এদিকে গাঙ্গুলি মহাশয় যে তাঁহাদের জমিবাড়ির দায়িত্ব আমার ভাইসাহেবকে দিয়া গিয়াছেন, জামতলির কাহারও তাহা জানিতে বাকি নাই। লিগের লোজন এবং রাজাকাররা আসিয়া তাহাকে বলিয়া গিয়াছিল, গাঙ্গুলিদের সম্পত্তি তিনি এবং তাঁহার পরিবারের মানুষেরা ভোগদখল করুন, তাহাতে উহাদের আপত্তি নাই। তবে জমিজমা বেচিয়া কোনওভাবেই টাকা কলিকাতায় পাঠানো চলিবে না। পাকিস্তানের সমস্ত জমি, সমস্ত বিষয়আশয় পাকিস্তানিদের। যাহারা চলিয়া গিয়াছে তাহারা একটি কানাকড়িও পাইবে না। এ-দেশের কেউ যদি তাহাদের সাহায্য করিতে চেষ্টা করে তাহারা দুশমন। গাঙ্গুলিদের সম্পত্তি ভাইসাহেব যে বেচিতে পারেন কীভাবে এই লোকগুলি তাহা আন্দাজ করিয়াছিল, বলিতে পারিব না।
যাহা হউক, ভালভাবে বলিলেও উহাদের কথায় শাসানি ছিল। ভাইসাহেব তাহা গ্রাহ্য করেন নাই। রামরতন গাঙ্গুলি তাহার শিক্ষক। এই মানুষটির জন্য তাহার উচ্চ শিক্ষালাভ সম্ভব হইয়াছে। পিতৃতুল্য মানুষটি সর্বস্ব খুয়াইয়া ইন্ডিয়ায় গিয়া নিদারুণ অর্থকষ্টে স্ত্রী-কন্যাসহ শেষ জীবনটা কাটাইবেন, এই চিন্তা ভাইসাহেবকে অস্থির করিয়া তুলিয়াছিল। তিনি নিজের এবং পারিবারিক সব কাজ ফেলিয়া গাঙ্গুলিদের জমি বেচার জন্য আরও বেশি করিয়া ছুটাছুটি করিতে লাগিলেন। কিন্তু রাজাকারদের চোখে পুরাপুরি ধূলা দেওয়া যায় নাই। তাহাদের সন্দেহ, ভাইসাহেব নিষেধ অমান্য করিয়া কিছু একটা করিতেছেন।
একদিন লিগের মাতব্বর সালাউদ্দিন আর রাজাকারদের মাতব্বর মনসুর আলি আমাদের বাড়ি আসিয়া হাজির। তাহাদের মেজাজ এইবার অনেক চড়া। সালাউদ্দিন বলিল, মাস্টারসাহেব, আপনেরে আমরা সোম্মান করি। হেইটা নষ্ট কইরেন না।
ভাইসাহেব সালাউদ্দিনের চোখের দিকে সিধা তাকাইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, কী অসম্মানের কামটা করছি আমি?
আপনে রামরতন গাঙ্গুলিগো সোম্পত্তি ব্যাচেনর (বেচার) লেইগা চাইর দিকে ঘুরাঘুরি করতে আছেন।
ভাইসাহেব বলিলেন, তুমরা দেখছ?
মনসুর আলি বলিল, দেহি নাই। তয় শুনাশুন কানে আইতে আছে। হিন্দুর লেইগা আপনের অত মাথাব্যথা ক্যান? শ্যাষবার কইয়া যাইতে আছি, এই হগল বন্ধ করেন।
ভাইসাহেব মনসুরের হুঁশিয়ারিতে কর্ণপাত করেন নাই। নানাজনের সঙ্গে কথা বলিয়া শেষ পর্যন্ত জামতলি হইতে বারো তেরো, মাইল দূরের গ্রাম আদিলপুরে মুস্তাফা খানের কাছে বিক্রয়ের ব্যবস্থা পাকা করিয়া ফেলেন। জমিবাড়ির যে দাম হওয়া উচিত, মুস্তাফা তাহার অর্ধেক দিতে চায়। ভাইসাহেব বুঝিলেন লোকটা পুরাপুরি সুযোগ লইতেছে। কিন্তু কিছুই করিবার নাই। অন্য কেহ ভয়ে গালিদের সম্পত্তির ধারেকাছে ঘেঁষিবে না।
ভাইসাহেব মুস্তাফাকে লিগ এবং রাজাকারদের শাসানির কথা জানাইয়া দিয়াছিলেন। সে বিরাট ধনী গৃহস্থ। জমিদারই বলা যায়। অর্থবল লোকবল দুইই তাহার যথেষ্ট। সে বলিয়াছে, রাজাকারদের সে সামলাইয়া লইবে।
কথাবার্তা হইয়া গেলে গাঙ্গুলি মহাশয়দের দলিলপত্র দেখিতে চায় মুস্তাফা খান। ঠিক হয় দুই দিন পর দলিলগুলি লইয়া ভাইসাহেব আবার মুস্তাফার বাড়ি যাইবেন। অনুরোধ করিলে জামতলিতেই সে চলিয়া আসিত। কিন্তু তাহাকে দেখিলে সালাউদ্দিনদের সন্দেহ বহুগুণ বাড়িয়া যাইত।
স্থির হইয়াছিল মুস্তাফা দলিল দেখিয়া সেইদিনই দশ হাজার টাকা অগ্রিম দিবে। পরে রামরতনকে কলিকাতা হইতে আনাইয়া মুন্সিগঞ্জে গিয়া সম্পত্তি রেজিস্ট্রি করানো হইবে। তিনি আসিতে না পারিলে যাহাতে ভাইসাহেবের নামে পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি পাঠান সেই ব্যবস্থা করিতে হইবে। তখন ভাইসাহেবই বৈধভাবে বিক্রয় করিতে পারিবেন।
কথামতো ভাইসাহেব আদিলপুরে গিয়াছেন। দলিল দেখাইয়া টাকাও নিয়াছেন। কিন্তু শেষরক্ষা হয় নাই। ফিরিবার পথে তিনি সালাউদ্দিনদের হাতে ধরা পড়িয়া যান। তাহারা অশ্রাব্য ভাষায় গালাগালি করিতে থাকে। হিন্দুর দালাল বলিয়া চিৎকার করিতে করিতে তাহার উপর ঝাপাইয়া পড়ে। ভাইসাহেব প্রতিবাদ করিলে তাহারা আরও ক্ষিপ্ত, আরও উত্তেজিত হইয়া ওঠে। তাহার নিকট যে দশ হাজার টাকা এবং দলিল ছিল সেগুলি ছিনাইয়া লইতে গেলে তিনি প্রাণপণে বাধা দেন। কিন্তু সালাউদ্দিনরা ছিল সশস্ত্র। চাকু মারিয়া তাহারা ভাইসাহেবকে ছিন্নভিন্ন করিয়া দেয়। তাহার পর টাকা এবং দলিল লইয়া চলিয়া যায়। আমার ধারণা কিছুদিনের মধ্যে রাজাকাররা গাঙ্গুলি মহাশয়ের জমি দখল করিয়া লইবে এবং সেখানে নিজেদের লোক বসাইয়া দিবে।
ঘটনাটি ঘটিয়াছিল সন্ধ্যা নাগাদ। সারা রাত্রি ভাইসাহেবের লাশ পথের ধারে পড়িয়া ছিল। খবর পাইয়া পরদিন আমরা উঠাইয়া লইয়া আসি।
বুঝিতেই পারিতেছেন, ভাইসাহেবের মর্মান্তিক মৃত্যুতে আমাদের পরিবারের সকলে ভাঙিয়া পড়িয়াছে। এই দুঃসময়ে আবদুল আসিয়া রামরতন গাঙ্গুলির মৃত্যু সংবাদ দিল। মাস্টার মহাশয়ের আশা ছিল দেশের সম্পত্তি বাবদ টাকা পাইবেন। তাহাই হইবে তাহার শেষ জীবনের সম্বল। কিন্তু কিছুই করা গেল না। মাস্টার মহাশয়ের স্ত্রী এবং কন্যাদের ভবিষ্যৎ কী হইবে, কীভাবে তাহাদের চলিবে, ভাবিয়া পাইতেছি না। বিস্তারিতভাবে সব আপনাকে জানাইলাম। সালাম।
ইতি শাহেদ আলি
চিঠি পড়া শেষ হলে স্তব্ধ হয়ে বসে থাকে বিনয়।
