স্বর্গরাজ্যে রাজার অভাবে সর্বত্র যে বিপর্যয় দেখা দিল, সেই বিপর্যয়, মাথায় নিয়েই এক জরুরি সভায় আলোচনায় বসলেন ঋষিরা, অন্য দেবতারা, স্বর্গপতি দেবোপম ব্যক্তিরা। প্রথম শ্রেণীর দেবতাদের মধ্যে যম, বরুণ, সূর্য-কেউই স্বর্গের রাজা হওয়ার ইচ্ছা বা চেষ্টা কোনওটাই করলেন না– ন স্ম কশ্চন দেবানাং রাজ্যে বৈ কুরুতে মতি। দেবতারা, ঋষিরা সবাই মিলে ঠিক করলেন–স্বর্গের আধিপত্যে বরণ করা হোক মর্ত্যভূমির রাজা নহুষকে। তাঁর গৃহে রাজলক্ষ্মীর চিরাবাস। তিনি নিজে পরম ধার্মিকই শুধু নন, তিনি যেমন তেজস্বী, তেমনই যশস্বী। অতএব নহুষকেই বলা হোক স্বর্গরাজ্যের শাসনভার গ্রহণ করার জন্য–অয়ং বৈ নহুষঃ শ্রীমান্ স্বর্গরাজ্যেভিষিচ্যতাম্।
দেবতারা, ঋষিরা সবাই মিলে নহুষের কাছে এলেন। বললেন– স্বর্গরাজ্য ছারখার হয়ে গেল। আপনি আমাদের রাজা হোন-রাজা নো ভব পার্থিব। নহুষ বিনীতভাবে বললেন–তাই কি হয়? আমি এই মত্যভূমির রাজা। আমার মধ্যে সেই শক্তি নেই যাতে স্বর্গের দেবতা এবং দেবর্ষিদের প্রতিপালন করতে পারি– দুর্বলোহং ন মে শক্তি ভবতাং পরিপালনে।ইন্দ্রের সেই শক্তি ছিল, তিনি পেরেছেন। কিন্তু তিনি যা পারেন, আমি কি তাই পারি? উপযাচক ঋষি-দেবতারা বললেন–আমাদের তপস্যার শক্তি আপনাকে দেব, রাজা! দেবতারা তাদের দৈবশক্তি দিয়ে উদ্বুদ্ধ করবেন আপনাকে। সবার তেজে তেজীয়ান হয়ে আপনি স্বর্গরাজ্যের রাজা হয়ে বসুন। আপনার কোনও ভয় নেই–পাহি রাজ্যং ত্রিপিষ্টপে।
আসলে এও এক ধরনের নির্বাচন-প্রক্রিয়া। গণতন্ত্রে একজন সংসদ সদস্য যেমন একটি নির্দিষ্ট এলাকার জনগণের শক্তিতে নির্বাচন হন, আবার নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শক্তি হাতে নিয়ে যেমন একজন মুখ্য নেতার নির্বাচন হয়, নহুষের ক্ষেত্রেও তাই হল। সবাই বললেন–দেবতা, দানব, গন্ধর্ব, যক্ষ, রাক্ষস, ঋষি, সিদ্ধ, সাধ্য এবং সমস্ত প্রাণীর তেজ আপনার মধ্যে সঞ্চারিত হবে। আপনি সেই তেজে তেজীয়ান হয়ে ধর্ম-সম্মতভাবে এই জগৎকে রক্ষা করুন। রক্ষা করুন দেবতাদের। রক্ষা করুন ঋষিদের–ধর্মং পুরস্কৃত্য সদা সর্বলোকাধিপো ভব।
সকলের মিলিত প্রার্থনায় নহুষ স্বর্গরাজ্যের শাসনভার গ্রহণ করতে স্বীকৃত হলেন। মর্ত্য ভূমির অধিকার তো তার থাকলই। এবার তিনি দেবতা, রাক্ষস-সবার তেজে বলীয়ান হয়ে স্বর্গ-মর্ত্য-পাতাল-তিন ভুবনের প্রতিপালক হলেন। ভালই চলছিল। যজ্ঞ-দান, তপো হোম, স্বাধ্যায় এবং সর্বোপরি তার নিজের পরাক্রমে সমস্ত লোক তার বশীভূত হল। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র, দেবতা, রাক্ষস, গন্ধর্ব–সবাই তার প্রজা
পিতৃন্ দেবাষীন্ বিন্ গন্ধর্বোরগরাক্ষন্।
নহুষঃ পালয়ামাস ব্ৰহ্মক্ষমথো বিশঃ।
তিন ভূবনের অধিপতি নহুষের শত্রুও কিছু কম ছিল না। অবশ্য তাদের জয় করতে কোনও বেগ পেতে হয়নি নহুষকে। সমস্ত রাজ্য যখন নিরুপদ্রব, নিষ্কন্টক–তখনই সেই দুর্ঘটনাটা ঘটল। গণতন্ত্রের নির্বাচিত সংসদ-সদস্য মন্ত্রীদের যেমন ঘটে, তেমনটাই ঘটল নহুষের বেলায়। অধিকাংশ জনগণের নির্বাচনে শক্তি বৃদ্ধি ঘটার পর সংসদ সদস্য অথবা মন্ত্রীদের যেমন আর। মানুষের সঙ্গে যোগ থাকে না, অথবা জনগণের প্রতি তাদের নিজস্ব কর্তব্যের কথাও মনে থাকে না, এখানেও তাই ঘটল।
৩) নহুষের জীবনে বিলাসিতা আসল। ধর্ম-কর্ম, স্বাধ্যয় মাথায় উঠল। দিন রাত তিনি শুধু বিলাস-ব্যসনে দিন কাটান। স্বর্গসুন্দরী অপ্সরাদের চারপাশে নিয়ে অরোভিঃ পরিবৃতঃ দেবকন্যা-সমাবৃতঃ- তিনি কখনও দেবতাদের বাগানবাড়িতে, কখনও নন্দন-বনে, কখনও সমুদ্রের ধারে, কখনও বা নদীর কিনারায় বসে থাকেন। দেবর্ষিদের সামগান আর তার ভাল লাগে না। নৃত্য-গীত আর ভাল বাজনা না হলে তার মেহফিল জমে না–বাদিত্রাণি চ দিব্যানি গীতঞ্চ মধুরশ্বর। ছয় ঋতুর সঙ্গে তাল মিলিয়ে গন্ধর্ব-অপ্সরাদের নৃত্য-গীত ব্যসনে নহুষ ধর্মকার্য, রাজকার্য, সব ভুলে গেলেন। ধর্মাত্মা রাজা কামাত্মা হয়ে পড়লেন দিনে দিনে।
এইসময়ে নহুষ একদিন তার অপ্সরা-সঙ্গিনীদের নিয়ে পথ চলেছেন। হঠাৎ তার চোখ পড়ে গেল ইন্দ্রের প্রিয়তমা পত্নী শচীদেবীর দিকে–সম্প্রপ্তা দর্শনং দেবী শস্য মহিষী প্রিয়া। ইন্দ্র তার স্বর্গের ভদ্রাসন ত্যাগ করে কবেই চলে গেছেন কোথায়। আর রানির আসন থেকে নেমে শূচী এখন অনাথা রমণীর মতো এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়ান। কিন্তু রাজ্যভ্রষ্টা হলেও শচী এখনও পরমা রূপসী। রাজলক্ষ্মী ত্যাগ করে গেলেও রূপলক্ষ্মী তাকে ত্যাগ করেননি। শচীকে দেখেই নহুষ মুগ্ধ হলেন। কিন্তু যিনি এককালে ইন্দ্রের মতো স্বামীর সৌভাগ্য ভোগ করেছেন, তিনি অন্য পুরুষ দেখে মুগ্ধ হবেন কেন? তাছাড়া ইন্দ্রাণী শচীর মধ্যে ইন্দ্রের প্রতি সেই একনিষ্ঠতা ছিল, যাতে নহুষের অপাঙ্গ-লেহনে তিনি বিরক্ত হলেন।
কিন্তু নহুষ এসব বুঝবার পাত্র নন। প্রতিনিয়তই যেহেতু স্বর্গের কলাবতী রমণীরা নহুষের সঙ্গভিক্ষা করেন, অতএব নহুষকে দেখেও ইন্দ্ৰপত্নীর উদাসীন নিশ্চেষ্ট আচরণ নহুষকে একটু পীড়া দিল। পাত্র মিত্র-মোসাহেবদের ডেকে তিনি বললেন- ইন্দ্রাণী শচীর হলটা কী? আমাকে দেখেও তিনি একটু সেবা-টেবা না করেই চলে যাবেন-ইন্দ্রস্য মহিষী দেবী কস্মান্মাং নোপতিষ্ঠতি? নহুষের মনের অবস্থা এমনই যে সাধারণ ঢাক্-ঢাক্ গুড়-গুড়ের লজ্জাটুকুও তার চলে গেছে। সবাইকে বললেন আমি এখন এই জগতের অধীশ্বর এবং দেবতাদেরও আমি রাজা। ইন্দ্র তো এখন আমিই। তা শচীর আর কষ্ট করার দরকার কী? বরং শচীকে বলুন–দেরি না করে একেবারে আমার ঘরে চলে আসতে, নির্জনে কথা কওয়া যাবে–আগচ্ছতু শচী মহ্যং ক্ষিপ্রমেব নিবেশন।
