.
রামরতনদের সম্পর্কে আগেই সব শুনেছেন দ্বারিক দত্তরা। পাকিস্তান থেকে আসার সময় ট্রেনের গাদাগাদি ভিড়ে কীভাবে প্রাক্তন মাস্টারমশাইটির শোচনীয় মৃত্যু ঘটেছে, তার স্ত্রী এবং মেয়েরা কী নিদারুণ গ্লানির মধ্যে দিন কাটাচ্ছে তার খুঁটিনাটি বিবরণও তাদের জানিয়েছে বিনয়। কদিন আগে এই ঘরে বসেই রামরতনদের জামতলির বিষয়সম্পত্তির ব্যাপারে খোঁজখবর নেবার বা সম্ভব হলে, বিক্রি কিংবা এক্সচেঞ্জ করার দায়িত্বও নিত্য দাসকে দিয়েছিল বিনয়ই। জামতলি থেকে শাহেদ আলির যে চিঠিটা এসেছে তাতে যে আদৌ কোনও সুসংবাদ নেই তার মুখচোখ দেখে টের পাওয়া যাচ্ছিল।
উদ্বিগ্ন দৃষ্টিতে বিনয়কে লক্ষ করছিলেন দ্বারিক দত্ত এবং সুধা। দ্বারিক দত্ত জিজ্ঞেস করলেন, কী লিখেছে শাহেদ আলি?
আচ্ছন্নের মত বসে ছিল বিনয়। নীরবে চিঠিটা দ্বারিক দত্তকে দিল সে। তার পড়া হলে সেটা গেল সুধার হাতে।
চিঠির বয়ানটা এখন সবারই জানা হয়ে গেছে। কিছুক্ষণের জন্য বাইরের এই ঘরখানা একেবারে নিঝুম হয়ে যায়।
একসময় অপার নৈঃশব্দ্য কাটিয়ে দ্বারিক দত্ত বিষণ্ণ সুরে বললেন, পাকিস্তানে নাসের আলির মতো মানুষ যে ছিল, ভাবতেই পারিনি। রামরতন গাঙ্গুলি তার কে? স্কুলে তার কাছে কয়েক বছর পড়েছিল–এই তো। পুরোনো শিক্ষকের জন্যে প্রাণটা দিয়ে দিল।
সারা পাকিস্তান জুড়ে এখন শুধুই অবিশ্বাস। চারদিক বিষবাষ্পে ভরা। দখল হয়ে যাচ্ছে হিন্দুদের বিষয়আশয়। লুট হয়ে যাচ্ছে অস্থাবর সম্পত্তি। ছিনিয়ে নেওয়া হচ্ছে যুবতী মেয়েদের। এমন এক দমবন্ধ-করা আবহাওয়ায় নাসের আলি যেন অপার্থিব কোনও দেবদূত।
নিত্য দাস আস্তে আস্তে মাথা নাড়ে, হ। মাইয়ের লাখান একখান মানুষ। যোয়ম্ ভগমানও এতখানি করত না।
সুধার বড় বেশি আবেগ। চিঠিতে নাসের আলির ভয়াবহ মৃত্যুর খবরটা পড়ে অভিভূত হয়ে পড়েছে সে। নিত্য দাসের কথায় সায় দিয়ে সে আস্তে মাথা নাড়ে, হ্যাঁ। তারপর বলে, ওঁর তো তবু ভাই ছেলে মেয়ে আছে। ফ্যামিলিটা ভেসে যাবে না। কিন্তু রামরতন গাঙ্গুলির স্ত্রী আর মেয়েদের কী হবে?
কিছুদিন আগে বিমল গাঙ্গুলিদের ভাড়া বাড়িতে গিয়ে রামরতনের স্ত্রী এবং তিন মেয়েকে দেখে এই চিন্তাটাই বিনয়কে ভীষণ বিচলিত করে তুলেছিল। কিন্তু তারপর একের পর এক কত কিছু ঘটে গেল। মৃত রামরতনের পরিবারের ভাবনাটা ক্রমশ ফিকে হয়ে গিয়েছিল। আজ শাহেদ আলির চিঠিটা পড়ার পর দুশ্চিন্তাটা সহস্রগুণ ভারী হয়ে তার মাথায় চেপে বসেছে।
রামরতনের স্ত্রী তার হাত ধরে তাদের দুই মেয়ে ছায়া আর মায়ার জন্য একটা ভদ্র রকমের কাজ জুটিয়ে দিতে ব্যাকুলভাবে কত যে কাকুতি মিনতি করেছিলেন। কিন্তু সে আত্মকেন্দ্রিক, নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত ছিল। নিজের চাকরি বাকরি, নিজের ভবিষ্যৎ, এ-সবের বাইরে আর কোনও দিকে তাকাবার সময় পায়নি। অথচ মনে মনে ঠিক করে রেখেছিল ছায়া-মায়ার কাজের ব্যাপারে হিরণ এবং আনন্দকে বলবে।
একই বাড়িতে হিরণদের কাছে থাকে বিনয়। আনন্দ সুদূর উত্তর কি দক্ষিণ মেরুতে থাকে না যে তার সঙ্গে যোগাযোগ অসম্ভব। ওদের বাড়িতে সে যায় না ঠিকই, তবে তার অফিসে যেতে পারে কিংবা একটা ফোন করা এমন কী মারাত্মক কঠিন কাজ? তবু হিরণকে বলা হয়নি। আনন্দকে ফোন করার কথাও তার মাথায় আসেনি। তীব্র অপরাধবোধে ভেতরে ভেতরে কুঁকড়ে যেতে থাকে বিনয়। মনে মনে ঠিক করে নেয় আজকালের মধ্যে ছায়া-মায়ার সম্বন্ধে হিরণদের সঙ্গে কথা বলে নেবে।
কিন্তু চাকরির আর্জি জানানো মাত্রই তো চাকরি হয়ে যায় না। তার জন্য দুচার মাস অপেক্ষা করতে হয়। এই দীর্ঘ সময় বিমলদের বাড়িতে কেমন করে ছায়া-মায়াদের কাটবে? আরও কতটা অসম্মান আর কতখানি গ্লানি তাদের জন্য অপেক্ষা করে আছে, কে বলবে।
বিনয় জানে, রামরতনের স্ত্রী এবং মেয়েরা দেশের সম্পত্তি বিক্রির টাকার আশায় উগ্রীব হয়ে আছে। ওটুকুই তাদের শেষ সম্বল। টাকাটা তাড়াতাড়ি পাওয়া গেলে প্রতি মুহূর্তের অপমানের হাত থেকে ওরা রেহাই পেত। সসম্মানে বাঁচার একটা পথ তাদের সামনে খুলে যেত। কিন্তু শাহেদ আলি যা জানিয়েছে তাতে সমস্ত আশা ধূলিসাৎ।
বিনয় ভাবে, এই খবরটা রামরতনের স্ত্রী এবং মেয়েদের দিয়ে আসা দরকার। পরক্ষণে খেয়াল হয়, শাহেদ আলির চিঠির কথা জানালে নিমেষে ওদের চারজনের চোখের সামনে সমস্ত ভবিষ্যৎ খান খান হয়ে যাবে। রামরতন মারা গেছেন, বৃদ্ধ বয়সে যদিও সে-মৃত্যু খুবই শোচনীয় তবু চার রমণী তা অনেকখানিই সামলে নিয়েছেন। কিন্তু বিষয়আশয় হারানোর শোক কতটা কাটিয়ে উঠতে পারবেন, আন্দাজ করা যাচ্ছে না।
বিনয়ের মস্তিষ্কের ভেতর বিদ্যুৎ গতিতে চিন্তার কাজটা চলছিল। একটার পর একটা ভাবনা। এবার চকিতে সে ঠিক করে ফেলে, না, আপাতত শাহেদ আলির চিঠির কথা জানাতে সে বিমল গালিদের বাড়ি যাবে না। ছায়া বা মায়ার জন্য একটা কাজের বন্দোবস্ত করে তবেই ওদের সঙ্গে। গিয়ে দেখা করবে। ততদিন অবশ্য ওদের দুর্গতির সীমা পরিসীমা থাকবে না। কিন্তু কী আর করা যাবে?
দ্বারিক দত্ত নিত্য দাসকে বললেন, তোর তো কত লোক পাকিস্তানে রয়েছে। তাদের দিয়ে শেষ চেষ্টা একটা করে দ্যাখ না যদি রামরতন মাস্টারের জমিজমার কিছু গতি করা যায়–
