বিনয় বলল, তাহলে খুবই ভাল হয়। দাদুর চিঠি না এলে আনন্দদাকে জানিয়ে দেব, আনন্দদা আপনাকে বলে আসবে।
আনন্দদা কেন? তুমি তো আমাদের বাড়ি চেনো। নিজেই চলে এস।
রামকেশবের মুখটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে। বিনয় উত্তর দিল না।
শিশিরের আসার খবর পেয়ে দ্বারিক দত্ত বাইরের ঘরে চলে এলেন। তাকে দেখে শিশির আর আনন্দ উঠে গিয়ে প্রণাম করল।
দ্বারিক দত্ত একটা সোফায় বসে আনন্দদের বসতে বলে অভিযোগের সুরে শুরু করলেন, শিশির, তুই এই বুড়ো মানুষটাকে একেবারে ভুলে গেছিস। আনন্দ তবু মাঝে মাঝে আসে। পাকিস্তান থেকে কবে চলে এসেছি। একবার তো লোকে দেখা করে যায়?
বিব্রত শিশির বললেন, এই, মানে
এরপর কিছুক্ষণ দেশের কথা হল। সাতচল্লিশের ভাগাভাগির পর পূর্ব বাংলা এখন ছারখার। দ্বারিক দত্তর গলায় শুধু আক্ষেপ। লাখ লাখ মানুষ ভিটেমাটি থেকে উৎখাত হয়ে শেষ হয়ে গেল। এই স্বাধীনতার কোনও প্রয়োজন ছিল।
ঘরের আবহাওয়া থমথমে হয়ে যায়।
এই সময় কলরোল তুলে সুধা বাইরের ঘরে ঢুকল। তার সঙ্গে সুনীতি। ওদের হাতে কাঠের নকশা-করা ট্রেতে চায়ের কাপ আর চীনামাটির বড় বড় প্লেটে লুচি, বেগুন ভাজা, আলুকপির তরকারি, মিষ্টি। এর মধ্যেই শিশিরদের আপ্যায়নের ব্যবস্থা করে ফেলেছে সুধা।
কাপ-প্লেট নিচু সেন্টার টেবলে সাজিয়ে দিতে দিতে সুধা শিশিরকে বলল, কি মশাই, সেই দুবছর আগে একবার এ-বাড়িতে এসেছিলেন। এতদিনে আমাদের কথা মনে পড়ল। তার গলায় অনুযোগ। হয়তো সামান্য অভিমানও।
রাজদিয়ায় যখন সুধা শিশিরকে দেখেছিল তখন তার বয়স অনেক কম। রাশভারী, প্রৌঢ় মানুষটার কাছে বিশেষ ঘেঁষত না। বেশ দূরে দূরেই থাকত। কিন্তু আনন্দর সঙ্গে সুনীতির বিয়ে হবার পর থেকে সম্পর্কটা অন্যরকম হয়ে গেছে। বয়সের তফাত সুধা আর মানেই না।
দেখা হলে দিদির ননদের স্বামীর সঙ্গে সমানে ঠাট্টা ইয়ারকি করে। শিশির কাচুমাচু মুখে বললেন, অফিসে এত কাজের চাপ যে কোথাও যাব, কারও সঙ্গে দেখা করব, তেমন সময় করে উঠতে পারি না।
সুধা বলল, রবিবারেও আপনার অফিস থাকে না কি?
শিশির সুধাকে একটু ভয়ই পান। মেয়েটার কথায় রাখঢাক নেই। কারওকেই সে তিলমাত্র রেয়াত করে না। বললেন, সব কাজ অফিসে শেষ করতে পারি না। অনেক ফাইল বাড়িতে এনে দেখতে। হয়।
জানি জানি, আপনি বিরাট কাজের লোক। সুধা ঝংকার দিয়ে ওঠে, তবু তারই ভেতর আত্মীয়স্বজনদের কাছে যেতে হয়, নইলে সম্পর্ক থাকে না। তাছাড়া
একটার পর একটা তীর ছুঁড়ে যাচ্ছে মেয়েটা। তটস্থ শিশির জিজ্ঞেস করলেন, তাছাড়া কী?
আমরা পৃথিবীর বাইরে থাকি না। হেদুয়া থেকে আমাদের এই টালিগঞ্জ সাত-আট মাইলের বেশি হবে না। ইচ্ছে থাকলে এটুকু পথ কষ্ট করে আসা যায়।
শিশির ঘাড় চুলকোতে চুলকোতে বললেন, তা অবশ্য যায়। তবে ওই যে বললাম, কাজের প্রেসার।
শিশিরকে কোণঠাসা হতে দেখে ঘরের সবাই খুব মজা পাচ্ছিল। হাসছিলও।
শিশির চকিতে ভেবে নিলেন পালটা আক্রমণ হানতে না পারলে সুধাকে রোখা যাবে না। সুধা ফের অস্ত্র তুলতে যাচ্ছিল, তার আগেই তিনি বলে উঠলেন, টালিগঞ্জ থেকে আমাদের হেদুয়াও সাত-আট মাইলের বেশি হবে না। আমরাও পৃথিবীর বাইরে থাকি না। তুমি কদিন গেছ আমাদের বাড়িতে?
সুধা একটু থতমত খেয়ে গেল। পরক্ষণে সামলে নিয়ে বলে, কাজটা বুঝি শুধু ছেলেদেরই থাকে? মেয়েদের থাকে না? অফিসের ভাত দেওয়া, অসুস্থ জেঠিশাশুড়িকে খাওয়ান, চান করানো, দাদাশ্বশুরের দেখাশোনা–এসব বুঝি কাজ না? কখন–
সুধাকে বাগে পাওয়া গেছে। হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিয়ে শিশির বললেন, তোমারও সময় নেই, আমারও সময় নেই। সুতরাং কাটাকুটি।
দ্বারিক দত্ত হাত তুলেছিলেন। হেসে হেসে বললেন, আর যুদ্ধ নয়। এবার শান্তি। সুধা, তুমি প্রথম দিকে ভালই চালাচ্ছিলে। শেষটায় শিশির কিন্তু তোমাকে কজা করে ফেলেছে।
সুধার ভেতর একটি চুলবুলে বালিকা রয়েছে। সে জিভ ভেংচে বলে, ই-হি-হি, তারপর শিশিরের দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করল, কষ্ট করে যখন এসেই পড়লেন, স্মৃতিরেখাদিকে নিয়ে এলেন না কেন?
খানিক আগে দেশভাগের প্রসঙ্গ ওঠায় ঘরের পরিবেশটা ভারী হয়ে উঠেছিল। এখন সেটা অনেক হালকা। শিশির বললেন, স্মৃতিরেখার আসার খুব ইচ্ছা ছিল। কাল থেকে কোমরে খিচ ধরেছে। ভীষণ টাটাচ্ছে। তাই এল না। পরে একদিন নিশ্চয়ই আসবে।
ঝুমার নিশ্চয়ই খিচ ধরেনি। সে এল না কেন?
রবিবার একজন প্রফেসরের কাছে পড়তে যায়। আসবে কী করে?
একপাশে চুপচাপ বসে আছে বিনয়। গা ব্যথা তো আছেই, মাথাও টিপটিপ করছিল। ঘরের ভেতর লঘু সুরে মজার মজার কথা হচ্ছে। সেদিকে তার মন নেই। শরীর ভাল না থাকলে যা হয়। আচমকা ঝুমার নামটা কানে আসতে সে যেন একটা ঝাঁকুনি খায়। সঙ্গে সঙ্গে ঝিনুকের মুখ চোখের সামনে কোনও অলৌকিক পর্দায় ভেসে ওঠে। ঝুমা আর ঝিনুক, ঝিনুক আর ঝুমা-মেয়ে দুটো যেন কোনও অদৃশ্য সুতোয় জড়িয়ে আছে। রাজদিয়ার মানুষজন, দেশভাগের পর যারা কলকাতায় চলে এসেছে, তাদের যার সঙ্গেই দেখা যোক, ঝিনুকের প্রসঙ্গ টেনে আনবেই। শিশির কিন্তু তার নাম একবারও মুখে আনেননি। কখন ফস করে তার সম্পর্কে তিনি কী জিজ্ঞেস করবেন, কোন ধরনের নিষ্ঠুর মন্তব্য করে বসবেন—ভাবতেই তটস্থ হয়ে ওঠে বিনয়।
