শেষ পর্যন্ত ওরা একটা রিলিফ ক্যাম্প অর্থাৎ ত্রাণশিবিরে পৌঁছাতে পেরেছিল। আর তখনই দেখা গেল, সবাই আসতে পেরেছে, শুধু দীনেশ বাদ। দীনেশের বয়স তখন চার। প্রাণভয়ে পালাবার সময় কখন সে কোনদিকে ছিটকে পড়েছিল, টের পাওয়া যায়নি।
অবিনাশ এবং তার স্ত্রী প্রতিভা উন্মাদের মতো ছেলের খোঁজে তখনই বেরিয়ে পড়তে চেয়েছিল কিন্তু ত্রাণশিবিরের সুপারভাইজার এবং রক্ষীরা তাঁদের বেরুতে দেয়নি। বেরুনো মানেই দাঙ্গাবাজদের হাতে পড়ে চোখের পলকে লাশে পরিণত হওয়া।
মাস কয়েকের মতো করাচির সেই ত্রাণশিবিরে কাটাতে হয়েছে অনিনাশদের। এর মধ্যে দেশের হাল আরও খারাপ হয়েছে। পরিবেশ আরও বিষময়। আরও অগ্নিগর্ভ। হত্যা আর সন্ত্রাসের মাত্রা লাফিয়ে লাফিয়ে আরও বেড়ে যাচ্ছিল।
ছেলে-হারানোর বুকফাটা শোকে চান-খাওয়া একরকম বন্ধ হয়ে গিয়েছিল অবিনাশের। প্রতিভার চোখের জল ফুরতো না। দিবারাত্রি কেঁদেই যেত। কেঁদেই যেত। অবিরল কান্না।
ত্রাণশিবিরের কর্মী এবং সুপারভাইজারকে তো বটেই, মাঝে মাঝে খোঁজখবর নেবার জন্য যে নেতা এবং পুলিশ অফিসাররা আসতেন প্রতিভা এবং অবিনাশ তাদের হাতে-পায়ে ধরে কাকুতি মিনতি করত, দীনেশকে যেন তারা খুঁজে এনে দেন। কিন্তু সেই নিদারুণ সময়ে শয়ে শয়ে শিশু, কিশোর, যুবক যুবতী নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিল। পুলিশের হাজারটা দায়িত্ব–দাঙ্গা থামানো। সাম্প্রদায়িক উসকানি বন্ধ করা, শান্তি ফিরিয়ে আনা। যারা দাঙ্গায় হারিয়ে গেছে তাদের আলাদা আলাদা ভাবে উদ্ধার করে পরিজনদের কাছে ফিরিয়ে দেবার মতো সময় কোথায়?
একদিন জাহাজ বোঝাই করে করাচি এবং চারপাশের ত্রাণশিবিরগুলো থেকে সিন্ধু প্রদেশের হিন্দু আর শিখদের বোম্বাইতে পাঠিয়ে দেওয়া হল। বোম্বাইয়ে ধোবি তালাও এলাকার এক শরণার্থী শিবিরে তাদের থাকার ব্যবস্থা হয়। ওখানে থাকতে থাকতেই বোম্বাই পোর্টে যোগাযোগ করে অবিনাশ। সে যে করাচি বন্দরে কাজ করেছে অফিসার গ্রেডে, দাঙ্গার জন্য প্রমাণপত্র নিয়ে আসতে পারেনি, সে সব সবিস্তার জানাবার পর এবং তার কাজকর্মের অভিজ্ঞতা শুনে বোম্বাই পোর্ট তাকে চাকরি দেয়। তবে অফিসার গ্রেডে নয়। মাথা গোঁজার মতো একটা কোয়ার্টারও পেয়ে যায় সে।
বোম্বাইতে আসার পরও দীনেশের ব্যাপারে আশা ছেড়ে দেয়নি অবিনাশরা। ফি সপ্তাহে দু-একবার করে পুলিশ হেড কোয়ার্টার্সে কিংবা ভারত সরকারের রিফিউজি রিলিফ অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন মিনিস্ট্রির বোম্বাই অফিসে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পড়ে থাকত। তার একটাই আর্জি, করাচি পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করে দীনেশকে যেন তাদের কাছে ফিরিয়ে দেবার ব্যবস্থা করা হয়।
বছর তিনেক একটানা লেগে থাকার পর দীনেশকে ফিরে পাওয়া গেল। বোম্বাই পুলিশের অনবরত তাগাদায় করাচি পুলিশ এবং সেখানকার রেসকিউ টিম দাঙ্গায় নিখোঁজ মানুষজনের সঙ্গে দীনেশেরও খোঁজখবর করতে থাকে। সেই সঙ্গে উর্দু, ইংরেজি এবং সিন্ধি ভাষার কাগজগুলোতে নিরুদ্দিষ্টদের তালিকা ছেপে আবেদন করা হয়, এদের সন্ধান পাওয়া গেলে তক্ষুনি যেন অনুগ্রহ করে পুলিশ বা উদ্ধারকারী দলের অফিসে যোগাযোগ করা হয়।
খবরের কাগজে দীনেশের নাম দেখে আবু হামিদ নামে এক প্রৌঢ় মুসলমান তাকে পুলিশ হেড কোয়ার্টার্সে নিয়ে আসে। জানায়, করাচির দাঙ্গার সময় দীনেশদের পরিবার যখন উদভ্রান্তের মতো পালাচ্ছে, সে তাদের থেকে আলাদা হয়ে যায়। প্রচণ্ড ভয়ে সমানে কাঁদছিল দীনেশ আর দিশেহারার মতো ছোটাছুটি করছিল। হামিদ শহরে একটা জরুরি কাজে এসেছিল। তাকে দেখতে পেয়ে কোলে তুলে নেয়। পরে নিজেদের বাড়িতে নিয়ে যায়।
হামিদদের বাড়ি করাচিতে নয়। শহর থেকে মাইল দশেক দূরে শাহিদাবাদ নামে একটা গ্রামে। দীনেশ তখন খুবই ছোট। নিজের নাম আর বাবার নামটা কোনও রকমে বলতে পারলেও তারা করাচির কোন মহল্লায় থাকত, তার বাবা কী করত, বাড়ির আর কে কে আছে, এ-সব কোনও হদিসই দিতে পারেনি।
স্ত্রী এবং তিনটি ছেলেমেয়ে নিয়ে হামিদের সংসার। প্রথম প্রথম সেখানে গিয়ে দীনেশ খেত না, ঘুমতো না, অবিরাম কাঁদত। কেঁদেই যেত।
তারপর ধীরে ধীরে একদিন কান্না থামল। আবু হামিদের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে মিশে গেল সে। দাঙ্গায় বাপ-মা এবং অন্যান্য পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া বালকটিকে হামিদ এবং তার স্ত্রী অপার মমতায় মানুষ করে তুলতে লাগল। দীনেশ হয়ে উঠল তাদের চতুর্থ সন্তান।
হামিদ সৎ, ইমানদার মানুষ। নাম শুনেই জানতে পেরেছে দীনেশরা হিন্দু। সে হিন্দুরা যা খায় না কখনও তাকে তা খাওয়ায়নি। তাকে মুসলমান করার চেষ্টা করেনি। সব সময় ছেলেটাকে আগলে আগলে রেখেছে। বড় হবার পর জ্ঞানবুদ্ধি হলে দীনেশ কোন ধর্ম পালন করবে সেটা তার ওপর ছেড়ে দেবার কথা ভেবে রেখেছিল সে।
করাচির দাঙ্গার পর কবছর কেটে গেছে। দীনেশ এখন সাতবছরের বালক। দাঙ্গার কথা, মা বাবা-বোনের মুখ ক্রমশ তার স্মৃতিতে ঝাপসা হয়ে যেতে লাগল।
হয়তো বাকি জীবনটা শাহিদাবাদেই কেটে যেত দীনেশের। কিন্তু হঠাৎ খবরের কাগজে পুলিশের বিজ্ঞপ্তিটা চোখে পড়ে যায় আৰু হামিদের। বুকের ভেতরটা ছাঁৎ করে উঠেছিল তার। যে শিশুটিকে বিপুল স্নেহে বড় করে তুলেছে তাকে কিছুতেই ফিরিয়ে দেবে না। পরক্ষণে খেয়াল হল, দীনেশকে হারিয়ে তার মা-বাবার জীবন নিশ্চয়ই ভেঙেচুরে তছনছ হয়ে গেছে। ইন্ডিয়ায় গিয়ে কোনও রকমে তারা হয়তো বেঁচে আছে।
