.
২৭.
ইন্দ্রাণী শচীদেবীকে নিশ্চিন্তে থাকতে বললেন বৃহস্পতি। বললেন–এই দুঃসময়ে তোমাকে নহুষের হাতে ছেড়ে দেব না অন্তত-ন ত্যজে ত্বমনিন্দিতে। বৃহস্পতি দেবতা এবং ঋষিদের আর্জি নাকচ করে দিয়ে বললেন-কোন অবস্থায় কী ধর্ম পালন করা উচিত, আমি তা জানি। ইন্দ্রাণী আমার শরণাগত। লোকপিতামহ ব্রহ্মা শরণাগত ব্যক্তিকে ত্যাগ করার দোষ কীর্তন করেছেন বারে বারে। তাছাড়া আমি একজন সত্যনিষ্ঠ ব্রাহ্মণ হয়ে এমন অধর্ম করি কী করে-নাকার্যং কর্তুমিচ্ছামি ব্রাহ্মণঃ সন্ বিশেষতঃ। তোমরা যাও এখান থেকে। আমি ইন্দ্রের প্রিয়তমা পত্নীকে অন্তত নহুষের হাতে ছেড়ে দেব না–ন দাস্যামি শচীমিমা। তবে হ্যাঁ, নহুষ যেভাবে তোমাদের বলেছেন, যেভাবে ভয় দেখিয়েছেন, তাতে উপায় একটা বার করতেই হবে যাতে এরও ভাল হয়, আমারও ভাল হয়। তা সেই ভালর পরামর্শটাই আপনারা দিন, অবশ্য আপনাদের তরফ থেকে পরামর্শ যাই আসুক শচীকে কিন্তু আমি ফেরত দিচ্ছি না–ক্রিয়তাং তৎ সুরশ্রেষ্ঠা ন হি দাস্যাম্যহং শচীম্।
দেবতারা বৃহস্পতির দৃঢ় সিদ্ধান্ত শুনে তাকেই বললেন–তাহলে আপনিই বিচার করে বলুন কিসে সবারই ভাল হয়। বস্তুত সকলেই তারা বুঝতে পারছিলেন যে, নহুষের হাতে শচীকে ছেড়ে দেওয়া কিছুতেই ঠিক হবে না, কিন্তু নহুষের ভয়েই তারা বৃহস্পতির কাছে ওই প্রস্তাব করেছিলেন। এখন যখন দেবতারা বুঝলেন দেবগুরু স্বয়ং উপায় চিন্তা করছেন, তখন স্বয়ং তার পরামর্শই তাদের কাছে গ্রহণীয় মনে হল। বৃহস্পতি অনেক ভাবনা করে দেবতাদের বললেন–ইন্দ্রাণীকে দিয়েই নহুষকে বলতে হবে যে, তিনি আপনার ইচ্ছার কথা শুনেছেন। তবে বুঝতেই তো পারছেন, এই সেদিন তার স্বামী চলে গেছেন–মন তত দ্বিধাগ্রস্ত হয় বটেই। তিনি আপনার কাছে একটু সময় ভিক্ষা করছেন-নহুষঃ যাচতাং দেবী কিঞ্চিৎ কালান্তরং শুভা।
সময়। মানুষের সৌভাগ্য এবং দুর্ভাগ্য–দুইই গড়ে দিতে পারে সময়। বৃহস্পতি যে বুদ্ধি দিলেন, সেটা আধুনিক মতে ‘ওয়েট অ্যান্ড সি’। রামায়ণের রাবণের নীতি অনুযায়ী এটা ‘অশুভস্য কালহরণ’ অর্থাৎ ঘটনা শুভ হলে সময় নষ্ট করা উচিত নয়, আর অশুভ হলে সময় নাও, শুধুই সময় নাও। আর দেবগুরু বৃহস্পতি এই সুযোগে দেবতাদের একটু জ্ঞানই দিয়ে দিলেন। বললেন–কাল বড় সাংঘাতিক জিনিস। যত সময় নেবে, ততই দেখবে নানা বাধা, ঝুট-ঝামেলা এসে কাজ পণ্ড করছে–বহুবিধুঃ সুরাঃ কালঃ কালঃ কালং নয়িষ্যতি। সবার আশীর্বাদ আর তেজ লাভ করে নহুষ যতই অহংকারী হোন না কেন, এই কালই তাঁর কাল হয়ে দাঁড়াবে।
দেব-শিষ্য আর তাদের শুরুতে মিলে সিদ্ধান্ত হল ঠিকই। তবে ইন্দ্রাণীকেই তো নিজে মুখে। কথাটা বলতে হবে। দেবতারা যদি নহুষের কাছে গিয়ে ইন্দ্রাণীর মত ব্যক্ত করে বলেন–একটু দেরি হবে তার। তাহলে আর রক্ষে থাকবে না। ভাববেন, ষড়যন্ত্র চলছে। অতএব দেবতারা ইন্দ্রাণীকে ধরে বললেন–আপনার সতীত্ব এবং সত্যনিষ্ঠা সম্বন্ধে আমাদের কোনও সন্দেহই নেই, তবে এই সময় চাইতে হবে আপনাকেই, নইলে সে মানবে কেন? ইন্দ্রাণী রাজি হলেন দেবতাদের প্রার্থনায়।
কাজ গোছাতে হবে। অতএব মন শক্ত করে একেবারে অভিসারিকার সাজে ইন্দ্রাণী চললেন নহুষের বাড়ি–ইন্দ্রাণী কার্যসিদ্ধয়ে। মুখে বেশ একটু লজ্জা-লজ্জা ভাব ফুটিয়ে ইন্দ্রাণী নহুষের বাড়ি চললেন সাভিনয়ে। কিন্তু অভিনয় যতই করুন, যার কাছে তিনি এসেছেন তিনি তো আর অভিনয় করছেন না। ইন্দ্রাণী তার চোখের মধ্যে, তার মুখমণ্ডলের মধ্যে কামুক পুরুষের নির্লজ্জ অভিব্যক্তি দেখতে পেলেন, সুস্থ শালীন রমণীর কাছে সে অভিব্যক্তি ভয়ঙ্কর, ভীষণ–কবির ভাষায়-নহুষং ঘোরদর্শনম। অন্যদিকে প্রার্থিতা রমণীকে স্বয়ং উপস্থিত হতে দেখে নহুষের কাম-ব্যাকুল চিত্ত নৃত্য করে উঠল। তার চোখ বলল–এই তো রমণীর বয়স এবং রূপ–দুইই ঠিক আছে–দৃষ্টা তাং নশ্যাপি বয়োরূপ-সমম্বিতাম্। দুষ্ট মন বলল–যা চেয়েছিলাম পেয়েছি–সমহৃষ্যত দুষ্টাত্মা কামোপহতচেতনঃ।
দৃষ্টির দ্বারা ইন্দ্রাণী শচীর দেহ লেহন করতে করতেই নহুষ বললেন-তুমি তো জান, এখন আমিই তিন ভুবনের ইন্দ্র। অতএব আমাকেই এখন থেকে তুমি স্বামী মনে করবে–ভজস্ব মাং বরারোহে স্বামিতে বরবৰ্ণিনি। শচীর হৃদয় একেবারে কম্পিত হয়ে উঠল। অভিনয় করতে এসে যদি এখনই বিপাকে পড়েন? ঠাকুর-দেবতা স্মরণ করে কোনও মতে শচী বললেন–আমাকে একটু সময় দিন, দেবরাজ! আমার স্বামী কোথায় গেছেন, কী করছেন, কিছুই তো জানি না। আমি তার একটু খবর নিয়ে নিই। আর যদি তার সংবাদ কিছু না পাই, তবে তো চিরকাল আপনারই সেবা করব আমি, তত’হং ত্বমুপস্থাস্যে সত্যমেত ব্রবীমি তে।
নহুষ খুশি হলেন। ভাবলেন–ইন্দ্ৰণী জালে জড়িয়ে গেছেন, এখন শুধু সামান্য সময়ের অপেক্ষা। দুর্দম পৌরুষের সঙ্গে কামুকতার সুর মেশালে যে শব্দরাশি তৈরি হয়, সেই নূর-মধুর শব্দে নহুষ বললেন-সুনিতম্বে! তবে তাই হোক। তুমি ইন্দ্রের খবর নিয়ে তবেই এখানে এস। মনে রেখ, তুমি কিন্তু কথা দিয়েছ, সেই কথাটা রেখ কিন্তু। নহুষের হাত থেকে ছাড়া পেয়েই শচীদেবী বৃহস্পতির বাড়িতে এসে ঢুকলেন আবারও। দেবতারা এবার সবাই মিলে বিষ্ণুর সঙ্গে দেখা করলেন। পরামর্শ এবং অভয়–দুইই জুটল। ইন্দ্রের পাপমুক্তির জন্য হোম-যজ্ঞ, শান্তি-স্বস্ত্যয়নও চলল কিছুদিন। এমনকি ইন্দ্র এসে একবার দেখেও গেলেন নহুষের অবস্থা। দেখলেন–দেবতা-ঋষিদের বরের প্রভাবে তিনি এখনও দুর্ধর্ষ, তাকে কিছুই করা যাবে না–অকম্প্যং নহুষং স্থানান্ দৃষট্টা বলনিশূদনঃ। ইন্দ্র আবারও চলে গেলেন সেই জলস্থানে, অপেক্ষা করতে লাগলেন, অনুকুল সময়ের জন্য।
