নিশ্চয়ই নিত্য দাস। এক মুহূর্ত আর দাঁড়ায় না বিনয়।
.
৩০.
একসঙ্গে দু-তিনটে করে সিঁড়ি টপকে ওপরে উঠতে উঠতে চকিতে বিনয়ের মনে পড়ল, গত সপ্তাহে হেমনাথের চিঠি নিয়ে আসার কথা ছিল নিত্য দাসের। হয়তো সীমান্তের ওপারের চিঠিপত্র যে তাকে পৌঁছে দেয়, কোনও কারণে তার দেরি হয়েছে।
পাকিস্তানের যা হাল তাতে কথা দিলেই যে রাখা যাবে, জোর দিয়ে তা বলা যায় না। যদিও নিত্য দাস বর্ডারের ওধারে যাদের দিয়ে কাজ করায় তারা সবাই ওখানকারই বাসিন্দা। পুরোদস্তুর পাকিস্তানি, তবু হাজারটা বিঘ্ন। হেমনাথের কাছ থেকে চিঠি হয়তো জোগাড় করা হল কিন্তু তারপাশায় পৌঁছে দেখা গেল স্টিমার দুদিন বন্ধ। শেষ পর্যন্ত স্টিমার মিলল তো গোয়ালন্দে এসে খবর পাওয়া গেল, কলকাতার ট্রেন চলছে না। সেখানে হয়তো বসে থাকতে হল তিন-চার দিন।
দোতলায় আসতেই বিনয়ের চোখে পড়ল, বাইরের ঘরে বসে আছে নিত্য দাস, সুধা আর দ্বারিক। দত্ত। হিরণের এ-সময় বাড়িতে থাকার কথা নয়। নেইও। সে এখন তার অফিসে।
সুধারা কথা বলছিল। হঠাৎ বিনয়কে দরজার সামনে দেখে ব্যস্তভাবে উঠে দাঁড়াল নিত্য দাস। আসেন ছুটোবাবু, আসেন। হেই পৌনে নয়টার সোময় আইছি। আপনের পথ চাইয়া বইয়াই আছি, বইয়াই আছি। শোনলাম জলরারি কামে বাইর হইছেন।
লোকটা বেশি মাত্রায় কথা বলে। ঘরে ঢুকে একটা চেয়ারে বসতে বসতে বিনয় জিজ্ঞেস করল, দাদুর চিঠি এনেছেন?
ফের বসে পড়েছিল নিত্য দাস। আস্তে আস্তে মাথা নেড়ে বলল, না ছুটোবাবু।
কেন? বিনয় বলে, গেল সপ্তাহে আনার কথা। তার পরও কদিন কেটে গেছে। কী ব্যাপার?
হেই কথাই ছুটোদিদি আর ঠাউরদাদের কইতে আছিলাম। ঠাউরদা অর্থাৎ ঠাকুরদা। দ্বারিক দত্তকে তাই বলেই ডাকে নিত্য দাস। হেমনাথের চিঠি না আসার কথা সুধাদের আগেই অবশ্য জানিয়ে দিয়েছে সে। বিনয়কেও বিশদভাবে জানালো।
পাকিস্তানে তার লোক জয়নালকে রাজদিয়ায় গিয়ে হেমনাথের চিঠি নিয়ে আসার ভার দিয়েছিল সে। শুধু হেমনাথেরই না, আরও কয়েকজনের চিঠি এবং পাকিস্তানের হিন্দুদের বিষয় সম্পত্তি সম্পর্কে কিছু খবরও তার নিয়ে আসার কথা।
ফি সপ্তাহে শনিবার জয়নাল পাকিস্তানের বর্ডারে আসে। এপারেও নিত্য দাসের লোকজন আছে। তাদের একজন হল নরেশ। সেও ওইদিনই ইন্ডিয়ার বর্ডারে যায়। দুধারেই পুলিশকে পয়সা খাওয়ানো আছে। জয়নাল নির্বিঘ্নে এপারে এসে চিঠিচাপাটি নরেশের হাতে দিয়ে যায়। তখন পুলিশ অন্যদিকে চোখ ফিরিয়ে থাকে। যাই হোক, হেমনাথের চিঠি নিয়ে শনিবার জয়নালের বর্ডারে আসার কথা, ছিল। সেদিন তো সে আসেইনি, এমনকি তার পরের শনিবারও না। অসুখবিসুখে পড়ল কি না কে জানে। পর পর দুই শনিবার নরেশ খালি হাতে ফিরে এসেছে।
হেমনাথের চিঠি না আসায়, মুষড়ে পড়ে বিনয়। অনেকক্ষণ চুপ করে থাকার পর বলে, রাজদিয়ায় কোনও গণ্ডগোল হয়েছে কি না, শুনেছেন?
নিত্য দাস বলল, না। উই দিকের খবর জয়নালই রাখে। হ্যায় না আইলে কিছুই কওন যাইব না।
পাকিস্তান থেকে আসার পর হেমনাথের একটাই মাত্র চিঠি পেয়েছিল বিনয়। তাও অনেকদিন হয়ে গেল। সেই চিঠিতে হেমনাথ জানিয়েছিলেন, রাজাকারেরা এবং বিহারী মুসলমানেরা রাজদিয়ায় ভীষণ উৎপাত করছে। তিনি কেমন আছেন, এর মধ্যে তার কোনও রকম বিপদ ঘটেছে কি না, কলকাতায় বসে জানার উপায় নেই। উৎকণ্ঠায় গলা শুকিয়ে আসে বিনয়ের। সে জিজ্ঞেস করে, আপনার ওই নরেশ আসছে শনিবারও বর্ডারে যাবে তো?
নিয্যস (নিশ্চয়) যাইব। হ্যামকত্তার লেইগা আমারও খুব চিন্তা হইতে আছে।
পাকিস্তানে তো আপনার অনেক লোক রয়েছে। পরের সপ্তাহেও যদি জয়নাল না আসে, আপনি অন্য কারওকে দিয়ে দাদুর খবর আনিয়ে দিতে পারবেন?
নিত্য দাস বলল, আমিও হেইটাই ভাইবা রাখছি।
দ্বারিক দত্ত বললেন, ভাবাভাবি না, যেমন করে পারিস হেমনাথের খবরটা নিয়ে আয়।
খুব চ্যাষ্টা করুম ঠাউরদা।
একটু চুপচাপ।
তারপর নিত্য দাস বিনয়কে বলে, ছুটোবাবু, হ্যামকত্তার চিঠি আনতে পারি নাই। তয় আপনের লেইগা পাকিস্থানের অন্য একজনের চিঠি আনছি। এই ন্যান (নিন)। জামার পকেট থেকে একটা মুখবন্ধ লম্বা খাম বার করে সামনের দিকে বাড়িয়ে দেয় সে।
বিনয় হতবাক। হেমনাথ ছাড়া পাকিস্তানে এমন আর কেউ নেই যে তাকে চিঠি লিখতে পারে। নিত্য দাসের হাত থেকে খামটা নিয়ে সে জিজ্ঞেস করে, কে লিখেছে?
শাহেদ আলি–
ওই নামের কারও সঙ্গে ওপার বাংলায় থাকার সময় তার কি পরিচয় হয়েছিল? বিনয় মনে করতে পারল না। বলল, কে সে?
নিত্য দাস বলল, জামতলির নাসের আলির কথা কইছিলেন, ইনি তেনার ছুটো ভাই–
নাসের আলির নামটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে সারা শরীরে বিদ্যুৎ খেলে যায় বিনয়ের। পরক্ষণে সমস্ত কেমন যেন গুলিয়ে গেল।
চিঠি লিখলে নাসের আলিরই লেখার কথা। কিন্তু লিখেছে তার ছোট ভাই শাহেদ আলি, যাকে চোখে দেখা দূরের কথা, তার নাম অবধি আগে শোনেনি বিনয়। রহস্যটা ভেদ করতে না পেরে অবাক তাকিয়ে থাকে সে।
তার মনোভাব আঁচ করে নিয়ে নিত্য দাস বলে, আপনে হেই দিন জামতালির পুরানা মাস্টর রামরতন গাঙ্গুলি মশয়ের দ্যাশের জমিজেরাত ব্যাচন (বিক্রি) কি এক্ষেঞ্জের কথা কইছিলেন। কইছিলেন তেনাগো দলিলপত্তর আছে নাসের আলির কাছে। তয়–
