নিত্য দাসকে শেষ করতে না দিয়ে বিনয় বলে ওঠে, রামরতন স্যারের স্ত্রী এবং মেয়েরা দেশ থেকে আসার পর নাসের আলির কোনও চিঠি টিঠি পায় নি। তাই বলেছিলাম। তার সঙ্গে শাহেদ আলির কী সম্পর্ক, তা আমি ভেবে পাচ্ছি না।
আমার কথাহান আগে হুইনা লন। বলে নিত্য দাস জানায়, জয়নাল ছাড়াও পাকিস্তানে তার যে-সব লোকজন আছে তাদের একজনের নাম আবদুল। আবদুলকে নাসের আলির সঙ্গে দেখা করে রামরতনের জমিজমা সম্পর্কে তিনি কতদূর কী করতে পেরেছেন, আদৌ তার পক্ষে কিছু করা সম্ভব হবে কি না, সব খবরাখবর জেনে আসতে বলেছিল সে। কিন্তু নাসেরের সঙ্গে দেখা হয়নি আবদুলের। তাঁর ছোট ভাই শাহেদ আলি বিনয়কে একখানা চিঠি লিখে তাকে দেয়। গত শনিবার আবদুল বর্ডারে এসে সেটা নরেশের হাতে দিয়েছে।
বিনয় জিজ্ঞেস করে, নাসের আলির সঙ্গে আপনার লোকের দেখা হয়নি কেন? তিনি কি জামতলিতে ছিলেন না?
বিষণ্ণ সুরে নিত্য দাস বলে, একহান খারাপ খবর আছে ছুটোবাবু।
বিনয় সামনের দিকে ঝুঁকে জিজ্ঞেস করে, কী খবর? তার চোখেমুখে উৎকণ্ঠা ফুটে ওঠে। পত্রখান পইড়া দ্যাখেন। হগল বুঝতে পারবেন।
খামের মুখ ছিঁড়ে কাঁপা হাতে চিঠি বার করে বিনয়। ফুলস্ক্যাপ কাগজের পুরো দুটো পাতা পরিচ্ছন্ন হাতের লেখায় ভর্তি। সে পড়তে শুরু করে।
শ্রী বিনয়কুমার বসু মহাশয় সমীপেষু,
প্রথমে আমার সালাম লইবেন। আপনার সহিত আমার সাক্ষাৎ পরিচয় নাই। তবে আপনার কথা আমার বড় ভাই নাসের আলির মুখে বহুবার শুনিয়াছি। আপনার প্রতি ছিল তাহার গভীর শ্রদ্ধা।
দেশ ছাড়িয়া জামতলির প্রাক্তন হেড মাস্টার রামরতন গাঙ্গুলি মহাশয় যখন সপরিবারে ইন্ডিয়ায় চলিয়া যান, তারপাশা স্টিমারঘাট পর্যন্ত আমার ভাইসাহেব তাহাদের পাহারা দিয়া লইয়া গিয়াছিলেন। তাহার পক্ষে গাঙ্গুলি মহাশয়দের সহিত কলিকাতা অবধি যাওয়া সম্ভব ছিল না। কীভাবে তাহারা সীমান্তের ওই পারে যাইবেন, এই লইয়া ভাইসাহেবের ভীষণ দুর্ভাবনা ছিল। কিন্তু তারপাশায় আপনার মতো একজন ভদ্র, সহৃদয় মানুষকে পাইয়া তিনি নিশ্চিন্ত হন এবং কলিকাতায় গাঙ্গুলি পরিবারকে পৌঁছাইয়া দিবার দায়িত্ব আপনাকে দেন। এই কথা আমি ভাইসাহেবের মুখে শুনিয়াছি।
কলিকাতায় যাইবার পর গাঙ্গুলি মহাশয়দের পৌঁছ-সংবাদ পাওয়া যায় নাই। ভাইসাহেব ধরিয়া লইয়াছিলেন, তিনি নিশ্চয়ই চিঠিপত্র লিখিয়াছেন, কিন্তু ভারত এবং পাকিস্তানের মধ্যে ডাক চলাচলে বিঘ্ন ঘটায় সে চিঠি তিনি পান নাই। পোস্টাল ডিপার্টমেন্টের কাজকর্ম স্বাভাবিক হইলে যোগাযোগ করা সম্ভব হইবে।
কিন্তু সম্প্রতি আবদুল নামে একটি লোক জামতলিতে আমাদের বাড়িতে আসিয়া জানায়, সে আপনার নিকট হইতে গাঙ্গুলি মহাশয়দের সম্পর্কে কিছু খবর আনিয়াছে। শুনিলাম, রামরতনবাবু কলিকাতায় পৌঁছাইতে পারেন নাই। গোয়ালন্দ হইতে ইন্ডিয়ায় যাইবার পথে ট্রেনে তাহার মৃত্যু হইয়াছে। তাহার স্ত্রী এবং কন্যারা এক নিকট আত্মীয়ের বাড়িতে অত্যন্ত দুরবস্থার মধ্যে দিন কাটাইতেছেন। খুবই খারাপ সংবাদ। কী বলিয়া ওই অসহায় মহিলাদের সমবেদনা জানাইব, বুঝিতে পারিতেছি না।
এদিকে আমাদের পরিবারেও চরম সর্বনাশ ঘটিয়া গিয়াছে। আমার বড় ভাই নাসের আলি আবদুল আসিবার কয়েকদিন আগে খুন হইয়া গিয়াছেন। এই হত্যাকাণ্ডের ফলে আমরা সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হইয়া পড়িয়াছি।
মর্মান্তিক এই খুনের কারণটা এবার জানাইতেছি। আপনি নিশ্চয়ই শুনিয়াছেন, রামরতন গাঙ্গুলি মহাশয় আমার বড় ভাইয়ের উপর তাহাদের বিষয়সম্পত্তির যাবতীয় দায়িত্ব দিয়া গিয়াছিলেন। তিনি যেন যত শীঘ্ৰ পারেন সেই সব বিক্রয় করিবার ব্যবস্থা করেন। শূন্য হাতে তাহারা ইন্ডিয়ায় যাইতেছেন। জমিবাড়ি বিক্রির টাকা না পাইলে তাঁহাদের দুর্গতির অন্ত থাকিবে না।
আমার ভাইসাহেব গাঙ্গুলি মহাশয়েরা চলিয়া যাইবার দুই তিন দিন পর হইতেই খরিদ্দারের খোঁজ করিতে থাকেন। বিনয়বাবু, আপনি নিশ্চয়ই জানেন, এখন পাকিস্তানের যা হাল তাহাতে হিন্দুদের প্রপার্টি বিক্রি করা কত কঠিন। লিগ এবং রাজাকাররা সাধারণ মানুষকে এই বলিয়া তাতাইতেছে যে একটি ঘষা পয়সাও খরচ করিবার প্রয়োজন নাই। যাহারা ইন্ডিয়ায় চলিয়া গিয়াছে তাহাদের জমিজমা বিনা বাধায় দখল করা যাইবে। অনেকেই এই বিষয়ে উৎসাহিত হইলেও বেশির ভাগ মানুষ ঝাট পছন্দ করে না। তাহারা নগদ টাকা দিয়া বৈধ উপায়ে কোর্টে রেজিস্ট্রি করিয়া জমি কিনিতে চায়। কিন্তু লিগ এবং রাজাকারদের ভয়ে মুখ ফুটিয়া তাহা বলিতে পারে না।
আমার ভাইসাহেব নাসের আলি ছিলেন জামতলি হাই স্কুলের অ্যাসিস্টান্ট হেড মাস্টার, এই অঞ্চলের একজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি। এখানকার অধিকাংশ মানুষই তাহাকে মান্য করে। তিনি কোনও কিছু বলিলে সসম্ভ্রমে মানিয়া লয়। অন্তত এতকাল মানিয়া আসিয়াছে।
কিন্তু দেশভাগের পর হইতে দিনকাল রাতারাতি বদলাইয়া গিয়াছে। পরিবেশ এমনই বিষাক্ত যে রামরতন গাঙ্গুলিদের বিষয়আশয় লইয়া প্রকাশ্যে কিছু করিতে তাহারও সাহস হয় নাই। গোপনে বিক্রির চেষ্টা করিতে থাকেন। জামতলিতে খরিদ্দারের সন্ধান করিলে পাছে জানাজানি হইয়া যায় তাই পাশের গ্রামগুলিতে ইচ্ছুক ক্রেতাদের কাছে গিয়া কথাবার্তা চালাইতে থাকেন।
