কয়েকজন আসবে। তুমি বাড়িতে থাকলে ভাল হয়।
কারা আসবে?
হিরণ হাসল, অচেনা কেউ নয়। একটু ওয়েট কর। নিজের চোখেই দেখতে পাবে।
মিনিট পনেরো কুড়ি বাদে বাইরে থেকে একটা গলা ভেসে এল। কেউ ডাকছে, হিরণ প্রধা দরজা খোল। সেই সঙ্গে কড়া নাড়ার একটানা খটখটানি।
চা খাওয়া হয়ে গিয়েছিল। খবরের কাগজ হাত থেকে নামিয়ে লাফ দিয়ে উঠে পড়ল হির। ওরা এসে গেছে বলতে বলতে ঘর থেকে বেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে তর তর করে নেমে গেল সে।
যে ডাকছিল তার কণ্ঠস্বরটি খুবই চেনা। আনন্দ এসেছে। সে যে আজ আসবে, হিরণ কি সুধা আগে জানায়নি। অবাক হয়ে বসে থাকে বিনয়।
খানিক পরে শুধু আনন্দই না, হিরণের সঙ্গে সুনীতি আর শিশিরও দোতলায় উঠে এসেছেন। এই তোপরশুদিন আনন্দ এ-বাড়িতে এসে তাকে সঙ্গে করে নতুন ভারত-এর অফিসে গিয়েছিল। আজই যে সে আবার আসবে, ঘুণাক্ষরে তা জানায় নি। জানাতে যে হবে, এমন কোনও কথা নেই। সুনীতিকে নিয়ে সে যখন ইচ্ছা শালী এবং ভায়রার বাড়ি আসতেই পারে কিন্তু ঝুমার বাবা শিশির যে ওদের সঙ্গে চলে আসবেন তা ভাবা যায় নি। রীতিমতো অবাক হয়ে যায় বিনয়।
হিরণ শিশির আর আনন্দ ঘরে চলে আসে। সুনীতি কিন্তু ঢুকল না। দরজার বাইরে থেকে আনন্দকে বলল, তোমরা এখানে বোসো। আমি ভেতরে সুধার কাছে যাচ্ছি। সে চলে যায়।
শিশিরকে দেখে উঠে দাঁড়িয়েছিল বিনয়। তাকে বসতে বলে একটা চেয়ারে বসে পড়লেন শিশির। হিরণ আর আনন্দও বসল।
সেই যুদ্ধের গোড়ার দিকে এক পুজোর ছুটিতে শিশির, তার স্ত্রী স্মৃতিরেখা, দুই মেয়ে রুনা ঝুমা রাজদিয়ায় গিয়েছিল। তার বছর তিনেক বাদে যুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে জাপানি বোমার আতঙ্কে কলকাতায় যখন ইভাকুয়েশন শুরু হয়ে গেছে, শহর কঁকা করে যে যেদিকে পারে পৈতৃক প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে যাচ্ছে, সেই সময় শিশিররা ফের রাজদিয়ায় গিয়ে বেশ কিছুদিন ছিলেন। এই দুবারই শিশিরকে যা দেখেছিল বিনয়। পাকিস্তান থেকে চলে আসার পর একদিন রাস্তা থেকে জোর করে ঝুমা হেদুয়ার কাছে তাদের রমাকান্ত চ্যাটার্জি লেনের বাড়িতে ধরে নিয়ে গিয়েছিল। তখন শিশির অফিসে। তাই তাঁর সঙ্গে দেখা হয়নি।
রাজদিয়ার পর কলকাতায় এই প্রথম শিশিরকে দেখল বিনয়। যুদ্ধের সময় তার বয়স ছিল বেয়াল্লিশ তেতাল্লিশ। চুলে অল্প অল্প সাদা ছোপ ধরতে শুরু করেছে। বয়স সেভাবে কামড় বসাতে পারেনি। বেশ সুপুরুষ ছিলেন। টান টান সতেজ চেহারা। মসৃণ ত্বক। চওড়া কপাল। দৃষ্টিশক্তির জোর ছিল। তখনও চশমার দরকার হয়নি।
তারপর কবছর কেটে গেছে। সেই তেজী ভাবটা আর নেই। চুল আধাআধি পেকে গেছে। শরীর জুড়ে প্রচুর ভাঙচুর। চামড়া আর তেমন চিকন নয়, সরু সরু অগুনতি রেখা ফুটে বেরিয়েছে। সারা মুখে কালচে ছোপ। পিঠটা সামান্য নুয়ে পড়েছে। একটু ঝুঁকে ঝুঁকে হাঁটেন। চোখে এখন বাই ফোকাল চশমা। দেখামাত্র টের পাওয়া যায়, বয়স তাকে অনেকটাই কাবু করে ফেলেছে।
বিনয় জানে বিরাট ব্রিটিশ ফর্মে চাকরি করেন শিশির। অফিসে স্যুটে-বুটে পাক্কা সাহেব। কিন্তু বাড়িতে কিংবা আত্মীয়স্বজনের কাছে গেলে তার পুরো বাঙালি পোশাক। সুধাদের বাড়িতে ধুতি, সার্জের পাঞ্জাবি আর শাল পরে এসেছেন।
শিশির বিনয়কে বললেন, কতদিন পর তোমাকে দেখলাম। ভাল আছ তো?
গা-ব্যথা আর জ্বর জ্বর ভাবের কথাটা জানালো না বিনয়। বলল, হ্যাঁ।
তোমার সব খবরই আনন্দ আর সুনীতির কাছে পাই। পাকিস্তান থেকে পার্মানেন্টলি চলে এসেছ। আসার পথে ভীষণ বিপদে পড়েছিলে। যে-কোনও সময় রাজাকাররা খুন করে ফেলত। ভগবানের অসীম করুণা, শেষ পর্যন্ত সেফলি ইন্ডিয়ায় এসে পৌঁছেছ। ইস্ট বেঙ্গলে ফেরার কথা আর চিন্তাও কোরো না।
না, আর ফেরার প্রশ্নই নেই।
হেমজেঠা গোঁয়ার্তুমি করে দেশে থেকে গেলেন। খুব ভুল করেছেন। আমার বাবা আসার সময় বার বার ইন্ডিয়ায় চলে আসতে বলেছিলেন। শুনলেন না।
শিশিরদের বাড়ি বিনয় যেদিন যায়, তার বাবা অর্থাৎ রামকেশবের মুখে এই কথাই শুনেছিল। সে জানে কারও পরামর্শেই কর্ণপাত করবেন না হেমনাথ। তার এক গোঁ, জন্মভূমি ছেড়ে আসবেন না।
বিনয় কী উত্তর দিতে যাচ্ছিল, তার আগেই শিশির ফের বললেন, হেমজেঠার কোনও খবর পেয়েছ?
বিনয় বলল, বেশ কিছুদিন আগে একখানা চিঠি পেয়েছিলাম। তারপর একদম চুপচাপ। আমরা ভীষণ চিন্তায় আছি। একটু থেমে বলল, রাজদিয়ার নিত্য দাস এপারে চলে এলেও পাকিস্তানের বহু লোকের সঙ্গে তার যোগাযোগ আছে।
জানি।
সে-ই দাদুর প্রথম চিঠিটা আনিয়ে দিয়েছিল। সেদিন বলে গেছে, যত তাড়াতাড়ি পারে পরের চিঠিটা আনবে।
একটু চিন্তা করে শিশির বললেন, যদি দিনকয়েকের ভেতর হেমজেঠার চিঠিপত্র না পাও, আমাকে জানিও। আমার এক বন্ধু তোফায়েল আমেদ এখন ঢাকার পুলিশ কমিশনার। তার সঙ্গে কনট্যাক্ট করে হেমজেঠার খবর আনিয়ে দেব।
চকিতে বিনয়ের মনে পড়ে যায়, সেদিন রামকেশব তোফায়েল আমেদের কথা বলেছিলেন। তিনিই রামকেশবের ইন্ডিয়ায় চলে আসার যাবতীয় ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। রামকেশব ঝিনুক সম্পর্কে নিষ্ঠুর মন্তব্য করায় অসহ্য রাগে বিনয়ের মস্তিষ্কে যেন আগুন ধরে গিয়েছিল। সে প্রতিজ্ঞা করেছিল, জীবনে আর কখনও শিশিরদের বাড়ি যাবে না। সেদিন ওখান থেকে চলে আসার সঙ্গে সঙ্গে তোফায়েল আমেদের কথা তার মাথা থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল।
