মুখটা ম্লান হয়ে যায় নিত্য দাসের। আস্তে আস্তে মাথা নাড়তে থাকে সে। শাহেদ আলির পত্রখানা তো পড়লেন ঠাউরদা। পাকিস্থানে মুসলিম লিগ রাজাকারগো উপুর কথা কইব ক্যাঠা (কে)? মাস্টর মশয়গো জমিনজুমিন ব্যাচতে গিয়া জানডাই চইলা গ্যাল নাসের সাহেবের। এইর পর কার অ্যামুন বুকের পাটা আছে যে কিছু করে। একটু চুপ করে থাকার পর বলল, না, কুনো ভরসা নাই। যেহানে যেহানে রাজাকার আর মুসলিম লিগের দাপট বেশি হেই হগল জাগায় হিন্দুর জমিন ফাঁকা পইড়া থাকনের কি জো আছে? শাহের আলি ঠিকই ল্যাখছে অ্যাদ্দিনে মাস্টরমশয়ের সোম্পত্তি বেদখল হইয়া যাওনের কথা। তভু আপনে যহন কইতে আছেন, তহন খোঁজ-খবর লওনের চ্যাষ্টা করুন।
দ্বারিক দত্ত আর কিছু বললেন না।
সুধা এতক্ষণ চুপচাপ শুনে যাচ্ছিল। এবার বলে উঠল, বিনু, আমার একটা কথা ভেবে দেখবি?
বিনয় উৎসুক চোখে সুধার দিকে তাকায়, কী ভাবব?
যুগলকে বলে রামরতন গাঙ্গুলির স্ত্রী আর মেয়েদের মুকুন্দপুর কলোনিতে থাকার ব্যবস্থা করে দে। সেখানে গেলে ওরা অন্তত মর্যাদার সঙ্গে থাকতে পারবে। পদে পদে এত অসম্মান সহ্য করতে হবে না।
এ-দিকটা আগে ভেবে দেখেনি বিনয়। হাতের কাছেই মুকুন্দপুর বাস্তুহারা কলোনি ছিল। মুখের কথা খসালেই যুগলরা এসে রামরতনের পরিবারকে মাথায় করে নিয়ে যাবে। মুষড়ে পড়তে পড়তে হঠাৎ উদ্দীপনায় ভেতরে ভেতরে টগবগানি অনুভব করে সে। উৎসাহের সুরে বলে, ওঁদের মুকুন্দপুর যাওয়ার ব্যাপারে কোনও সমস্যা নেই। জমি তো পাবেনই, মাথা গোঁজার মতো একটা ঘরও তুলে দেবে যুগলরা। বলতে বলতে আচমকা কী খেয়াল হতে ভীষণ দমে যায়, কিন্তু,
কিন্তু কী?
থাকার বন্দোবস্ত হয় করে দেওয়া যাবে। তবে অন্য একটা বড় সমস্যাও তো রয়েছে।
কীসের সমস্যা?
ওঁদের চলবে কী করে?
এই প্রশ্নের উত্তর কারও জানা নেই। ঘরের বাকি সবাই নিঃশব্দে বসে থাকে।
বিনয় এবার জানায়, মুকুন্দপুরবাসীদের যা হাল তাতে উদয়াস্ত খেটে কোনওরকমে তারা পেটের। ভাত জোটায়। দুটো পয়সার জন্য কতরকমের যে তাদের উঞ্ছবৃত্তি! এদের অবস্থা দিন আনি দিন খাই। বাড়তি চারজন মানুষের দায় নেওয়া কারও পক্ষেই সম্ভব নয়।
রামরতনের স্ত্রী এবং তাঁর মেয়েদের সমস্যাগুলো যেমন ছিল তেমনই থেকে গেল।
হঠাৎ বিনয়ের চোখ সামনের দেওয়াল ঘড়িটার ওপর গিয়ে পড়ে। বারোটা বেজে সতেরো। ভীষণ ব্যস্ত হয়ে ওঠে সে।–ইস, অনেক বেলা হয়ে গেছে। আর দেরি করলে অফিসে লেট হয়ে যাবে। বলতে বলতে উঠে দাঁড়ায়।
নিত্য দাসও আর বসল না। তারও কী একটা জরুরি কাজের কথা মনে পড়ে গেছে। বলল, আমারেও একহানে লৌড়াইতে (এক জায়গায় দৌড়তে) অইব। এক মিঞাসাব তেনার ইন্ডিয়ার সোম্পত্তি এচ্চেঞ্জ করতে চায়। বারোটায় তেনার লগে দ্যাখা করনের কথা। এইহানেই সোয়া বারোটা বাইজা গ্যাছে। নিত্য দাস চলে গেল।
৩১-৩৫. গরম জলে চান করে
৩১.
গরম জলে চান করে, নাকে মুখে গুঁজে বেরিয়ে পড়ে বিনয়। সুধার আজ আর ভুল হয়নি। ধুতি শার্ট আর ফুলহাতা সোয়েটার তো বিনয়ের গায়ে রয়েছেই। সঙ্গে একটা গরম শাল এবং মাফলারও দিয়ে দিল। কাল রাতে ফেরার সময় ঠাণ্ডায় রক্ত প্রায় জমে গিয়েছিল বিনয়ের। আজ অন্তত সেই কষ্টটা পেতে হবে না। সুধা বার বার বলে দিয়েছে, অফিস ছুটির পর সে যেন গলা আর মাথা ভাল করে ঢেকে নেয়।
নতুন ভারত-এর অফিসে দুটোর আগেই পৌঁছে গেল বিনয়। কালকের মতো আজও সারা অফিস জুড়ে তুমুল ব্যস্ততা। একতলার একদিকে ঝড় তুলে রোটারি মেশিনের ট্রায়াল চলছে। আর একদিকে লাইনো মেশিনের খট খট আওয়াজ। দোতলাতেও টান টান ব্যস্ততা। কোথাও এতটুকু ঢিলেমি নেই।
তেতলায় এসে দেখা গেল, নিউজ ডিপার্টমেন্ট কালকের মতোই সরগরম। প্রুফ-রিডার আর সাব-এডিটরদের বসবার জায়গাটার পাশ দিয়ে হল-ঘরের শেষ মাথায় রিপোর্টিং সেকশনে চলে এল বিনয়।
চিফ রিপোর্টার প্রসাদ লাহিড়ি তার টেবিলে বসে কিছু লিখছিলেন। খানিক দূরে অন্য রিপোর্টারদের জন্য সারি সারি চেয়ার টেবলগুলো ফাঁকা পড়ে আছে। তবে কি সুধেন্দুরা এখনও আসেনি?
লেখালেখির সময় ডাকলে প্রসাদ বিরক্ত হতে পারেন। এখানেই দাঁড়িয়ে থাকবে, না নিজের টেবিলে গিয়ে বসবে, বিনয় যখন ঠিক করে উঠতে পারছে না, সেই সময় হঠাৎ প্রসাদ মুখ তুললেন, ও, তুমি এসে গেছ। গুড। সকালে আমার মেসে গিয়েছিলে। ভেবেছিলাম বাড়ি ফিরে চান-খাওয়া সেরে অফিসে আসতে দেরি হবে। বোস—
প্রসাদের সামনাসামনি একটা চেয়ারে নিঃশব্দে বসে পড়ে বিনয়। টেবলের ওপর একটা বাঁধানো লম্বা নতুন খাতা পড়ে ছিল। সেটা দেখিয়ে প্রসাদ বললেন, আজ অ্যাটেনডান্স রেজিস্টার দিয়ে গেছে। সই কর।
ব্যাপারটা মাথায় ঢুকল না বিনয়ের। সে অবাক তাকিয়ে থাকে।
একটু হেসে প্রসাদ বুঝিয়ে দিলেন, তুমি যে অফিসে এসে ডিউটি দিয়েছ তার রেকর্ড তো থাকা চাই। তোমার উইকলি ছুটির দিন হল রবিবার। ওই দিনটা বাদে বোজ এসে হাজিরা খাতায় সই করবে। নইলে অ্যাবসেন্ট হয়ে যাবে। আরও জানালেন, খবরের কাগজে বছরে কদিন ক্যাজুয়াল লিভ, কদিন আর্নড লিভ, কদিন মেডিক্যাল লিভ, ইত্যাদি।
বিনয়ের এই প্রথম চাকরি। অ্যাটেনডান্স রেজিস্টারে সই এবং ছুটিটুটি সম্পর্কে কিছু জানা গেল। নিশ্চয় অফিসের আরও অনেক নিয়মকানুন আছে। কাজ করতে করতে সেগুলো রপ্ত হয়ে যাবে।
