তখন ইংরেজ আমল। করাচিতে দিনগুলো মসৃণভাবেই কেটে যাচ্ছিল। ছুটিছাটায় মাঝে মাঝে তিনি খায়েরপুরে যেতেন। মা-বাবা সেখানেই থাকতেন। ছোটিরাম তাদের একমাত্র সন্তান। তবে ওঁদের ছিল বিশাল একান্নবর্তী পরিবার। বিষয় সম্পত্তিরও যৌথ মালিকানা। কাকা-জেঠা, তাদের স্ত্রী এবং ছেলেমেয়েরা জড়িয়ে মড়িয়ে একই সংসারে ছিল।
চাকরিতে ঢোকার বছর দুই বাদে পোর্টের কোয়ার্টার পেয়েছিলেন ছোটিরাম। তার এক বছর পর বিয়ে। মা-বাবাকে নিজের কাছে এনে রাখতে চেয়েছিলেন। জোর করে দু-একবার নিয়েও এসেছিলেন। কিন্তু খায়েরপুরের মাটিতে তারা বাহান্ন পাকে এমন জড়িয়ে ছিলেন যে করাচির মতো বড় শহরে লোকজনের ভিড়ে হাঁপিয়ে উঠতেন। এক সপ্তাহের বেশি তাদের আটকে রাখা যেত না।
স্বাভাবিক নিয়মেই একদিন ছোটিরামের একটি ছেলে হল। নাম দেওয়া হল অবিনাশ। ছোটিরাম যেমন তার মা-বাবার একমাত্র সন্তান। অবিনাশও তাই। তার কোনও ভাইবোন নেই। ছোটিরাম খুব যত্ন করে ছেলেকে মানুষ করে তুললেন। অবিনাশ করাচির এক কলেজ থেকে বি এ পাস করে পোর্টে ভাল চাকরি পেল। প্রথমে জুনিয়র অফিসার। তিন বছরের মধ্যে সিনিয়র গ্রেডে প্রমোশন। বড় কোয়ার্টার দেওয়া হল তাকে। মা-বাবাকে নিয়ে সেখানে উঠে গেল সে। নতুন কোয়ার্টারে যাবার পর অবিনাশের বিয়ে দিলেন ছোটিরাম।
তারপর একের পর এক কত ঘটনা। ছোটিরামের রিটায়ারমেন্ট। তার মৃত্যু। কয়েক বছর বাদে তার স্ত্রী, অর্থাৎ অবিনাশের মাও মারা গেলেন।
জাগতিক নিয়মে কোনও কিছুই ফাঁকা পড়ে থাকে না। অবিনশের একটি ছেলে এবং একটি মেয়ে হল। বীণা আর দীনেশ। বীণা বড়, দীনেশ ঘোট। মা-বাবার শূন্য স্থান তারা ধীরে ধীরে পূরণ করে দিতে লাগল।
অবিনাশের চোখের সামনে আকাশপ্রমাণ কোনও স্বপ্ন ছিল না। মধ্যবিত্তদের যেমন হয় তেমনি ছিল ছোট মাপের কিছু আশা। ছোট ছোট কিছু ইচ্ছা। বীণা আর দীনেশ যতদূর পড়তে চায়, পড়াবে। বীণার ভাল বিয়ে দেবে। করাচিতে একটা বাড়ি করে ছবির মতো সাজিয়ে গুছিয়ে রাখবে। খায়েরপুরে পারিবারিক বিষয় আশয়ের প্রতি তার কোনও মোহ ছিল না। নিজের ভাগেরটা সে খুড়তুতো জেঠতুতো ভাইদের লিখে দিয়েছিল।
করাচির যে এলাকায় অবিনাশরা থাকত সেটা পাঁচমেশালি। মুসলমানই বেশি। কিছু সিন্ধুপ্রদেশের হিন্দু। কিছু শিখ। কিছু গোয়ান পি এবং ভারতের অন্য সব প্রভিন্সের সামান্য কিছু মানুষ। সবাই বন্দরের কর্মী।
পাঁচ ভাই একসঙ্গে থাকলে ঝগড়াঝাটি বাধে। বাসনকোসন পাশাপাশি রাখলে ঠোকাঠুকি লাগে। মাঝে মাঝে এই ধরনের তুচ্ছ ব্যাপার ঘটলেও অবিনাশদের মহল্লায় বড় রকমের অশান্তি কখনও হয়নি।
অবিনাশ কারও সাতে-পাঁচে থাকত না। শান্ত, নির্বিরোধ, ভালমানুষ। নিজের সংসার, ছেলেমেয়ে, স্ত্রী এবং তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সে তখন মশগুল। তবে হিন্দু হোক, মুসলমান হোক, আর পিদ্রুই হোক, প্রতিবেশী সবার সঙ্গেই ছিল তার সদ্ভাব।
ইচ্ছাপূরণের দিকে পায়ে পায়ে এগিয়ে যাচ্ছিল সে। ছেলেমেয়েরা ভালভাবেই মানুষ হচ্ছিল। নামকরা স্কুলে তারা পড়ত। লেখাপড়া শেষ হলে সৎ পাত্রের সঙ্গে বীণার বিয়েও হতো। করাচি পোর্টে কেউ রিটায়ার করলে সেই আমলে তার ছেলে, ছেলে না থাকলে তার পরিবারের কেউ চাকরি পেত। সেদিক থেকে দীনেশের ভবিষ্যৎ ছিল সুরক্ষিত। হাতে কিছু টাকা জমেছিল অবিনাশের। বাড়ির জন্য পছন্দমতো জমির খোঁজ করছিল সে। আপাতত জমিটা কেনা হয়ে থাক, পরে লোন টোন নিয়ে বাড়ি তৈরির কাজে হাত লাগানো হবে, এইরকমই ছিল তার পরিকল্পনা।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিছুই হল না। অবিনাশের সমস্ত আশা, সব স্বপ্ন চোখের পলকে নির্মূল হয়ে গেল।
উনিশ শ ছেচল্লিশে আকাশ বাতাস টু নেশন থিওরির বিষে ভরে গেছে। জিন্না এবং মুসলিম লিগ তাদের দাবিতে অনড়। দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান চাই-ই চাই। মুখের কথায় না হলে লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর লন্ডন থেকে যে ক্যাবিনেট মিশন এসেছিল তারা ফিরে যাবার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়ে গেল দাঙ্গা। নিরীহ, হতদরিদ্র, সাধারণ মানুষ যারা রাজনীতির র টুকু বোঝে না তাদের রক্তে ভেসে গেল দেশ।
সমস্ত দেশ যখন জ্বলছে, করাচি কি গা বাঁচিয়ে শান্তির দ্বীপ হয়ে থাকতে পারে? আগুনের আঁচ সেখানে এসেও লাগল। শুধু করাচিতেই না, গোটা সিন্ধু প্রদেশে দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ল।
করাচি সশস্ত্র হননকারীদের দখলে চলে যাবার পর তারা মহল্লায় মহল্লায় হানা দিতে লাগল। পোর্ট এলাকাও রেহাই পেল না।
একদিন রাতে বেছে বেছে পোর্টের কোয়ার্টারগুলোতে তুমুল হল্লা করতে করতে ঝাঁপিয়ে পড়ল দাঙ্গাবাজেরা। ভেতর থেকে টেনে টেনে বাসিন্দাদের বার করে তলোয়ার বল্লম দা ডাণ্ডা দিয়ে খুঁচিয়ে। কুপিয়ে পিটিয়ে শেষ করে দিতে লাগল। গর্ত থেকে ইঁদুর বার করে যেভাবে মারা হয়, অবিকল তেমনি।
কিন্তু সবাইকে জল্লাদের নাগালের ভেতর পায়নি। অনেকেই তাদের চোখ এড়িয়ে কোয়ার্টারের পেছন দিকের দরজা দিয়ে পালাতে পেরেছিল। অবিনাশ শিবদাসানির পরিবারও ধরা পড়তে পড়তে নেহাত আয়ুর জোর ছিল বলেই, বেঁচে গেছে। কোয়ার্টার থেকে বেরিয়ে তারা পাগলের মতো ছুটতে শুরু করেছিল। কোথায় যাচ্ছে, জানে না। প্রাণ বাঁচানো যাবে কি না, জানে না। দঙ্গল দঙ্গল হত্যাকারী মারণাস্ত্র নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে রাস্তায় রাস্তায়। তাদের কারও খপ্পরে পড়ে যাবে কি না, জানে না। শুধু দৌড়, দৌড় আর দৌড়।
