প্রসাদ এবার খাতা খুলে একটা সাদা পাতা দেখিয়ে বললেন, কাল আর আজকের তারিখ দিয়ে পর পর সই করে ফেল। অ্যাটেনডান্স রেজিস্টারটা আমার টেবলে থাকবে। রোজ অফিসে এসে প্রথমেই সইটা করবে।
আচ্ছা।
সইটই সারা হলে বিনয় জিজ্ঞেস করল, আমাদের সেকশানের আর কেউ আসেনি?
সবাই এসেছে। সুধেন্দু আর মণিলালকে একটা কাজে বাইরে পাঠিয়েছি। রমেন লাইব্রেরিতে গেছে।
নতুন ভারত বাজারে বেরুতে এখনও কদিন দেরি আছে। বিনয়কে অবশ্য অ্যাসাইনমেন্ট দেওয়া হয়েছে। আগামী সপ্তাহ থেকে অন্য রিপোর্টারদের অ্যাসাইনমেন্ট দেওয়া হবে। ততদিন তারা লাইব্রেরিতে গিয়ে অন্য স্টেটের কাগজপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করে এমন চমকপ্রদ মালমশলা জোগাড় করুক যা দশ পনেরো দিন পরেও বাসি হয়ে যাবে না। সে-সব সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কথাও বলা হয়েছিল। বিনয় যখন অফিসে থাকবে তাকেও এই ধরনের লেখা তৈরি করতে হবে। প্রসাদের ধারণা, দেরিতে ছাপা হলেও সেগুলো পাঠকদের ভাল লাগবে। কিন্তু আজ হঠাৎ মত পালটে তিনি কি সুধেন্দু আর মণিলালকে রিপোর্টিং-এর দায়িত্ব দিয়েছেন? প্রশ্নটা মাথায় এলেও মুখ ফুটে বলতে সাহস হল না বিনয়ের।
প্রসাদ বললেন, এখানে বসে থেকে আর কী করবে? লাইব্রেরিতে যাও। দেখ, কালকের মতো ভাল কিছু পাও কি না–
বিনয় উঠে পড়ল।
দোতলায় লাইব্রেরিতে আসতে চোখে পড়ল, ডানদিকের শেষ প্রান্তে নাড়ুগোপাল মার্কা, শীতকাতুরে লাইব্রেরিয়ান রামগোপাল দত্ত তার নিজস্ব টেবলটির ওধারে যথারীতি বিরাজ করছেন। গরম পাঞ্জাবি, ফুলহাতা সোয়েটার, শাল, উলের টুপি দিয়ে নিজেকে এমনভাবে দুর্ভেদ্য করে রেখেছেন যে ঠাণ্ডা হাওয়া ভেতরে ঢুকে চামড়ায় কামড় বসাবে তার উপায় নেই।
মাঝখানের মস্ত টেবলটায় এখন দুজন মাত্র পড়ুয়া। রমেন বিশ্বাস একটা ইংরেজি কাগজ থেকে কীসব টুকে নিচ্ছিল। পায়ের শব্দে চোখ তুলে একপলক বিনয়কে দেখে তক্ষুনি মাথা নামিয়ে নিল। কাল যা ঘটেছে তারপর আর কথা বলার মতো মুখ নেই তার।
লাইব্রেরির দুনম্বর পড়ুয়াটিকে আগে দেখেনি বিনয়। মাঝবয়সী। ভারী চেহারা। চোখে মোটা ফ্রেমের বাই-ফোকাল চশমা। চওড়া কপাল। মাথায় কঁচাপাকা চুল। দেখামাত্র টের পাওয়া যায় মানুষটি গম্ভীর ধরনের। পরনে মোটা খদ্দরের ধুতি, পাঞ্জাবি এবং আলোয়ান। খুব মগ্ন হয়ে কী একটা বই পড়ছেন। মাঝে মাঝে সেটা থেকে কিছু নোট নিচ্ছেন। অন্য কোনও ব্যাপারেই এখন তার নজর নেই। ইনি নতুন ভারত-এর কোন ডিপার্টমেন্টে কাজ করেন, জানা নেই। তবে বিনয় যখন এই অফিসে একবার ঢুকেছে, নিশ্চয়ই জেনে যাবে।
লাইব্রেরিতে যখন এসেছে, রামগোপাল দত্তর সঙ্গে আগে দেখা করা উচিত। পড়ার টেবলটা পেছনে রেখে বিনয় যখন ডান দিকে কপা এগিয়ে গেছে, দুহাত তুলে, টুপি-পরা মাথা ঝাঁকিয়ে হাঁ হাঁ করে উঠলেন রামগোপাল, না না, একেনে নয়। কাগজপত্তর কোতায় থাকে, কাল সবদেকিয়ে দিইচি। সেগুলো নিয়ে বসে পড়। আগে কাজ, পরে গল্প।
বিনয় থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। রামগোপাল দত্ত কাল নিজে থেকে তাদের ডেকে কত মজার মজার কথা বললেন। আড্ডাবাজ লোকটাকে আজ আর চেনাই যায় না।
রামগোপাল বিনয়ের মনোভাবটা আঁচ করে নিয়েছিলেন। বললেন, কাল তোমাদের সঙ্গে আলাপ করবার জন্যে ডেকে নিয়েছিলুম। আলাপ হয়ে গেছে। কাজের পর যদি সময় পাওয়া যায় তকন ফের তোমাদের ডাকব।
বিনয় ঘুরে লাইব্রেরির অন্য প্রান্তে চলে যায়। সেখানকার সারি সারি তাকগুলো থেকে বম্বের। তিনটে কাগজের ফাইল নামিয়ে পড়ার টেবলে এসে বসে। এগুলো গত মাসের ফাইল। কাগজগুলো হল বম্বে ট্রিবিউন, ফ্রি প্রেস জার্নাল আর টাইমস অফ ইন্ডিয়া।
ঘণ্টাখানেক খোঁজাখুঁজির পর একটা চমৎকার রিয়েল লাইফ স্টোরি পাওয়া গেল। পড়তে পড়তে স্তব্ধ হয়ে যায় বিনয়। এবং অভিভূতও।
কাল পাওয়া গিয়েছিল লাহোরের এক তরুণী নীলমের কাহিনী। আজ যার সম্বন্ধে বিনয় পড়ছে সে করাচির একটি বালক। নাম দীনেশ। লেখার সঙ্গে তার ফোটেও ছাপা হয়েছে। বড় কোমল, বড় স্নিগ্ধ মুখচ্ছবি।
কাগজের প্যাডে লেখাটার মূল পয়েন্টগুলো টুকে নিতে নিতে বার বার বিনয়ের মনে হচ্ছে, দেশর্ভাগ কতভাবেই না এই উপমহাদেশকে আলোড়িত করে যাচ্ছে।
দীনেশের কাহিনিটা এইরকম।
.
দীনেশদের আদি বাড়ি ছিল সিন্ধু প্রদেশের নগণ্য শহর খায়েরপুরে। শহরটা বিখ্যাত ভুট্টো পরিবারের জমিদারি লারকানার লাগোয়া।
ভারতবর্ষের আর দশটা মফস্বল শহর যেমন হয়, খায়েরপুর তার থেকে আলাদা কিছু নয়। শান্ত। উত্তেজনাশূন্য। সারাক্ষণ যেন ঘুমিয়েই আছে। জীবন সেখানে ঢিমে চালে রয়ে যেত। দিন যায়, মাস যায়, বছর যায়। এতটুকু পরিবর্তন নেই। সময় পরমাশ্চর্য কোনও ম্যাজিকে সেখানে থমকে ছিল।
শহরের গা ঘেঁষে দীনেশদের বেশ কিছু জমিজমা ছিল। চাষবাস এবং ছোটখাটো ব্যবসা, এই নিয়েই তার পূর্বপুরুষেরা সন্তুষ্ট থেকেছে। কেউ লেখাপড়ার ধার ধারত না। কোনও উদ্যোগ নেই, বড় কিছু ভাবার বা করার মতো উদ্যম নেই। খায়েরপুর আর ভুট্টোদের লারকানার বাইরে বংশের কেউ কোনওদিন পা বাড়ায়নি।
কিন্তু দীনেশের ঠাকুরদা ছোটিরাম শিবদাসানি ছিলেন অন্য ধাতের মানুষ। একরোখা এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষী। পৃথিবীর কলরোল থেকে বহুদূরে অতি তুচ্ছ, ঘুমন্ত এক শহরে একঘেয়ে, ম্যাড়মেড়ে জীবন কাটিয়ে দেবার ইচ্ছা তার ছিল না। বাড়ির কেউ চায়নি, তবু সব বাধা অগ্রাহ্য করে তিনি চলে এসেছিলেন করাচিতে তাঁদের দূর সম্পর্কের এক আত্মীয়ের বাড়িতে। নিজের চেষ্টায় ম্যাট্রিক পাশ করে করাচি পোর্টে চাকরি নিয়েছিলেন।
