আজকের দিনে সাধারণ সময়ে একজন মন্ত্রীর সচিবের মুখে মন্ত্রীর সম্বন্ধে কোনও নিন্দাবাক্য শুনবেন না। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে তিনি যদি বিপদে পড়েন, তার যদি আত্মরক্ষা বা পরিবার-রক্ষার তাগিদ বড় হয়ে ওঠে, তখন তার মুখে তারই বিভাগীয় মন্ত্রী সম্বন্ধে নিরপেক্ষ মন্তব্য শুনতে পাবেন। এখানেও সেই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। চন্দ্রবংশের মহান রাজা নহুষ সর্প হবার অভিশাপ লাভ করেছেন নিজের দোষে ব্রাহ্মণদের চটিয়ে। সে দোষ তিনি স্বীকারও করেন। কিন্তু কী এমন ঘটল, যাতে চিরকাল এই লোক-জুগুতি অবনমন বয়ে বেড়াতে হবে। তাকে? যিনি প্রশ্ন করছেন, তিনি সোমবংশের পঞ্চম পুরুষ লুপ্তস্মৃতি পূর্বের নহুষই কিনা, সেকথা পরে। কিন্তু তিনি নিজে রাজা থাকার সময়ে ব্রাহ্মণদের কম লক্ষ্য করেননি এবং এখন অভিশপ্ত নাগ হয়েও তার সততা এবং চরিত্রগুণ হয়তো ব্রাহ্মণের চেয়ে কিছু কম নয়। অতএব তিনি যুধিষ্ঠিরের কাছে ব্রাহ্মণত্বের সংজ্ঞা জানতে চাইছেন। অবশ্য তার আগে আয়ুপুত্র নহুষ কী ছিলেন এবং কেনই বা এই অবস্থায় পতিত–সেটা আমাদের জেনে নিতে হবে।
মহাভারতের বিবরণ অনুযায়ী আয়ু এবং স্বৰ্তানবীর প্রথম পুত্ৰ নহুষই বটে, কিন্তু তিনিই একমাত্র পুত্র নন। নহুষের পরে আয়ুর আরও চারটি পুত্রের নাম আমরা মহাভারতে পাই। তাঁরা হলেন-বৃদ্ধশর্মা, রজি, গয় এবং অনেনা- স্বর্ভানবীসুতানেতা আয়োঃ পুত্ৰা প্ৰচক্ষতে। পুরাণগুলিতে নহুষ, রজি এবং অনেনার নাম নিয়ে কোনও গন্ডগোল নেই, কিন্তু বৃদ্ধশর্মা কোথাও ক্ষত্ৰবৃদ্ধ হয়েছেন, এবং গয় হয়েছেন রম্ভ। রম্ভের কোনও পুত্র-সন্তান ছিল না। অনেনা এবং ক্ষত্রবৃদ্ধের বংশে বহু বিখ্যাত রাজা আছে মহা-মহা ঋষিও আছেন। আপাতত সেই বংশপরম্পরায় আমরা যাচ্ছি না। নহুষের কনিষ্ঠ রজিও পরম বিখ্যাত রাজা ছিলেন। দেবতা-অসুরদের যুদ্ধে তিনি কোন পক্ষে থাকবেন– এই নিয়ে এক সময়ে দুপক্ষেরই চরম দুর্ভাবনা গেছে। আমরা সেই উপাখ্যানের মধেও যাচ্ছি না। আমরা নহুষের জন্ম-বৃত্তান্ত পুরাণ থেকে সংগ্রহ করে পূর্বেই উপস্থাপিত করেছি। এখন দেখতে হবে তার রাজত্ব বিপন্ন হল কী করে?
পূর্বোক্ত পুরাণের ঘটনা যদি সঠিক হয়, তবে নহুষের রাজপদ লাভ করতে কিছু দেরি হয়ে থাকতে পারে। নহুষের অন্য ভাইদের মধ্যে অতি বিখ্যাত রজি এবং তার পুত্রেরা (যারা রাজেয় বলে খ্যাত) হয়তো অন্য কোথাও রাজত্ব করতেন। কিন্তু নহুষ পিতার রাজ্যেই অভিষিক্ত হয়েছিলেন। তবে নহুষের জীবনে তার পিতৃদত্ত রাজ্যের অধিকার খুব বড় কথা নয়। বড় কথা হল-তাকে স্বর্গ রাজ্যের রাজা করা হয়েছিল। তিনি ইন্দ্রপদ লাভ করেছিলেন এবং তা করেছিলেন কোনও যুদ্ধ-বিগ্রহ, রক্তপাত না ঘটিয়ে। তাকে ইন্দ্ৰত্বে বরণ করা হয়েছিল। মহাভারতের কবি যেখানে প্রথম নহুষের প্রসঙ্গ অবতারণা করেছেন, সেখানে বলেছেন আয়ুর পুত্র নহুষ ছিলেন অত্যন্ত বুদ্ধিমান এবং তার প্রধান পরাক্রম ছিল তার সত্যনিষ্ঠা। নহুষ তার রাজকীয় বীরত্ব, ধর্মবুদ্ধি এবং সত্যনিষ্ঠার পরাক্রমেই এক বিশাল ভূমিখভ শাসন করতেন রাজ্যং শোস সুমহন্দু ধর্মেণ পৃথিবীতে। পরবর্তী সময়ে নহুষ নিজেও যুধিষ্ঠিরকে জানিয়েছেন–যজ্ঞ, তপস্যা এবং দৈনন্দিন ব্রাহ্ম সংস্কার বেদপাঠ আমার জীবনের অঙ্গ ছিল। আদর্শ রাজার পক্ষে ইন্দ্রিয় নিগ্রহের যতখানি প্রয়োজনীয়তার কথা পন্ডিতেরা বলেন, সেই ইন্দ্রিয়-নিগ্রহের বৃত্তি আমার স্বাভাবিক ছিল–তুভিস্তপসা চৈব স্বাধ্যায়েন দমেন চ।
এই সমস্ত সদগুণ এবং জিতেন্দ্রিয়তার কারণেই হয়তো নহুষের ডাক পড়েছিল স্বর্গরাজ্যে ইন্দ্ৰত্ব করার জন্য। স্বর্গের দেবতাদের ওপর রাজত্ব করার আহ্বান মত্যভূমির রাজার কাছে সাধারণত আসে না, কিন্তু নহুষের অতিলৌকিক চরিত্রগুণেই হয়তো সেই আহ্বান নেমে এসেছিল নহুষের কাছে। স্বর্গরাজ্যে তখন এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল যে, স্বয়ং দেবরাজ ইন্দ্র পর্যন্ত তাঁর প্রিয় দেবভূমি শাসনের যোগ্যতা হারিয়েছিলেন; কিন্তু নহুষের মধ্যে সেই যোগ্যতা দেখতে পাওয়া গিয়েছিল, যার জন্য তাকে বরণ করা হয়েছিল স্বর্গের রাজতে।
ইন্দ্রের চিরশত্রু বৃত্রাসুর তখন সবে মারা গেছেন। কিন্তু বৃহত্যার মধ্যে এমন কিছু অন্যায় ছিল, যাতে ইন্দ্রের মনে মিথ্যাচারের অনুতাপ ছিল– অনৃতেনাভিভূতো’ভুচ্ছঃ পরমদুর্মনাঃ। শুধু এই মিথ্যাচারই নয়, পূর্বকৃত অন্যায় আরও কিছু ছিল, যা দিন দিন ইন্দ্রের মনঃপীড়া বাড়িয়ে তুলল। তিনি স্বর্গ ছেড়ে পালিয়ে গেলেন জগতের সীমার প্রান্তে, বাস করতে থাকলেন। জলের মধ্যে সাপের মতো–প্রতিচ্ছমো’ বসচ্চাঙ্গু চেষ্টমান ইবোরগঃ।
উপমাটা খেয়াল করলেন নিশ্চয়–দেবলোক থেকে পতিত হয়ে ইন্দ্র বাস করছেন জলে, সাপের মতো। উপমাটা পরে আমাদের কাজে লাগবে স্বয়ং নহুষের পরিচয় বোঝানোনার জন্য। ইন্দ্রের পলায়নে দেবরাজ্যে অরাজকতা দেখা দিল। অন্যান্য দেবতারা, মহর্ষিরা রীতিমতো ভয়ে ভয়ে দিন কাটাতে লাগলেন–দেবাশ্চাপি ভূশং এস্তাস্তথা সর্বে মহর্ষয়ঃ। বেশিদিন তো এইভাবে চলতে পারে না। নেতা না থাকার ফলে সবই বিশৃঙ্খল হয়ে গেছে। স্বর্গভূমি বিধ্বস্ত, বনভূমি শুষ্ক, নদীর স্রোত রুদ্ধ। রাজা না থাকলে প্রকৃতির রাজ্যে এই বিপর্যয় বিশ্বাস্য নয়, কিন্তু সেকালের দিনে অরাজক অবস্থা হলেই কবিরা এইরকম বর্ণনা দিতেন। ভূমিবিধ্বস্তসঙ্কাশা। নিবৃক্ষা শুষ্ককানো। এই বর্ণনার কারণ একটাই। রাজা থাকলে রাজকার্য এমনভাবেই স্তব্ধ হয়ে যায় যেন মনে হয় পৃথিবীর সমস্ত প্রয়োজনীয় স্ফূরণই যেন স্তব্ধ হয়ে গেছে। কবিরা আসলে প্রকৃতির স্তব্ধতা বর্ণনা করে জীবনের স্বাভাবিক স্ফুরণগুলির স্তব্ধতা নির্দেশ করেন।
