গেলাসটা কিচেনের এক পাশে নামিয়ে রাখতে রাখতে বিনয় জিজ্ঞেস করল, শিশির দা আমার কাছে কী একটা দরকারে নাকি এসেছেন? তোরা কিছু জানিস?
চকিতে সুধা সুনীতির দিকে তাকায়। দুই বোনের চোখেমুখে চাপা হাসি খেলে যায়। তারপর ভীষণ ভালমানুষের মতো মুখ করে সুধা বলে ওঠে, আমরা কিছু জানি না বাবা। শিশিরদা যখন এসেছেন, তিনিই বলবেন। ততক্ষণ ধৈর্য ধরে থাক।
বিনয়ের মনে হল, সুধা-সুনীতি সব জানে। সে আর কোনও প্রশ্ন করল না। অনেকখানি অস্বস্তি নিয়ে বাইরের ঘরের দিকে চলে গেল।
.
৩৩.
বাড়ি থেকে বেরিয়ে দুখানা রিকশা ডেকে নিয়েছিল হিরণ। অলিগলির ভেতর দিয়ে পাক খেতে খেতে সে দুটো এখন খান মঞ্জিল-এর দিকে এগিয়ে চলেছে।
সামনের রিকশাটায় বসেছে হিরণ আর শিশির। পেছনেরটায় আনন্দ আর বিনয়।
শীতটা এবার কলকাতায় বেশ জাঁকিয়েই পড়েছে। এখন এগারোটার মতো বাজে। রোদে ভেসে যাচ্ছে শহর। তবু শরীরকে তপ্ত করে তোলার পক্ষে যথেষ্ট নয়। একটাই বাঁচোয়া, আজ কনকনে উথুরে বাতাসের দাপটা নেই।
