সবাইকে বলার সময় নহুষ শচীকে শুনিয়েই কথাটা বলেছিলেন। শচী আর রাস্তায় দাঁড়াননি। স্ত্রীলোকের স্বাভাবিক বিপদ অনুভব করে শচী সটান উপস্থিত হলেন দেবগুরু বৃহস্পতির বাড়িতে। হাজার হলেও তিনি ব্রাহ্মণ মানুষ। আপদে বিপদে সব সময় তিনি দেবতাদের সৎপরামর্শ দিয়ে থাকেন। শচী তার কাছেই গিয়ে দাঁড়ালেন। বললেন আমাকে বাঁচান ঠাকুর! নহুষের হাত থেকে আমায় বাঁচান–রক্ষ মাং নহুষা ব্ৰহ্মণ ত্বমস্মি শরণংগতা। শচী নহুষের বাক্যে, চোখের চাউনিতে স্ত্রীলোকের অশ্লীল মরণ দেখেছেন। বৃহস্পতির পায়ে পড়ে তিনি বললেন- আপনিই একদিন বলেছিলেন ঠাকুর–আমি নাকি স্বাধ্বী, সুলক্ষণা, ভাগ্যবতী। তা, আজ আমার এ কী হল? বৃহস্পতি বললেন– আমি যা বলেছি, ঠিকই বলেছি। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন, দেবরাজ ইন্দ্রের সঙ্গে আবার আপনার দেখা হবে। আমি আপনাকে অভয় দিয়ে বলছি-নহুষের থেকে আপনাঃ কোনও ভয় নেই–ন ভেতব্যঞ্চ ন্যাৎ সত্যমেব্রবীমি তে।
ইন্দ্রানী বিপন্ন হয়ে দেবগুরু বৃহস্পতির আশ্রয় নিয়েছেন–এ কথা নহুষের কানে গেল। তিনি যার-পর-নাই ক্রুদ্ধ হলেন–চুকোপ স নুপোস্তদা। রাজা-মহারাজাদের রাগ হলে যা হয়। চারদিক থেকে সবাই এসে স্ততি-মানে তাঁকে বোঝাবার চেষ্টা করে। এখানেও দেবতারা, ঋষিরা সবাই এসে নহুষকে বললেন-আপনি ক্রুদ্ধ হবেন না, মহারাজ! আপনি রাগ করেছেন, তাই কারও মনে আজ শান্তি নেই। দেবতা, অসুর, নাগ-সকলেই শুধু ভয় পাচ্ছে। আপনার মতো একজন মহান রাজার কি এত রাগ করলে চলেন লুধ্যস্তি ভবদবিধাঃ।
সবাই ভয় পাচ্ছে–এ কথা বললে রাগী লোকের ক্রোধ কিছু শান্ত হয়। নাকি আরও বাড়ে? যাইহোক দেবতারা-ঋষিরা ভাবলেন-স্তুতিমানে রাজার বুঝি বা কিছু ক্রোধশাস্তি হয়েছে। সময় বুঝে তারা বললেন–মহারাজ! শচীদেবী যে পরের স্ত্রী। পরের স্ত্রীকে জোর করে ভোগ করার মধ্যে মহত্ত্ব নেই কোনও, বরং পাপ আছে শত শত। শচী দেবীর ওপর থেকে মন তুলে নিন আপনি-নিবর্তয় মনঃ পাপাৎ পরদারাভিমৰ্ষণাৎ। ঋষিরা বললেন–এতেই আপনার মঙ্গল। দেবতাদের রাজা হয়েছেন আপনি, ধর্ম অনুসারে রাজ্য পালন করুন। পরস্ত্রীব্যসনে লিপ্ত হবেন না।
কামুক ব্যক্তিকে বেশি সদুপদেশ দিলে তার ক্রোধ হয়। তার কারণও আছে। মহামতি শঙ্করাচার্য এই মনস্তত্ত্বটা বুঝেছিলেন বলেই ভগবদ্গীতার টীকা করবার সময় লিখেছেন–কামনা যদি কোনওভাবে প্রতিহত হয়, তবে সেই প্রতিহত কামনাই ক্রোধের জন্ম দেয়–কাম এব প্রতিহতঃ ক্রোধরূপেণ পরিণমতে। নহুষের ক্ষেত্রেও এই নিয়মের ব্যতিক্রম হল না। তিনি দেবতা-ঋষিদের কথা একেবারে উড়িয়ে দিলেন-এবমুক্তো ন জগ্রাহ তদবচঃ কামমোহিতঃ। বুদ্ধিমান মানুষ যদি চারিত্রিক বিপাকে পড়েন, তবে তিনি অধম ব্যক্তির উপমা ব্যবহার করেন। একটি ভাল ছাত্র যদি পরীক্ষায় খারাপ করে, তবে সে অন্য কোনও ভাল ছেলের খারাপ হওয়ার উপমা খোঁজে। নহুষ দেবতাদের দিকে চোখ রাঙিয়ে বললেন-বেশি জ্ঞান দেবেন না। আপনাদের আগের ইন্দ্র যখন গৌতম ঋষির জীবিত অবস্থাতেই লুকিয়ে লুকিয়ে তার পত্নীকে ধর্ষণ করেছিলেন–অহল্যা ধর্ষিত পূর্বং ঋষিপত্নী যশস্বিনী–তখন কোথায় ছিলেন আপনারা? একটুও তো বারণ করেননি তাঁকে–স চ কিং ন নিবারিতঃ? আর সেই ইন্দ্র কি একটা দুটো পাপ করেছেন? ছল, অন্যায়, নৃশংসতা কিছুই তো বাদ যায়নি! কই আপনারা তখন তো বারণ করেননি তাকে স বঃ কস্মান্ন বারিতঃ?
নহুষ একটু দম নিলেন। উলটো চাপা দেওয়া শেষ হলে মাথা ঠান্ডা করে তিনি বললেন সে যাকগে। ইন্দ্রাণীকে বলুন, সে আমাকে একটু খুশি করে দিক, একটু সেবা করুক আমার। ব্যস আর ভাবতে হবে না। এতে তারও ভাল হবে, আপনাদেরও ভাল হবে-উপতিষ্ঠতু দেবী মাম্ এতদস্যা হিতং পরম্। দেবতারা নহুষের কথা শুনে মাথা নিচু করলেন এবং নহুষের কাছে প্রার্থনা করলেন–তবু আপনি ক্রোধ ত্যাগ করুন, মহারাজ। আমরা কথা দিচ্ছি–ইন্দ্রাণীকে নিয়ে আসব আপনার কাছে–ইন্দ্রাণী আনয়িষ্যামো যথেচ্ছসি দিবতে–আপনার যেমন ইচ্ছে, তেমনই করব আমরা।
নহুষের দুর্নিবার সম্ভোগেচ্ছা পূরণ করার জন্য দেবতা এবং ঋষিরা সবাই মিলে এসে উপস্থিত হলেন বৃহস্পতির বাড়িতে–যেখানে শচী রয়েছেন। শচীকে নহুষের কাছে যেতে হবে– এই অমঙ্গলের সংবাদ দেওয়ার সময়েও তাদের মনের মধ্যে নহুষের ভয় কাজ করছিল। ফলত নহুষের কাছে যাওয়াটা ইন্দ্রাণীর পক্ষে কোনও অন্যায়ই নয়–এইরকম একটা তর্কযুক্তি সাজাতে আপাতত দেবতা এবং ঋষিদের সময় লাগল না। তারা ভাবলেন-ভূতপূর্ব ইন্দ্রপত্নীকে নহুষের হাতে তুলে দিলে দেব-সমাজ এবং ঋষি-সমাজ নহুষের কোপ থেকে আপাতত বেঁচে যাবেন। অতএব বৃহস্পতির কাছে গিয়ে তারা বললেন– আমরা জানি, ইন্দ্রপত্নী শচীকে আপনি আশ্রয় দিয়েছেন– জানীমঃ শরণং প্রাপ্তামিন্দ্রাণীং তব বেশ্মনি। কিন্তু দেবতা, গন্ধর্ব এবং ঋষিদের সবারই মত হল–শচীদেবীকে নহুষের হাতেই দিয়ে দিন–নহুষায় প্রদীয়তা।
দেবতারা যুক্তি দিয়ে বললেন-দেখুন, নহুষ এখন দেবরাজ এবং ভূতপূর্ব ইন্দ্রের থেকে তিনি অনেকাংশেই শ্রেষ্ঠতর–ইন্দ্রা বিশিষ্টো নহুষঃ। তা এইরকম একজন বড় মানুষকে ইন্দ্রাণী যদি স্বামিত্বে বরণ করেন, তাতে খারাপ কী আছে– বৃণোমিং বরায়োহা ভর্তৃত্বে বরবণিনী। বৃহস্পতির গৃহের অন্তর্ধারে দাঁড়িয়ে দেবতা-ঋষিদের কাতর প্রার্থনা শচী দেবীর কানে যেতে কোনও অসুবিধে হল না। নিজের সতীত্ব এবং শালীনতা বিপন্ন বুঝে শচী ইন্দ্রাণী করুণভাবে কেঁদে উঠলেন। বৃহস্পতিকে সানুনয়ে বললেন–নহুষ যত বড় মানুষই হোন, এমনকি হোন না তিনি আমার স্বামী ইন্দ্রের থেকেও অনেক বড়, কিন্তু তবুও আমি নহুষকে আমার স্বামী ভাবতে পাচ্ছি নানাহমিচ্ছামি নহুষং পতিং দেবর্ষিসত্তমঃ। আপনি আমাকে বাঁচান ঠাকুর, আমাকে বাঁচান-ত্রায় মহতো ভয়াৎ। বৃহস্পতি ইন্দ্রাণীকে অভয় দিয়ে বললেন–তুমি নির্ভয়ে নিশ্চিন্তে থাক, ইন্দ্রাণী। তুমি তোমার ধর্ম ত্যাগ করনি, আমিও আমার ধর্ম ত্যাগ করব না। তুমি আমার ওপর নির্ভর করেছ। এই বিপদের সময় আমারই শরণপ্রার্থিণী এক রমণীকে আমিও ছুঁড়ে ফেলে দিতে পারি না– শরণাগতং ন ত্যজেয়মিন্দ্রাণি মম নিশ্চয়ঃ।
