আবু হামিদ স্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শ করে দীনেশকে ইন্ডিয়ায় পাঠানোই ঠিক করে ফেলল। যদিও বুক ফেটে যাচ্ছিল, তবু মনে হচ্ছিল এটাই নির্ভুল সিদ্ধান্ত। এবং ওপরওলার এমনই ইচ্ছা।
নতুন কুর্তা প্যান্ট জুতো কিনে, দীনেশকে পরিয়ে করাচি পুলিশের হেড কোয়ার্টার্সে নিয়ে এল হামিদ। তারপর অঝোরে চোখের জলে বিদায়।
তিনদিন বাদে দাঙ্গায় নিখোঁজ আরও অনেক মানুষের সঙ্গে বোম্বাই চলে এল দীনেশ। প্রথমে পুলিশ হেড কোয়ার্টার্সে। সেখান থেকে তার আসল মা-বাবা অবিনাশ আর প্রতিভার কাছে। যে সন্তানের কোনও আশাই ছিল না তাকে ফিরে পেয়ে একেবারে উন্মাদ হয়ে গেল অবিনাশরা। সারা বাড়িতে বিদ্যুৎপ্রবাহ খেলে যেতে লাগল। ছেলেকে কীভাবে আদর করবে, কোথায় বসাবে, ভাল ভাল কী খাবার খাওয়াবে, কিছুই যেন ভেবে পাচ্ছিল না। এই তার গালে মাথায় বুকে হাত বুলিয়ে আদর করছে। এই কোলে তুলে নিচ্ছে। দোকানে নিয়ে দামি দামি পোশাক কিনে দিচ্ছে। নিয়ে যাচ্ছে। মেরিন ড্রাইভে। জুহু বিচে। এলিফ্যান্টা কেভে। দীনেশের আসার খবর পেয়ে পড়োশিরা ছুটে এসেছিল। এসেছিল আত্মীয়-পরিজনেরা। তারা একমত হয়ে জানিয়ে দিল, তিন বছর যে ছেলে মুসলমানের ঘরে কাটিয়ে এসেছে তার শুদ্ধিকরণ ভীষণ জরুরি। অতএব নিষ্ঠাভরে যাবতীয় দেবদেবীকে তুষ্ট করার জন্য পুজো হোম চলল। চলল দিবারাত্রি গীতা এবং চণ্ডীপাঠ। হোমের ঘূতের গন্ধে, ধূপের সুবাসে সারা বাড়ি যেন তপোবন হয়ে উঠল।
এত যে আদরযত্ন, শোধনের এত যে দীর্ঘ প্রক্রিয়া, কিন্তু দীনেশ সারাক্ষণ মনমরা, অন্যমনস্ক। রাতে ঘুমের ঘোরে কিংবা একটু একলা হলেই ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে সে কাঁদে, আব্ব, আম্মী–ওই নামেই আবু হামিদের ছেলেমেয়েরা তাকে এবং তার স্ত্রীকে ডাকত। দেখাদেখি দীনেশও ডাকতে শিখেছিল। নিজের মা-বাবার কাছে এসেও বহুদূরের, অন্য ধর্মের আশ্রয়দাতা মা-বাবাকে সে লহমার জন্যও ভুলতে পারেনি। তার মন সর্বক্ষণ করাচি থেকে দশ মাইল দূরের এক গ্রামে পড়ে থাকত।….
কাগজের প্রতিবেদনটা এখানেই শেষ। লাইব্রেরিতে বসেই দীনেশের জীবনের এই বিচিত্র কাহিনী সাজিয়ে গুছিয়ে বিনয় যখন লেখাটা শেষ করল, সন্ধে হয়ে গেছে। রমেন বিশ্বাসকে লাইব্রেরিতে দেখা গেল না, কখন সে তার কাজ সেরে চলে গেছে, টের পাওয়া যায়নি। তবে সেই প্রৌঢ় গম্ভীর মানুষটি মগ্ন হয়ে বইয়ের পাতায় ডুবে আছেন। দূরের টেবলে লাইব্রেরিয়ান রামগোপাল দত্ত শীতের পোশাকে সারা শরীর ভাল করে মুড়ে বিরাজ করছেন।
বিনয় আর বসল না। লেখার কাগজগুলো গুছিয়ে পিন দিয়ে গেঁথে একবার পড়ে নিল। দু একটা শব্দ পালটে নতুন শব্দ বসিয়ে সোজা তেতলায় নিউজ ডিপার্টমেন্টে তাদের রিপোর্টিং সেকশানে চলে এল।
প্রসাদ লাহিড়ি তার চেয়ারে যথারীতি বসে আছেন। তার মুখোমুখি রমেন বিশ্বাস। দুজনে কথা বলছিলেন। সুধেন্দু আর মণিলালকে দেখা গেল না। খুব সম্ভব তারা এখনও ফেরেনি।
বিনয়কে দেখে তার দিকে তাকালেন প্রসাদ। একটু হেসে জিজ্ঞেস করলেন, কিছু পাওয়া গেল?
বিনয় বলল,— লেখাটা হাতেই ছিল। সেটা প্রসাদের দিকে বাড়িয়ে দিল।
লেখাটা নিয়ে বোসো– বলে প্রসাদ পড়তে শুরু করলেন।
নিঃশব্দে রমেনের পাশের চেয়ারে বসে একদৃষ্টে প্রসাদের প্রতিক্রিয়া লক্ষ করতে লাগল বিনয়।
পড়া শেষ হলে প্রসাদ কপিটা টেবলে নামিয়ে রেখে রীতিমতো উচ্ছ্বাসের সুরে বললেন, ফাইন। এরকম হিউম্যান স্টোরি আরও পাও কি না দেখো।
নিজের অজান্তেই বিনয়ের দুই চোখ রমেনের দিকে চলে যায়। প্রসাদের মুখে তার লেখার প্রশংসা শুনতে শুনতে রমেনের মুখ হিংসেয় পুড়ে যাচ্ছে।
প্রসাদ বললেন, আজ সকালে আমার মেসে গিয়েছিলে। তাই সময় পাওনি। খুব তাড়াতাড়ি রিফিউজি কলোনিগুলোতে যাওয়া শুরু কোবরা। পারলে কাল থেকে।
মাথাটা সামান্য হেলিয়ে বিনয় বলে, আচ্ছা
এখন অফিসে তোমার কোনও কাজ নেই। ইচ্ছে হলে বাড়ি যেতে পার।
বিনয় আর বসল ন। ধীরে ধীরে উঠে পড়ল।
.
৩২.
শুক্রবার অফিসে জয়েন করেছিল বিনয়। শনিবার গিয়েছিল প্রসাদদের শান্তিনিবাস-এ। আজ রবিবার। তার সাপ্তাহিক ছুটির দিন।
তবু বিনয় ঠিক করে রেখেছিল, প্রসাদ রিফিউজি কলোনি আর রিলিফ ক্যাম্পের যে লিস্টটা দিয়েছেন তার কোনও একটায় আজ সকালে যাবে। কিন্তু কাল রাত্তিরে অফিস থেকে ফেরার সময় ঠাণ্ডা লেগে জ্বর জ্বর লাগছে। তাই সে ভেবেছে, আজ আর বেরুবে না। বেশি ঘোরাঘুরি করলে জ্বর যদি বেড়ে যায়, কাল অফিসে যাওয়া সম্ভব হবে না। কাজে জয়েন করে দুদিন যেতে না যেতেই কামাই করাটা খুব খারাপ দেখাবে। তাই সারাদিন বিশ্রাম তো নেবেই, তেমন দরকার বুঝলে দু একটা ইনফ্লুয়েঞ্জার বড়িও খাবে।
এখন আটটার মতো বাজে।
বাইরের ঘরে বসে চা খেতে খেতে খবরের কাগজ পড়ছিল হিরণ আর বিনয়। মাঝে মধ্যে এলোমেলো, অসংলগ্ন কিছু কথাও হচ্ছিল। বাঙালিদের প্রতি সেন্ট্রাল গভর্নমেন্টের বৈষম্য, কাশ্মিরে পাকিস্তানিদের হানাদারি, জিনিসপত্রের চড়া দর, ইত্যাদি।
কথার ফাঁকে হঠাৎ হিরণ জিজ্ঞেস করল, তোমার তো আজ অফ-ডে। কোথাও বেরুবে টেরুবে না তো?
জ্বরের ব্যাপারটা বাড়ির কাউকে জানায়নি বিনয়। জানালে সবাই বিশেষ করে সুধা অস্থির হয়ে উঠবে। বলল, না। কেন বলুন তো?
