আইজ ইস্কুলে যামু না।
কেন?
বাবার আসতে দেরি হইব। কেও না থাকলে দোকান দেখব কে?
ব্যাপারটা পুরোপুরি পরিষ্কার হল না। বিনয় জিজ্ঞেস করল, মানে?
আরতি বুঝিয়ে দিল, আমি নয়টা তরি (পর্যন্ত) দোকান চালাই। হের পর বাবায় আইয়া বসে। তখন আমি বাসাত্ (বাসায়) গিয়া ছান (স্নান) কইরা, ভাত খাইয়া ইস্কুলে যাই–
আরতিদের দেশ যে ওপার বাংলায় সেটা ওর কথা শুনেই টের পাওয়া গেছে। ক্রমশ আগ্রহ বাড়ছিল বিনয়ের। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে তাদের সম্পর্কে অনেক কিছু জেনে নেয় সে।
আরতিদের দেশ ঢাকা ডিস্ট্রিক্টের মানিকগঞ্জ সাব ডিভিসনের একটা গ্রামে। নাম মীরপুর। অন্য শরণার্থীদের সঙ্গে তাদের তফাত নেই। মাস আষ্টেক আগে ভয়ে আতঙ্কে দেশ ছেড়ে সীমান্তের এপারে চলে আসে। দিনকয়েক এখানে, দিনকয়েক ওখানে, তারা উদভ্রান্তের মতো এইভাবে ছোটাছুটি করতে করতে শেষ পর্যন্ত কালীঘাটের কাছে নকুলেশ্বর ভট্টাচার্য লেনে একটা বস্তিতে এসে উঠেছে। তিন ভাইবোন, মা-বাবা, এই নিয়ে ওদের সংসার। বাবা রাধানাথ পাল অনেক ধরাধরি করে চেতলার একটা মাদুরের আড়তে কাজ জুটিয়েছে। সকালে সাতটা থেকে সাড়ে-আটটা আর সন্ধে পাঁচটা থেকে সাড়ে-সাতটা অবধি তার ডিউটি। তাতে এই বাজারে ঘরভাড়া দিয়ে পাঁচটি মানুষের পেট চালানো দুষ্কর। তাই খাতা পেন্সিল পঞ্জিকা পাঁচালি ইত্যাদি নিয়ে ফুটপাথে দোকান খুলে বসতে হয়েছে।
রাধানাথের একটা উচ্চাশা আছে। ছেলেমেয়েরা গোমুখ হয়ে থাকবে এটা সে একেবারেই চায় না। এত কষ্ট, এত অভাব, তবু তিন ছেলেমেয়েকেই স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছে।
সেই ভোর থেকে রাত পর্যন্ত ভূতের মতো খেটে যায় রাধানাথ। তাদের বস্তিতে জলের খুব সমস্যা। অন্ধকার থাকতে থাকতে উঠে রাস্তার কল থেকে কয়েক বালতি জল নিয়ে আসে। ছটার ভেতর চান সেরে এক কাপ চা, আর দু-এক টুকরো বাসি পাউরুটি খেয়ে প্রকাণ্ড দুটো কাপড়ের ব্যাগে বইখাতা পেন্সিল রাবার ইত্যাদি ভরে আরতিকে সঙ্গে করে ভবানীপুরের ফুটপাথে চলে আসে। চোখের পলকে চট বিছিয়ে দোকান সাজিয়ে দিয়ে আরতিকে বসিয়ে চেতলায় হাজিরা দিতে দৌড়ায়।
সকালের দিকে বাসায় বসে পড়ার উপায় নেই। তাই একটা ছোট কাপড়ের ঝোলায় স্কুলের পড়ার বই খাতাটাতা নিয়ে আসে। দোকান সামলাবার ফাঁকে ফাঁকে সেগুলো পড়ে। স্কুলের দিদিমণিরা ভীষণ কড়া। পড়া তৈরি করে না গেলে ভীষণ বকাবকি করেন। এমনকি দাঁড় করিয়েও রাখেন। তাছাড়া, না পড়লে, পরীক্ষায় পাশ করে উঁচু ক্লাসে উঠবে কী করে?
নটা নাগাদ রাধানাথ চেতলা থেকে চলে আসে। তখন আরতির ছুটি। সে ঊধ্বশ্বাসে বাড়ি ফিরে যায়। ঝপাঝপ দুচার মগ জল মাথায় ঢেলে, নাকে মুখে গুঁজে স্কুলে ছোটে।
আরতি বলল, বাবায় কইছে যত কষ্টই হউক, আমাগো তিন ভাই-বইনেরে পড়াইব। আমি সবাইর বড়। আমার পরে দুই ভাই। ঠিক করছি কিছুতেই পড়াশুনা ছাড়ুম না। তার চোখেমুখে দৃঢ়তা। আত্মবিশ্বাস। জেদ।
কিছুক্ষণ আগে হারু আর দুলালকে দেখে এসেছে বিনয়। প্রবল হতাশায় তারা পড়া ছেড়ে দিয়েছে। প্রসাদ লাহিড়ির ধমক ধমক খেয়ে হয়তো আবার কলেজে যেতে শুরু করবে। তাদের সঙ্গে এই মেয়েটির কত পার্থক্য।
মুগ্ধ চোখে সদ্য কিশোরী আরতির দিকে কয়েক পলক তাকিয়ে থাকে বিনয়। তারপর বলে, তোমার সময় আর নষ্ট করব না। পড়। আমি যাচ্ছি
আরতি বলল, খাতা পেন্সিল, ধূপকাঠিটাঠি দরকার হইলে আমাগো দোকান থিকা নিয়েন।
বিনয় ভাবল, সে থাকে টালিগঞ্জে। যে ধরনের জিনিস আরতিরা বেচে সে-সব তার আদৌ প্রয়োজন নেই। তাছাড়া অত দূর থেকে কেনাকাটার জন্যে ভবানীপুরে আসাও সম্ভব নয়। কিন্তু কিশোরী মেয়েটিকে নিরাশ করতে ইচ্ছা হল না। বলল, নিশ্চয়ই নেব। বলতে বলতে ফুটপাথ থেকে রাস্তায় নেমে এল বিনয়। ট্যাং ট্যাং আওয়াজ করতে করতে টালিগঞ্জের একটা ট্রাম এসে স্টপেজে থামল। সে উঠে জানালার ধারের সিটে বসে পড়ে।
বিনয়ের সঙ্গে আরও দু-তিনটি প্যাসেঞ্জার উঠেছিল। কন্ডাক্টর ঘন্টি বাজাতেই ট্রাম টিমে তালে দৌড় লাগায়। ঘাড় ফিরিয়ে সে লক্ষ করল, আরতি আবার তার বই তুলে নিয়েছে। নিশ্চয়ই সেই ভূগোলের বইটা।
সাড়ে দশটা নাগাদ জাফর শা রোডে পৌঁছে গেল বিনয়। সুধাদের বাড়ির সদর দরজার কড়া নাড়তেই উমা এসে খুলে দিল। বলল, একজন আপনার সঙ্গে দেখা করার জন্যে অনেকক্ষণ বসে আচে।
বিনয় জিজ্ঞেস করল, কে?
নাম জানি না।
যুগল কি? বলেই বিনয়ের খেয়াল হল, কাল রাতেই যুগল আশু দত্তকে নিয়ে এসেছিল। আজ সকালে তার মুকুন্দপুর চলে যাবার কথা। তবে কি সন্তোষ নাগ চায় না আশু দত্ত তাদের বাড়ি থেকে চলে যাক? এই ব্যাপারেই কি কোনও সমস্যা দেখা দিয়েছে?
উমা বলল, না না, যুগলদাদা না। এ অন্য লোক। আপনি পাকিস্তান থেকে এ-বাড়িতে আসার পর দু-তিনবার আপনার সঙ্গে দেখা করে গেছে। এই তো কদিন আগেও এসে অনেকক্ষণ ছিল।
বাইরের লোকজন এলে উমা চা বিস্কুট মিষ্টি টিষ্টি দিয়ে যায়। কতক্ষণই বা তাদের কাছে থাকে? সবার নাম ধাম সে জানেও না, জানার দরকারও নেই। তবে যুগলের কথা আলাদা। সে ফি সপ্তাহে একবার না একবার আসেই। এ-বাড়িরই একজন হয়ে গেছে।
উমার হঠাৎ কী মনে পড়ে গেল। ওই যে, যখনই আসে আপনাদের দেশের জমিবাড়ি নিয়ে কীসব বলে। চা দিতে গিয়ে একটু আধটু কানে এসেছে।
